স্মৃতির ভিতর যে স্বাদের নিরন্তর চলাচল

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
স্মৃতির ভিতর যে স্বাদের নিরন্তর চলাচল

শীত এবারে খানিক নরম হয়ে আসছে। এই মাঘ মাসটুকুই বড় জোর, তারপরে হাওয়া ঘুরতে শুরু করবে। এইসব ভাবতে ভাবতে উনোনের কোল ঘেঁষে উবু হয়ে বসে আছে উনো কুঁজো বুড়ো। ওর লাঠিগাছখানা পাশে নামানো। ছটফটে ছাগলছানাও এখন খানিক শান্ত হয়ে বুড়োর কোল ঘেঁষে শুয়েছে। শরীরের ওম ভাগ করে নিচ্ছে ওরা আসলে। শিয়াকুলের পাতা ওদের পিঠে ছায়া আর আলোর জাফরি বুনে চাইছে কেবল। এইসব চাওয়া নিয়ে মাথা ঘামাতে বয়েই গেছে বুড়োর। সকাল সকাল পেট ভরে মাড়ভাত খেয়ে ও এখন মৌতাত করছে নরম রোদ্দুরে বসে বসে। এই তো শীতের কদিন। শীত ফুরোলেই আবার পান্তায় ফিরে যাবে ওর সকাল গুলো। তখন মচমচে ভাজা মরিচ ডলে নিতে নিতে ওর আমানিখানা রঙিন হয়ে উঠবে। ওইটুকু নিয়েই বুড়োর সুখ।

বুড়ির অবশ্য এসব দেখার সময় নেই, সকালে উঠে থেকে উনো কোটি কাজ নিয়ে তার সাংসারিক যাপন। সকাল মিটলে এবারে দুপুরের রাঁধাবাড়া। শাকে, ডালে, ঝোলে ঝালে ডুবে যাবার তখন অগাধ আয়োজন। মানুষ কি কেবল পেট ভরানোর জন্য রাঁধে? তা তো না। বুড়ি তাই মাথা নীচু করে ব্যস্ত হাতে শাক বাছে, কুটনো কাটে। বুড়ির বউমা ওই কোণে বসে বসে মশলা বাটে এক মনে। ওর কি এই গেরস্থালির কাজে মন নেই! কী জানি। বুড়ি এসব ভালো বোঝে না। এত বুঝতে গেলে আর সংসার চলে ক্যামনে! পোনকা শাকের ডাল আর মুলোর টক রাঁধতে রাঁধতে বুড়ি কত কী যে ভাবে। বউ এসে বলে, 'হলো মা? এবারে আপনি সরুন মাছের ঝালটা করে নিই!' বুড়ির এসব পছন্দ হয় না, এসব মাখা মাখা ঝালদা তার জিভে রোচে না। আহা! শীতের দিনে এমন বাটা মাছের পাতলা সর্ষেবাটা ঝোল ধনে পাতা ছড়িয়ে, সে যেন 'অম্মিতো'। তা বললিই বা শুনছে কে! বুড়ির জিভের তোয়াজ করতে বয়েই গেছে সক্কলের। তার শাউড়ি তাকে কত শেখালে, কত শেখালে তার দিদি শাউড়ি কিন্তু তা বললি কী হয়, বুড়ির মাথার মধ্যে কোন সে এক দেশ বাসা বেঁধেছে, সে খবর রাখে কে? কেউ রাখে না, রাখার দরকারই বা কী! বিয়ে হয়ে এসেছে সে এই এত্তগুলো বছর, এখনও তার বাপের বাড়ির স্বাদ সে ভুলতে পারলো না! এ কি কম অপরাধ হলো! মানুষের অভিপ্রয়াণের ইতিহাসে কি কেবল ভিটে মাটি আর শরিকি মকদ্দমার নির্যাস মিশে থাকে? মানুষের স্বাদও থাকে তো, স্মৃতির ভিতর তার নিরন্তর যাওয়া আসা কেবল। সেসব কি আর বললেই বেমালুম ভুলে যাওয়া চলে?

এসব বোঝে না কেউ, বুঝতে চায়ও না বুঝি। বুড়ি তাই নড়া দাঁতে নস্যি ডলতে ডলতে ওই দূরে গোরুদের ফ্যান খাইয়ে আনতে যায়। আনাজের খোসাপাতি আর ফ্যান খেয়ে কমলি একটু জিরোলে আবার বুড়ি ফিরে আসে নিকোনো দাওয়ায়। ওই কমলির ফ্যানজল খাওয়া দেখতে দেখতে বুড়ি ভাবে তার ছেলেবেলায় কেমন এই মাঘের বেলায় নতুন চালের ফ্যান দিয়ে ওর দিদিমা শাকের ঝোল রেঁধে দিতেন। সে ফ্যানের স্বাদ কত! সেসব ভেবে বুড়ি বড় করে শ্বাস ফেলে। কোন সেই ছেলেবেলায় ওরা বর্ত্তের ভাত রান্না করতো। সেসব ব্রতের ভাতে মিশে থাকতো আইবুড়ো নাম খণ্ডানোর ব্যাকুলতা। মাছ, মুখীকচু, থোড়, দই চিনি আর চাল দিয়ে রান্না হতো সে ভাত, লোকে বলতো ঘণ্টভাত। বুড়ির জিভে একেকদিন সেই স্বাদ এসে জড়ো হয়। বুড়ি তো কখনও লাইব্রেরির ক্যাটালগ দেখেনি, বুড়ি তাই টের পায় না, কেমন করে স্বাদের স্মৃতিরা মগজের ভিতর ঘুমিয়ে থাকে অকাতরে।

তবুও একেকদিন ওর ভারী ইচ্ছে করে লাউপাতায় সিদল শুটঁকি রান্না করতে। এসব রাঁধলে কেউ খাবে না জেনেও ওর ইচ্ছে করে। করলেই কি আর হয়! বউ মানুষের শাড়ির সাধ থাকতে আছে, নোলকের সাধ থাকতে আছে, তাই বলে জিভের সাধ! এই তো আর কদিনে মাঠে মাঠে লালতে শাক উঠবে, তখন সেই লালতে শাকের রসুন দিয়ে ঝোল আর লালতে শাক ভাজা। কেন রে, লালতের গিঁট চচ্চড়ি খেলে কি তোদের জাত যাবে? যাবেই তো। শ্বশুর ঘরে এসে থেকে ও শুনেছে, এ বাড়ির রান্না শিখে নে বউ। শিখেছেও সেসব। শিখতে শিখতে ওর জিভ আর মাথা কেবলই ফিরে গেছে কোন সে টিলা পাহাড় আর উপত্যকা পেরিয়ে হাওড়ের দেশে, বিল, বিলানের দেশে। সেই যেখানে এমন দিনে মাছ দিয়ে সরিষা শাকের হাতে মাখা ভর্তা খায় লোকে! সেই দেশে। কিন্তু সে তো আর ওর দেশ নয় এখন! এখন ওর স্বাদ কাহনে রাষ্ট্রেরও খানিক খানিক ভূমিকা আছে। একেকদিন সেসব পালিয়ে বুড়ি আতপ চাল বাটা দে, নারকেল কোরা দে চালতার অম্বল রাঁধে। সে অম্বলে মিশে থাকে নতুন গুড়ের গন্ধ। বুড়ো, বুড়োর ছেলে, ছেলের বউ সেসব ভালোবেসেই খায় কিন্তু ওরাও জানে এসব রোজের রান্না নয়। একটা দেশ পালানো মেয়ের খামখেয়ালীপনা এসব। খেয়াল মিটে গেলেই মেয়েটা আবার ফিরে আসবে অনুশাসনের আওতায়। বুড়ি এসব ভেবে ভেবে খানিক দুস্কু পায় বইকি, তবু দুস্কু নিয়ে সংসার চলে না। বুড়ি তাই শাউড়ির মতো করে ডাল রাঁধে পোনকা শাক দে, মুলোর টক রাঁধে। খেতে বসে বুড়ো খুশি হয়। বুড়োর ব্যাটা খুশি হয়। বুড়ো সুরুক সুরুক করে বাটিতে চুমুক দে টকের ঝোল খায়। বলে, 'বউ কাল শোল মাছ দে ঝাল টক রাঁধিস তো।' বুড়ি এসব কথার উত্তর দেয় না। বলে, 'আরও খানিক ভাত দেবো তোমায়?'

ভাত দিতে দিতে বেলা আরও খানিক বাড়ে। বুড়ির বউমা এসে পাশে বসে এতক্ষণে। এবারে শাউড়ি বউতে মিলে খাবে, এঁটো সকড়ির পাট চোকাবে। সেসব মিটলে পাটি পেতে বসবে বুড়ি। বসে বসে ও পাড়ার বিলের ঠাকুমার সঙ্গে গল্প করবে, হাতে হাতে পানের বাটা এগিয়ে দেবে। এবারে সরস্বতী পুজোয় গোটা সেদ্ধর বাজার কী হবে, কোন হাড়ি ঝালাই করতে দিতে হবে এসবই সে গল্পের সার। সে গল্পে শুনতে শুনতে কেউ টেরও পাবে না, আস্ত একখানা দেশ মাথার মধ্যে নিয়ে, আস্ত একটা জীবন কেমন কাটিয়ে দিল বুড়ি। বেমালুম।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।