গঞ্জের হাটের ছুরি শুঁটকি, অপেক্ষা আর ফুরোয় না

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
গঞ্জের হাটের ছুরি শুঁটকি, অপেক্ষা আর ফুরোয় না

শীতের শেষবেলায় এমন বৃষ্টি বাদল কার ভালো লাগে বলো দেখি! মাঘের শেষ কাটালে বৃষ্টি বড় সৌভাগ্যি, এমন তো প্রবচনে বলা আছে জানি। তা৷ বলে, আলু আর প্যাঁজের জমি তইলে গেলে মানষের কি ভালো লাগে! মানুষ তখন টিপিটিপি বৃষ্টিতেও কালো ছাতাখানা মাথায় চাপিয়ে আলের পাশটিতে গিয়ে বসে থাকে। ওর মাথার উপর হিজল গাছ ওই ডালপালা মেলে দিয়ে বসে আছে একা একা। সেই রাত থাকতে জল হচ্ছে। হিজলের বুক মাথা সব কিছু ভিজে একেবারে ঝুপ্পুস। এই বৃষ্টি খানিক ধরেছে এবার। এমন করে বসে বসে, জল নামা দেখতে দেখতে ওই দূরে চোখ চলে যায় মানুষের। অমন সর্ষেক্ষেতের ওপারে তখন থমকে থাকা মেঘের মাথায় রূপোলী পাড় তার আশমানি রূপকথা বুনে দিতে চায় পৃথিবীকে ভালোবেসে। চাষী মানুষের একখানা পশমে বোনা মন নেই একথা মনে করেন বুঝি আপনারা! কালো ছাতা বসে বসে দেখে এসব। দেখতে দেখতে ওর খেয়াল যায়, দুপুর গড়িয়ে পড়েছে ধীরে।

সে কথা ভেবে ওর খানিক খিদেই পায় বুঝি। মায়ের কথা মনে পড়ে ওর। মায়ের মুখে আস্ত একখানা ভাতের থালা দেখতে পায় ও। খিদের সঙ্গে মা যে কেমন করে মিশে গেছে ওর চৈতন্যে, সে কথা ভেবে দেখবার মতো অবকাশ ওর হয়নি বুঝি কখনও। ও তাই একখানা ডুব দিয়েই তাড়াতাড়ি চান সারে। সারতে সারতেই ওর খিদে লাগে জোর। মায়ে ভাত বাড়ে। কলাই করা থালায় ধোঁয়া ওঠে। ভিজে হাওয়ায় শিরিশিরিয়ে ওঠে ওর আপাদমস্তক। মানুষ আর কী করে তখন! গরম ভাতের থালাখানা টেনে নেয় কোল ঘেঁষে! কাসি থেকে পিপুলের ডাঁটার চচ্চড়ি বেড়ে দেন মা। আলগা হাতে ভাত দে মেখে নিতে নিতে ওর জিভ ওর মগজ ভরে ওঠে ভিজে মাটির স্বাদে। ও টের পায় গাছেদের মতো, এই ভাতের পাশটিতে বসে কী আশ্চর্য সংশ্লেষে পিপুলের রসে মাটির লাবণ্যকে জড়িয়ে ধরছে ও, ওর সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে।

ছবি সৌজন্যে : betaapi.inscript.me

মায়ে বলে, 'ঘরে তো বাজার নাই পিলু! কুমড়া পাতা তুলছি খানিক। ভাগ্যি হাড়িতে ক’খান সিদোল তোলা ছিল!' সিদোলের কথায় পিলু ফিরে আসে ভাতের থালায়। এমন ভেজা একখানা দিনে পুঁটির শুঁটকি পেলে মানুষ আর কী চায়? পাতায় ভাজা ঝাল ঝাল সিদোল খেতে খেতে পিলুর মনে পড়ে ওর বাপের কথা, ইছামতীর পাড়ে ওদের ফেলে আসা মামার বাড়ির কথা। বাপে যে কী ভালোবাসতো! ছুরি শুঁটকি রাঁনলেই তাড়াতাড়ি মাঠের তে ফিরতো , বলতো, 'বউ খিলে লেগেছে, ভাত দে'। মায়ে আজকাল আর ছুরি শুঁটকি রাঁধে না, সে কি ওর বাপ মরে গেছে বলে? কী জানি, ওই গন্ধের সঙ্গে বুঝি বাপের হাসিখানা মিলে মিশে আছে।

রান্না তো কেবল আর জিভ দিয়ে খায় না মানুষ! রান্নায় মিশে থাকে সোহাগ আদর লোনা জলের দাগ। এসব কখনও বলে না পিলু, কিন্তু ও জানে মায়ে কেন ছুরি শুঁটকি রাঁনতে চায় না। বলে, 'আরেকটু ভাত দ্যাও মা। মায়ে জানে, সিদোল করলে পোলায় ভাত খানিক বেশিই খায়।' বলে, 'ভাবছিলাম, সিদোলের চাটনি দে তোরে চিতই পিঠা করে দিমু, সে দেবো নে আরেকদিন।' পোলা’য় ঘাড় নাড়ে। তিতা বলো পিঠা বলো ভাতের যুগ্যি কেউ না। ভাতের গরাস মুখে তুলতে তুলতে ওর তৃপ্তিরা তখন হিজল গাছের মতো ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে যেতে চায়। স্টিলের ফুলকাটা বাটিতে মরিচ রসুন ফোঁড়নের ডাল ঢেলে দেয় মা। চুমুক দিয়ে ডাল খাবে ছেলে। ছেলের খাওয়া দেখতে দেখতে মায় সব ভুলে যেতে চায়।

বাপের গড়ন পেয়েছে ব্যাটায়। অমন মুখ দেখলে মায়ের আবার মরিচ বাগাড় দে ছুরি শুঁটকি রাঁনতে সাধ যায়। এই গাঁয়ের ওই ওপাশে তিনআমতলা পেরোলে বাসুদেব মন্দির। মন্দির পেরোলে একখানা গঞ্জ। সেখানে রোববারে রোববারে হাট বসে। হাটে মানুষ কত! মুরগির বাচ্চা থেকে ধামা কুলো শুঁটকি, কী নেই!

বাপজানকে বলবে এখন, ভালো দেখে ছুরি শুঁটকি নে আসতে। বলতে বলতে মায়ে টের পায়, ছেলের ভাত কখানা শেষ। বলে, আর ভাত নিবি? নেয় না আর। এবারে হাপুস হুপুস করে পাকা চালতার টক খাবে কালো ছাতার ছেলে। গাছ পাকা চালতায় কী বাস! খেতে খেতে পোলায় বলে ওবেলা রান্ধিস না মা। মায় কয়, ক্যান? মুড়ি খাবি? না না, কালো মাথার ছেলে মুড়ি খাবে না। বাপের পারা ছেলে এমন মেঘ বাদলের দিনে বাপের মতো করি ল্যাটকা খিচুড়ি রাঁনবে মাকে ভালোবেসে। হাপুস হুপুস করে পাকা চালতার টক খাওয়া ছেলে তাই কালো ছাতাখানা ফেলে রেখে আবার মাঠে যায়। গেঁজে থেকে একখান চিকচিকি বের করে জমির তে ছাঁচি প্যাঁজ তোলে, কড়াইশুঁটি তোলে। তারপর ওই দূরে হেঁটে হেটে চলে যায় কালো ছাতার ছেলে। সেই যেখানে হলুদ ফুলের ওপারে রূপোলী মেঘের পাড় তার রূপকথাখানা বুনে দিতে চেয়েছে! সেই সেখানে। সেই রূপকথার রাজ্যি থেকে কুরুশে বোনা ফুল তুলে আনবে ছেলে। সর্ষে ফুলের গন্ধে তখন ভরে উঠতে চাইবে ওর করতল। বিকেল ফুরিয়ে সন্ধ্যে নামলে পর, লম্ফ জ্বেলে পাটখড়ি দে উনোন ধরাবে, আনাজ কাটবে। কাটতে কাটতে দু’কলি চটকা গানও কি গুনগুনিয়ে উঠবে না! উঠেবে উঠবে।

আঁচে পাতিল খানা বসিয়ে দিতে দিতে ওর মনে পড়বে বাপের মুখ, মায়ের মুখ। বাপের মতো করে খিচুড়ি রাঁধা হলে পোলায় এখন কুরুশ দিয়ে বোনা সর্ষে ফুলের বড়া ভাজবে ভারী যত্ন করে। গোটা গোটা ছাঁচি পেঁয়াজ আধ ডুবো হয়ে চেয়ে আছে খিচুড়ির পাতিল থেকে ওই। রাত খানিক বেড়েছে বোধহয় এতক্ষণে। পোলায় খিচুড়ি বেড়ে দেবে, বড়া সাজিয়ে দেবে কলাই করা থালায়। ওর রান্নাখানায় তখন রূপোলী মেঘের আলো ছড়িয়ে পড়তে চাইবে অকারণে। ঠিক যেন অবন ঠাকুরের গল্প। মায়ে ব্যাটায় বসে বসে ল্যাটকা খিচুড়ি খাচ্ছে ওই। ওদের গল্পে এসে পড়ছে বাপের কথা, নদীর কথা, শামলী গাইয়ের কথা। কথায় কথায় মা কত কথাই না বলছে আজ। বলছে, 'আর দিন গঞ্জের হাট তে ছুরি শুঁটকি কিনে আনবি পিলু?' পিলু কইছে না কিছু। কী কইবে পিলু! ও কেবল মুখ নীচু করে ছাঁচি প্যাঁজের খিচুড়ি খাচ্ছে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।