এ যদি আমার দেশ না হয় তো...

মুম্বইয়ের পবনহংস শ্মশান। 'চিরপ্রনম্য অগ্নি' গ্রাস করছে ৮৪ বছর বয়সি সন্তুর সম্রাট শিবকুমার শর্মার নশ্বর দেহ। চিতার আগুনের পাশে একা দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে সেই দৃশ্য দেখছেন শিবকুমারের দীর্ঘদিনের সহকর্মী উস্তাদ জাকির হুসেন। পরনে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা। নীরবে দাঁড়িয়ে উস্তাদ দেখছেন, তাঁর  প্রিয় সঙ্গীর দেহ ধীরে ধীরে ছাই হচ্ছে। নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া এই ছবিই যেন নতুন করে হয়ে উঠেছে দেশের পরিচয়।

 

কেবলমাত্র শ্মশানেই নয়, শিবকুমারের মৃত্যুর খবর পেয়েই তাঁর বাড়িতে পৌঁছন উস্তাদ জাকির হুসেন। অন্তিম শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি প্রয়াত সন্তুর বাদকের শেষ যাত্রায় কাঁধ দেন জাকির হুসেন। জম্মুতে এক হিন্দু পরিবারে জন্মানো ব্যক্তির শেষ যাত্রায় 'কাঁধ মেলালেন' মুসলিম ব্যক্তিটি। সঙ্গে ছিলেন শিবকুমারের পুত্র রাহুল শর্মা। আগের ছবিটির পাশাপাশি এই ছবিটিও বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাইরাল হয়েছে। এই তো ভারতের পরিচয়, যেখানে ধর্মের ভেদাভেদ তুচ্ছ হয়ে গিয়েও মূর্ত হয়ে ওঠে মানব ধর্ম। ভারতজুড়ে যেখানে ধর্মীয় ভেদাভেদের আগুনে অনবরত ঘি ঢালার কাজ চলছে, যখন হিন্দু ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে বিধর্মীর ওপরে নেমে আসে আক্রমণ, সেখানে দাঁড়িয়ে এই ছবি খানিক হলেও আশা জাগায়।

 

শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতেও এই সম্প্রীতির ছবি আমরা দেখেছি। জাকিরের সঙ্গে অনুষ্ঠানে আগাগোড়াই এই শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন শিবকুমার। যেখানে সাধারণভাবে তবলা অন্যান্য যন্ত্রসংগীতের ক্ষেত্রে সহকারী হিসেবে কাজ করে, তখন শিবকুমার-জাকির জুটি ছিলেন ব্যতিক্রম। মঞ্চে যখন 'রাগ কিরবাণি' বাজাচ্ছেন পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা, তার ফাঁকেই ফাঁকেই জায়গা করে দিচ্ছেন সহযোগী জাকিরকে, সেই অনুষ্ঠানে দু'জনের যুগলবন্দি মন কেড়ে নিয়েছিল দর্শকদের।

 

আরও পড়ুন: পুরাণেও অনিচ্ছুক স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর সঙ্গম অনুচিত, আইন কেন রক্ষাকবচ দেয় বৈবাহিক ধর্ষণকে?

 

কিছুদিন আগে আরও একবার এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ছবি দেখেছিল ভারত। সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণের পর মুম্বইয়ের শিবাজী পার্কে তাঁকে শেষ বিদায় ও শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন বলিউড বাদশা শাহরুখ খান। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ম্যানেজার পূজা দাদলানি। সেই ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা যায় দু'জন ভিন্ন ধর্মের মানুষ তাঁদের নিজেদের ধর্মীয় মত অনুসারে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন লতা মঙ্গেশকরের প্রতি। শাহরুখ তাঁর আল্লার কাছে পরলোকগত লতাজির জন্য 'দুয়া' প্রার্থনা করছেন আর অন্যদিকে পূজা দাদলানি তাঁর ভগবানের কাছে সদ্যপ্রয়াত লতাজির আত্মার শান্তি কামনা করছেন। এখানেও জাতি-ধর্ম পরিচয়ের ওপরে উঠে এসেছিল শিল্প। কিন্তু এই ছবিই পরে নেটদুনিয়ায় শেয়ার হয়। তারপরেই এই ফুটেজ নিয়ে তির্যক মন্তব্য করেন হরিয়ানা রাজ্যের আইটি সেলের প্রধান অরুণ যাদব। অরুণ দাবি করেছিলেন, প্রয়াত লতা মঙ্গেশকরের মরদেহে থুতু ছেটাচ্ছেন শাহরুখ খান। বিজেপির তরফে এই মন্তব্য বহুলভাবে প্রচার করা হয়। নেটমাধ্যমে বিতর্কের ঝড় উঠে। কিন্তু ইসলামের নিয়মমাফিক শাহরুখ আল্লার কাছে দুয়া সেরে লতাজির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে ফুঁ দিচ্ছিলেন। সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়ার জন্যই বিজেপির আইটি সেল শাহরুখের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেন বলে অভিযোগ। পরবর্তীকালে ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা অল্ট নিউজ এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করে বিজেপির অভিযোগকে মিথ্যে প্রমাণ করে।

 

বারে বারেই যখন জাতপাতের হিংসা ভুলে এক হতে চেয়েছে ভারত, তখনই সাম্প্রদায়িক বিভেদের আগুনে পুড়েছে দেশের বিবেক। নেপথ্যে দেশের রাজনৈতিক নেতারা। এই ঘটনা আমাদের মনে করায়, কোভিডকালে ভারতে আসা তবলিগি জামাতের সদস্যদের বিরুদ্ধে থুতু ছিটিয়ে করোনা ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছিল, যা আসলে ভারতের ঐক্যকে ভেঙে দেওয়ার নিরলস চেষ্টা। কিন্তু সন্তুর সম্রাট শিবকুমার শর্মার শেষ যাত্রায় উস্তাদ জাকির হুসেনের শ্রদ্ধা বা সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের অন্ত্যেষ্টিতে শাহরুখের 'দুয়া' যেন এখনও অখণ্ড ভারতাত্মার ছবিটাই আমাদের সামনে তুলে ধরে। সাম্প্রদায়িক হিংসা-হানাহানিতে যখন বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে দেশ, তখন এই মানুষগুলোর জাতি-ধর্মপরিচয়ের ওপরে গিয়ে পারস্পরিক অবস্থান আমাদের আশ্বস্ত করে। বিদ্বেষের ওপরে স্থান পায় ভালবাসা, স্নেহ, শ্রদ্ধা। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই তো আমাদের দেশের পরিচয়। এই যদি আমাদের দেশ না হয়, তবে কোনটা আমাদের দেশ!

More Articles

;