এবার বড়দিনে আক্রান্ত খ্রিস্টানরা! কতটা ভয়াবহ রাজ্যে রাজ্যে পাশ হওয়া ধর্মান্তর বিরোধী আইন?
Christian Attacked on Christmas: বিজেপি সরকার সম্প্রতি বিধানসভায় যে ধর্মান্তর বিরোধী বিলটি পেশ করেছিল তা অনুমোদিত হয়েছে এবং শনিবার রাজ্যপালের সম্মতিও মিলেছে।

সংখ্যালঘুর একটাই বিভাগ, তাঁরা সংখ্যালঘু। ধর্মনিরপেক্ষ দেশে তাই উৎসবের দিনে আক্রান্ত হওয়ার নজির বাড়ছে। ইদ বা মহরমের নয়, উদযাপনের ক্ষেত্রে এখনও সার্বিক স্তরে বড়দিনের একটা বড় গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তবু, ধর্মান্তরণের ক্ষেত্রে সমস্তটাই 'আমরা-ওরা'র খেল। বড়দিনের উৎসবের জমকে উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীর ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে ভারতের অসহিষ্ণুতার খাতা এখনও ভরেনি। বড়দিনের ঠিক দিন দুই আগে, শুক্রবার লাঠিসোটা নিয়ে এখানে ৩০ জন যুবকের একটি দল ক্রিসমাসের অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ। যুবকদের গোষ্ঠীর দাবি, ওই জেলায় জোর করে ধর্মান্তরণ ঘটছে! শুধু ওই যুবকরাই নন, উত্তরাখণ্ডের পুরোলা গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারাও দাবি করছেন, একটি খ্রিস্টান সংগঠন জোর করে ধর্মান্তরিত করছে গ্রামবাসীদের। দল ভারী করার এই মোহ ধীরে ধীরে আগ্রাসনের চেহারা নিয়েছে দেশে। মুসলিম বিরোধিতার আড়ালে কিছুতেই ভোলা যাবে না, অন্যান্য ধর্মগোষ্ঠীগুলির বিতর্কিত অবস্থান।
পুলিশ জানিয়েছে, যারা হামলা চালিয়েছে তারা একটি হিন্দু সংগঠনের সদস্য। হামলাকারীদের ছয়জনকে আটকও করা হয়, তাদের মধ্যেই ছিলেন যাজক লাজারাস কর্নেলিয়াস এবং তাঁর স্ত্রী সুষমা কর্নেলিয়াস। পরে অবশ্য সবটা মিটমাট হয়ে গেলে সবাইকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। সেদিনই দুপুরে রাজ্যের রাজধানী দেরাদুন থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে গ্রামের হোপ অ্যান্ড লাইফ সেন্টারেও হামলার ঘটনা ঘটে। মুসৌরির ইউনিয়ন চার্চের পাদ্রি তখন প্রার্থনা করছিলেন। নেপালের বারো জন বাসিন্দা এবং অন্যান্য স্থানীয়রা বড়দিনের আগে এখানে জড়ো হয়েছিলেন। জোর করে ধর্মান্তরণের অভিযোগ ওঠায় গ্রামবাসী এবং অনুষ্ঠানের আয়োজকদের মধ্যে তুমুল তর্কাতর্কি হয়। স্থানীয়রা বিক্ষোভ দেখান এবং ধর্মান্তরণের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তিও দাবি করেন। এই স্থানীয়রাই বা কারা, আর শাস্তির বিধানই বা এত ঘটা করে প্রকাশ্যে আসছে কীভাবে? সেদিনের ঘটনার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের একজন স্থানীয় কর্মীকে অভিযোগ করতে শোনা যায়, ধর্মান্তরিত করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা খ্রিস্ট ধর্মপ্রচারক।
নিজ ধর্ম বদলে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষা নেওয়া নতুন ঘটনা নয়। ভারতের আদিবাসী গ্রামগুলি এখনও এই ধর্ম বদলের সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু নতুন যে ঘটনাটি ঘটেছে তা হল, ওই রাজ্যের বিজেপি সরকার সম্প্রতি বিধানসভায় যে ধর্মান্তর বিরোধী বিলটি পেশ করেছিল তা অনুমোদিত হয়েছে এবং শনিবার রাজ্যপালের সম্মতিও মিলেছে। আর এই বিলেই শাস্তির বিধান স্পষ্ট করে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Atal Bihari Vajpayee: নিজের প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ৯০ শতাংশ সময়ই বিরোধী আসনে বসেছেন অটল বিহারী বাজপেয়ী।
শুধু উত্তরাখণ্ডে নয়, বড়দিনের আগে ছত্তিশগড়ের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষদের বাড়িঘর লক্ষ্য করে হামলার খবর মিলেছে। গত সপ্তাহ থেকে নারায়ণপুর জেলায় শয়ে শয়ে উপজাতীয় খ্রিস্টান গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছেন বলে খবর। ছত্তিশগড় খ্রিস্টান ফোরাম সূত্রে জানা গিয়েছে, মহিলা সহ একশো জনেরও বেশি মানুষ নারায়ণপুরের একটি স্টেডিয়ামে আশ্রয় নিয়েছেন। আরও অনেকের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে গির্জা সহ অন্যান্য জায়গায়। রাজ্যের রাজ্যপাল আনুসুইয়া উইকির সঙ্গে দেখা করে আদিবাসী খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অব্যাহত এই হামলার অবসান চেয়ে স্মারকলিপিও জমা দিয়েছে ছত্তিশগড় খ্রিস্টান ফোরাম।
আদিবাসী অধ্যুষিত এই জেলার ১৪ টি গ্রামের বিক্ষোভকারীদের দাবি, খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য তাঁদের হেনস্থা করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ফোরাম জানাচ্ছে, গত দুই মাসে অন্তত ৬০ টি খ্রিস্টান পরিবার হেনস্থার মুখে পড়েছে। ১২ থেকে ১৪ টি গ্রামের প্রায় ২০০ খ্রিস্টান পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং চার্চে ভাংচুর করা হয়েছে।
ছত্তিশগড়ের উপজাতিদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং বেশ কিছুকাল ধরেই খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত অনেক যাজক এবং উপজাতিই ডানপন্থী গোষ্ঠীদের আক্রমণের শিকার হয়েছে৷ যদিও ২০১১ সালের আদমশুমারির পরিসংখ্যান বলছে, ছত্তিশগড়ের জনসংখ্যার ২ শতাংশেরও কম খ্রিস্টান। তবে ডানপন্থী দলগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bharat Jodo Yatra: হিংসা-দ্বেষের বদলে যদি ভালবাসা দিয়ে এই দেশকে অখণ্ড রাখা যায়, যদি মানুষে মানুষে ভেদাভেদকে দূর করে 'বিবিধের মাঝে মিলনকে' দেখা যায়, তাহলে ক্ষতি কী!
উল্লেখযোগ্য, ধর্মান্তর বিরোধী আইন প্রয়োগ করা হয়েছে ছত্তিশগড় রাজ্যেও। ২০২১ সালে ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান ফোরাম, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস এবং ইউনাইটেড আগেইনস্ট হেট-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে খ্রিস্টানদের উপর আক্রমণের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ছত্তিশগড়। রিপোর্ট অনুসারে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত জুড়ে ৩০৫ টি এমন হামলার ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে উত্তরপ্রদেশে (সর্বোচ্চ ৬৬ টি হামলার ঘটনা)। এরপরেই আছে ছত্তিশগড় (৪৭টি) এবং কর্ণাটক (৩২ টি)।
কী এই ধর্মান্তর বিরোধী আইন?
উত্তরাখণ্ডের রাজ্যপাল গুরমিত সিং শনিবারই ধর্মের স্বাধীনতা (সংশোধনী) বিল, ২০২২ অনুমোদন করেছেন। এই বিল বলছে, বেআইনি ধর্মান্তরণ সে রাজ্যে একটি অ-জামিনযোগ্য অপরাধ যার ফলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। গত ৩০ নভেম্বর উত্তরাখণ্ড বিধানসভা একটি আইন পাস করে যাতে বলা হয়, দুই বা ততোধিক মানুষের ধর্মান্তরণ আসলে 'গণ ধর্মান্তরণ'। এই আইনের ধারা ২-এর একটি নতুন ধারা অনুযায়ী, 'গণ ধর্মান্তরণ' বলতে এমন একটি ঘটনাকে বোঝায় যেখানে 'দুই বা ততোধিক ব্যক্তি ধর্মান্তরিত হন' এবং 'বেআইনি ধর্মান্তর' মানে 'যে কোনও ধর্মান্তরণ যা আইন অনুযায়ী নয়। এই ধারায় ১০ বছর পর্যন্ত জেল এবং ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
সংশোধনীগুলিতে একজন মহিলা, নাবালক বা তফশিলি জাতি বা উপজাতি সম্প্রদায়ের সদস্যদের ধর্মান্তরিত করায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। অপরাধের জন্য ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানার কথাও বলা আছে।






