পালাবদলের প্রথম দু’দিন, যা দেখল বাংলা
সব মিলিয়ে প্রথম দু’দিনেই অন্তত চার জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে, যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলির তরফে পাল্টা অভিযোগ শোনা গিয়েছে।
ভোটের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক পালাবদলের উচ্ছ্বাস যতটা ছিল, তার ছায়াতেই প্রথম দু’দিনে অশান্তির ছবি উঠে এল পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। সরকার বদলের পরপরই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে সংঘর্ষ, হামলা, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও। ভোট-পরবর্তী অশান্তি নিয়ে, রাজনৈতিক উত্তেজনার এই আবহেই নতুন অধ্যায় শুরু করতে চলেছে বাংলা। বাংলায় বিজেপির জয় নিশ্চিত হতেই, ধুতি-পাঞ্জাবি পরে বাঙালি সাজে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছিলেন, “বদলা নয়, বদল চাই।” কিন্তু বাস্তবচিত্র বলছে অন্যকথা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক, একাধিক জায়গায় মৃত্যুর খবর। হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরের দেবিপুর গ্রামে সোমবার রাতে বিজেপি কর্মী যাদব বর (৪৫)-কে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ। বিজেপির দাবি, একটি বিজয় মিছিল থেকে ফেরার সময় তৃণমূল কর্মীরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। এই ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ জানিয়েছে, মূল অভিযুক্ত কালীপদ বাগ-সহ মোট চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের খোঁজে তল্লাশি চলছে।
অন্যদিকে, বীরভূমের নানুরের সন্তোষপুর গ্রামে মঙ্গলবার দুপুরে তৃণমূল কর্মী আবির শেখ (৪৫) নিহত হন। পরিবারের অভিযোগ, এক আত্মীয়ের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে বিজেপি কর্মীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায়। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। সঙ্গে থাকা তাঁর আত্মীয় আলী হোসেন গুরুতর জখম হয়েছেন। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিজেপি। তাদের দাবি, এই ঘটনা তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফলও হতে পারে। এছাড়া মঙ্গলবার উত্তর চব্বিশ পরগনার নিউ টাউনে তৃণমূল কর্মীদের হামলায় বিজেপি কর্মী মধু মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। সব মিলিয়ে প্রথম দু’দিনেই অন্তত চার জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে, যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলির তরফে পাল্টা অভিযোগ শোনা গিয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
BJP Government in West Bengal: ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে বিজেপি এল বাংলার ক্ষমতায়। এই পরিবর্তনে কি সত্যিই দুর্নীতি, বেকারত্ব, কাটমানির রাজনীতি শেষ হবে? নাকি শুধু শাসকের মুখ বদলাবে, মানুষের ভাগ্য নয়?
শুধু প্রাণহানিই নয়, বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়েছে সংঘর্ষের ঘটনাও। মঙ্গলবার বিকেলে জলপাইগুড়ির বারোপাটিয়া এলাকায় বিজেপি সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে। বিজেপির দাবি, তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা তলোয়ার ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালান। এতে অন্তত চারজন গুরুতর আহত হন, একজন তীরের আঘাতও পান। আহতদের জলপাইগুড়ি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অভিযোগ, ভ্রমরী দেবী মন্দিরের দিকে যাওয়ার সময় পাচিরাম নাহাটা হাই স্কুলের কাছে এই হামলা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো একটি ভিডিওতেও তাঁকে তলোয়ার হাতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনার পর পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বিজেপি কৃষ্ণ দাস-সহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে। তবে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই তিনি পালিয়ে যান বলে জানা গেছে। পরে কৃষ্ণ দাস দাবি করেন, বিজেপি সমর্থকরাই তাঁকে আক্রমণ করতে এসেছিল।
হাওড়া জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের এক প্রাক্তন কাউন্সিলরকে মারধর করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এছাড়াও সোমবার দুপুর থেকে কলকাতার টালিগঞ্জ ও কসবা, বারুইপুর, কামারহাটি, বরানগর এবং বহরমপুরে তৃণমূলের পার্টি অফিসে ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাগুলিতে বিজেপি সমর্থকদের জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, অন্তত দুটি মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি রাজনীতির যোগ নেই— একটি ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে, অন্যটি দুর্ঘটনাজনিত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
I-PAC dependency in TMC: আই-প্যাকের ডেটা, সার্ভে আর কর্পোরেট নির্বাচনী কৌশলের উপর অতিরিক্ত ভরসা করেই কি তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতা হারাল? মানুষদের বুঝতে না পারার ফলেই কি বুথে বুথে দুর্বল হলো দল? তৃণমূলের এই ভরাডুবির নেপথ্যে কি আই-প্যাক নির্ভরতাই সবচেয়ে বড় কারণ?
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন এবং রাজ্যজুড়ে টহল বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও স্পষ্ট করেছে, ভোট-পরবর্তী সহিংসতার ক্ষেত্রে তাদের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি বজায় থাকবে।
এই ঘটনাকে তৃণমূল কংগ্রেস “মধ্যযুগীয় বর্বরতা” বলে আখ্যা দিয়ে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে বিজেপি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফলেই এই অশান্তি হতে পারে।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও নজরে পড়েছে। এছাড়া নৈহাটিতে এক বিজেপি কর্মীর বাড়িতে হামলায় তিনজন আহত হন বলে অভিযোগ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এই চিত্র নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ রাজ্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতেও গেরুয়া শিবিরের তরফে হুমকি, দলীয় পতাকা লাগানোর মতো অভিযোগ উঠেছে। কলকাতার হগ মার্কেটে বুলডোজার দিয়ে বহু দোকান ভাঙার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০২১ সালে যেখানে বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন এবং তৃণমূল ২১৫। ২০২৬-এ দেখা যাচ্ছে বিজেপি জয়লাভ করেছে ২০৭ আসনে এবং তৃণমূল ধরে রাখতে পেরেছে মাত্র ৮০টি আসন।
বাংলায় ভোটপরবর্তী হিংসার ঘটনায় রাজ্য
বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো জরুরি। আমরা দলীয় কর্মীদের স্পষ্ট করে বলেছি, কোনও ধরনের সহিংসতা বরদাস্ত করা হবে না। যদি কেউ আইন ভাঙে, সে বিজেপির হলেও তার বিরুদ্ধে এফআইআর করতে হবে এবং ব্যবস্থা নিতে হবে।”
শুভেন্দু অধিকারীর বার্তা, “আইন নিজের হাতে কেউ তুলে নেবেন না।” তাঁর অভিযোগ, “দিকে দিকে তৃণমূলই অশান্তি ছড়াচ্ছে। এখনও বাংলায় মহাজঙ্গলরাজ চলছে।” শুভেন্দু অধিকারী আরও দাবি করেন যে, “২০২১ এবং ২০২৩ সালের তুলনায় এ বার বড় কোনও অশান্তি হয়নি। অনেকদিন পর ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন। ভবানীপুরে ১০-১৫ বছর বহু মানুষ ভোটই দিতে পারেননি।”
তিনি আরও জানান, “আমি বলেছি, পাপীদের অফিসে হাত দেওয়ার দরকার নেই। ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে গুন্ডা দমন করা হবে। শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করবে বিজেপি।” তাঁর কথায়, “৫০-৬০টি অভিযোগ এসেছে, ১৬১টি এফআইআর করছে সিবিআই। তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপিকে তুলনা করবেন না। এবার বাংলা থেকে মহাজঙ্গলরাজ পরিষ্কার করা হবে।” এছাড়া সন্দেশখালির প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দু বলেন, “সন্দেশখালির অত্যাচারের ঘটনা গোটা দেশ দেখেছে। শেখ শাহজাহানের ভয়ে মানুষ গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিল। এখন তৃণমূল নেই, মানুষ আবার ফিরতে শুরু করেছেন।”
যদিও নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কড়া বার্তা দিয়েছে। রাজ্যজুড়ে টহল বাড়ানো হয়েছে এবং হিংসার ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানানো হয়েছে। প্রশাসনের তরফেও নজরদারি বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, পালাবদলের পরেও কেন একই ছবি? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, স্থানীয় স্তরের সংঘাতের ফলে ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গেই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।






