পুতিনের ভাষায় নাৎসি নিধন যজ্ঞ ইউক্রেনে, সত্যিই কি নাৎসিদের ভক্ত জেলনস্কির দেশ

নাৎসি, হলোকস্ট, এই শব্দ গুলো আজও গোটা বিশ্বের মানুষকে কাঁপিয়ে দেয়। ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই আতঙ্কের অতীতে, যেখানে ষাট লক্ষ ইহুদীদের হত্যা করা হয়েছিলো। যে আদর্শের আগ্রাসন পাল্টে দিয়েছিল গোটা পৃথিবীর রাজনৈতিক পটচিত্রকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রশক্তি যখন ইউরোপের দখল নেয়, তখন শুরু হয় নাৎসি  উৎখাতের কাজ। ইউরোপে, বা মূলত জার্মানী, ইতালির মত দেশে এই কাজ শুরু করে আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড এই কাজে অতটাও সক্রিয়তা দেখায়নি, কারণ যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাদের নিজেদের দেশ মেরামতির দিকে নজর দিতে হয়েছিল।
এই denazification এর প্রক্রিয়ার এক বিশাল ইতিহাস আছে। যার ইতিহাস নিয়ে ছোট করে আলোচনা প্রয়োজন, সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটা প্রশ্ন করতে চাই আপনাকে।

প্রশ্নটা হল, আপনার কি মনে হয়? যে আদর্শের জন্যে একটি জাতির ষাট লক্ষ মানুষের মৃত্যু হল, যে আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আপনার পূর্ব পুরুষ হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন, আপনি সেই আদর্শে কখনো বিশ্বাস করতে পারেন?

উত্তরটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই না হওয়া উচিত নয়? অবাক হচ্ছেন? যে এরম প্রশ্ন উঠে আসছেই বা কী ভাবে?

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের অভিযোগ, ইউক্রেনে, মূলত ডনবাস এবং লুহাস্কে নব্য-নাৎসিদের সহায়তায় ইউক্রেনের সরকার গণহত্যা চালিয়েছে, অত্যাচার করেছে সেই দেশে বসবাসকারী রুশ ভাষাভাষীদের ওপর। ইউক্রেনে শুরু হয়েছে নব্য-নাৎসিদের উত্থান এবং তাতে সরাসরি মদত রয়েছে সরকার এবং পশ্চিমী দেশগুলির। কিন্তু এই অভিযোগ কতটা সত্য? এবং সত্য যদি হয়েও, তাহলেও কি একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক দেশে এইভাবে আক্রমণ করা যায়?

আসি ইউক্রেনের রাষ্ট্রপ্রধানের কথায়। শুরুতে যে প্রশ্নটা করলাম, যার কথা মাথায় রেখে করলাম, তিনি আর কেউ নন, তিনি ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি জেলেনস্কির পিতামহ সাইমন ইভানোভিচ জেলেনস্কি। হ্যাঁ, ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি একজন ইহুদী, এবং তার পিতামহ সাইমন ইভানোভিচ জেলেনস্কি সোভিয়েত রেড আর্মিতে নাম লিখিয়ে লড়েছিলেন হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ডেনিস সিমহালও ইহুদি, এবং এরা দুজনেই গনতান্ত্রিক উপায়ে, প্রায় ৭৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। তাই তাদের বিরুদ্ধে নাৎসি পোষণের যে অভিযোগ পুতিন আনছেন তা যে সত্যি একেবারেই নয় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

তাহলে নব্য নাৎসি বলতে কাদের কথা বোঝাতে চাইছেন পুতিন? জানা যাচ্ছে যে, পুতিনের এই দাবি একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রাইমিয়া দখল করার সময়ে অ্যাজভ ব্যাটেলিয়ান নামক একটি প্যারামিলিটারী বাহিনী ইউক্রেনের সেনাদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে রুশ সেনা এবং তাদের সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, এমনকী ২০১৪ সালের অভিযানের পরে রাশিয়া সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দখলে চলে যাওয়া বন্দর শহর মারিউপুলকে এই অ্যাজভ ব্যাটেলিয়ানই ইউক্রেন সরকারের হাতে তুলে দেয়। পুরস্কার স্বরূপ ইউক্রেনের সরকার এই বাহিনীকে ন্যাশনাল গার্ডে অন্তর্ভুক্ত করে।

এই অ্যাজভরাই আজকের নব্য নাৎসি। তাঁরা চরম দক্ষিণপন্থী, এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী। এখানেই শেষ নয়, এদের মধ্যে অনেকেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে তাঁরা নাৎসি আদর্শে বিশ্বাস করেন। তাদের পোশাকে এবং হেলমেটে তাঁরা নাৎসিদের প্রতীক স্বস্তিক চিহ্ন নিয়ে ঘোরেন। ২০১৯ সালে একটি বিখ্যাত ম্যাগাজিন লেখে যে, এই মুহূর্তে ইউক্রেনই একমাত্র দেশ, যাদের সেনাবাহিনীতে নাৎসি মনোভাবাপন্ন সেনা রয়েছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা রোমা সম্প্রদায় এবং এলজিবিটি কমিউনিটির ওপর চূড়ান্ত অত্যাচার চালিয়েছে, গনহত্যা করেছে। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি রিপোর্টে অভিযোগ করা হয় যে এই অ্যাজভরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন চূড়ান্ত ভাবে লঙ্ঘন করেছে। তারা ডনবাস অঞ্চলে ধর্ষণ এবং অত্যাচার করেছে এমন অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে। শুধু নাৎসি ভাবধারা নয়, এই গোষ্ঠী শ্বেত আধিপত্য ও বিস্তার করতে চাইছে। জাতি বিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ সব কিছুর অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে।

ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইউক্রেনের কিছু মানুষ নাৎসিদের সহায়তা করেছিলেন। হাতে হাত মিলিয়েছিলেন ওদের সাথে। ইউক্রেনে এখনও সহানুভূতি আছে চরমপন্থী এই আন্দোলনের সাথে, কিন্তু ঐতিহাসিকরা জানাচ্ছেন যে এই জাতীয়তাবাদীরা দেশের সাড়ে চার কোটি মানুষের মাত্র দুই শতাংশ। পুতিন শুধুমাত্র অ্যাজভদের এবং এই দুই শতাংশ মানুষের ওপর ভিত্তি করে ইতিহাসকে বিকৃত করছেন, কারণ ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে এটাও দেখা যাবে যে ইউক্রেনের অনেক মানুষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন, চূড়ান্ত অত্যাচারিত হয়েছেন। সেই সংখ্যাটা দেড় কোটিও ছাড়াতে পারে। আর রুশ ভাষাভাষীদের ইউক্রেনে অত্যাচারিত হওয়ার কথা পুতিন যা বলছেন, তাকে খণ্ডন করে তাদের বক্তব্য, রুশ ভাষাভাষীরা রাশিয়ার থেকে ইউক্রেনে অনেক বেশি ভালো থাকেন, তাদের এই দেশে স্বাধীনতা অনেক বেশি। তারা খোলা মনে নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারেন কারণ ইউক্রেনে গনতন্ত্র আছে, রাশিয়ার মত একনায়কতন্ত্র নেই।

তাহলে পুতিন এইভাবে নাৎজি জুজু দেখিয়ে যুদ্ধে যেতে পারছেন কিভাবে? কারণ রাশিয়ার জনমানসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘা এখনও দগদগে। তারা এখনও ভুলতে পারেননি তাদের দু কোটি মানুষের প্রাণ চলে যাওয়ার কষ্ট। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাৎসিদের কথা বলে সহজেই রাশিয়ার মানুষের আবেগকে নাড়া দিচ্ছেন পুতিন।

কিন্তু Denazification? সেটা কিভাবে করতে চাইছেন পুতিন? একজন ইহুদী রাষ্ট্রপ্রধানকে নাৎসি বলে তাকে সরকার থেকে উৎখাত করে, তার সেনাকে ধ্বংস করে নিজের হাতের কোনো পুতুলকে সরকারে বসাতে চাইছেন তিনি। লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের "Denazification" এর কথা। সেই সময়ে সোভিয়েতের রেড আর্মি নাৎসি পার্টির কোনো সদস্যকে রেয়াত করেনি। জানা যায়, প্রায় আশি হাজার নাৎসি সদস্যকে হত্যা করেছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন। পুতিনকি আবারো একই রকম ভাবে "নাৎসি" উৎখাত কর্মসূচি চালাতে চান? যদি ধরেও নি, ইউক্রেনের সরকার নাৎসি, সেখানে গনহত্যা চলছে, তাতেও কি তার কোনো অধিকার তৈরি হয় এক সার্বভৌম, স্বাধীন গনতান্ত্রিক দেশকে আক্রমণ করে তাদের বিপুল জনসমর্থন পাওয়া সরকারকে উৎখাত করার? লক্ষ লক্ষ মানুষ যে আজ গৃহহীন, চরম কষ্টে আছেন, সেটা কোন আদর্শের বলে তিনি ঠিক কাজ বলে প্রমাণ করবেন?

১৯৩৯ সালে ঠিক এরকম ভাবেই ইতিহাস বিকৃত করে, তিল কে তাল করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন হিটলার। আজ যেভাবে গুটিকয়েক অ্যাজভদের দেখিয়ে পুতিন নিজের দেশবাসীকে নাৎসি জুজু দেখাচ্ছেন, হিটলার এমন ভাবেই তার দেশবাসীকে ইহুদীদের জুজু দেখাতেন, বলতেন অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ডে জার্মানরা আক্রান্ত। পুতিনের মনে প্রশ্ন জাগে না? যদি ইতিহাস তাঁকে একবিংশ শতকের হিটলার বলে মনে রাখে?

More Articles

;