এ যদি আমার দেশ না হয় তো...

বিদ্বেষের ওপরে স্থান পায় ভালবাসা, স্নেহ, শ্রদ্ধা। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই তো আমাদের দেশের পরিচয়।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
এ যদি আমার দেশ না হয় তো...

মুম্বইয়ের পবনহংস শ্মশান। 'চিরপ্রনম্য অগ্নি' গ্রাস করছে ৮৪ বছর বয়সি সন্তুর সম্রাট শিবকুমার শর্মার নশ্বর দেহ। চিতার আগুনের পাশে একা দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে সেই দৃশ্য দেখছেন শিবকুমারের দীর্ঘদিনের সহকর্মী উস্তাদ জাকির হুসেন। পরনে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা। নীরবে দাঁড়িয়ে উস্তাদ দেখছেন, তাঁর প্রিয় সঙ্গীর দেহ ধীরে ধীরে ছাই হচ্ছে। নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া এই ছবিই যেন নতুন করে হয়ে উঠেছে দেশের পরিচয়।

কেবলমাত্র শ্মশানেই নয়, শিবকুমারের মৃত্যুর খবর পেয়েই তাঁর বাড়িতে পৌঁছন উস্তাদ জাকির হুসেন। অন্তিম শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি প্রয়াত সন্তুর বাদকের শেষ যাত্রায় কাঁধ দেন জাকির হুসেন। জম্মুতে এক হিন্দু পরিবারে জন্মানো ব্যক্তির শেষ যাত্রায় 'কাঁধ মেলালেন' মুসলিম ব্যক্তিটি। সঙ্গে ছিলেন শিবকুমারের পুত্র রাহুল শর্মা। আগের ছবিটির পাশাপাশি এই ছবিটিও বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাইরাল হয়েছে। এই তো ভারতের পরিচয়, যেখানে ধর্মের ভেদাভেদ তুচ্ছ হয়ে গিয়েও মূর্ত হয়ে ওঠে মানব ধর্ম। ভারতজুড়ে যেখানে ধর্মীয় ভেদাভেদের আগুনে অনবরত ঘি ঢালার কাজ চলছে, যখন হিন্দু ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে বিধর্মীর ওপরে নেমে আসে আক্রমণ, সেখানে দাঁড়িয়ে এই ছবি খানিক হলেও আশা জাগায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পুরাণেও অনিচ্ছুক স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর সঙ্গম অনুচিত, আইন কেন রক্ষাকবচ দেয় বৈবাহিক ধর্ষণকে?

মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর বহু দেশেই বৈবাহিক বলাৎকার নিষিদ্ধ। সেই ১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন দাম্পত্য ধর্ষণকে অপরাধের তকমা দিয়েছিল।

শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতেও এই সম্প্রীতির ছবি আমরা দেখেছি। জাকিরের সঙ্গে অনুষ্ঠানে আগাগোড়াই এই শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন শিবকুমার। যেখানে সাধারণভাবে তবলা অন্যান্য যন্ত্রসংগীতের ক্ষেত্রে সহকারী হিসেবে কাজ করে, তখন শিবকুমার-জাকির জুটি ছিলেন ব্যতিক্রম। মঞ্চে যখন 'রাগ কিরবাণি' বাজাচ্ছেন পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা, তার ফাঁকেই ফাঁকেই জায়গা করে দিচ্ছেন সহযোগী জাকিরকে, সেই অনুষ্ঠানে দু'জনের যুগলবন্দি মন কেড়ে নিয়েছিল দর্শকদের।

কিছুদিন আগে আরও একবার এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ছবি দেখেছিল ভারত। সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণের পর মুম্বইয়ের শিবাজী পার্কে তাঁকে শেষ বিদায় ও শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন বলিউড বাদশা শাহরুখ খান। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ম্যানেজার পূজা দাদলানি। সেই ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা যায় দু'জন ভিন্ন ধর্মের মানুষ তাঁদের নিজেদের ধর্মীয় মত অনুসারে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন লতা মঙ্গেশকরের প্রতি। শাহরুখ তাঁর আল্লার কাছে পরলোকগত লতাজির জন্য 'দুয়া' প্রার্থনা করছেন আর অন্যদিকে পূজা দাদলানি তাঁর ভগবানের কাছে সদ্যপ্রয়াত লতাজির আত্মার শান্তি কামনা করছেন। এখানেও জাতি-ধর্ম পরিচয়ের ওপরে উঠে এসেছিল শিল্প। কিন্তু এই ছবিই পরে নেটদুনিয়ায় শেয়ার হয়। তারপরেই এই ফুটেজ নিয়ে তির্যক মন্তব্য করেন হরিয়ানা রাজ্যের আইটি সেলের প্রধান অরুণ যাদব। অরুণ দাবি করেছিলেন, প্রয়াত লতা মঙ্গেশকরের মরদেহে থুতু ছেটাচ্ছেন শাহরুখ খান। বিজেপির তরফে এই মন্তব্য বহুলভাবে প্রচার করা হয়। নেটমাধ্যমে বিতর্কের ঝড় উঠে। কিন্তু ইসলামের নিয়মমাফিক শাহরুখ আল্লার কাছে দুয়া সেরে লতাজির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে ফুঁ দিচ্ছিলেন। সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়ার জন্যই বিজেপির আইটি সেল শাহরুখের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেন বলে অভিযোগ। পরবর্তীকালে ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা অল্ট নিউজ এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করে বিজেপির অভিযোগকে মিথ্যে প্রমাণ করে।

বারে বারেই যখন জাতপাতের হিংসা ভুলে এক হতে চেয়েছে ভারত, তখনই সাম্প্রদায়িক বিভেদের আগুনে পুড়েছে দেশের বিবেক। নেপথ্যে দেশের রাজনৈতিক নেতারা। এই ঘটনা আমাদের মনে করায়, কোভিডকালে ভারতে আসা তবলিগি জামাতের সদস্যদের বিরুদ্ধে থুতু ছিটিয়ে করোনা ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছিল, যা আসলে ভারতের ঐক্যকে ভেঙে দেওয়ার নিরলস চেষ্টা। কিন্তু সন্তুর সম্রাট শিবকুমার শর্মার শেষ যাত্রায় উস্তাদ জাকির হুসেনের শ্রদ্ধা বা সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের অন্ত্যেষ্টিতে শাহরুখের 'দুয়া' যেন এখনও অখণ্ড ভারতাত্মার ছবিটাই আমাদের সামনে তুলে ধরে। সাম্প্রদায়িক হিংসা-হানাহানিতে যখন বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে দেশ, তখন এই মানুষগুলোর জাতি-ধর্মপরিচয়ের ওপরে গিয়ে পারস্পরিক অবস্থান আমাদের আশ্বস্ত করে। বিদ্বেষের ওপরে স্থান পায় ভালবাসা, স্নেহ, শ্রদ্ধা। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই তো আমাদের দেশের পরিচয়। এই যদি আমাদের দেশ না হয়, তবে কোনটা আমাদের দেশ!

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।