লালবাজারের 'হাট' থেকে গোরা সাহেবের লড়াই, পুরনো কলকাতা-র দোল-কিসসা

rudranjan
৪ মিনিট
লালবাজারের 'হাট' থেকে গোরা সাহেবের লড়াই, পুরনো কলকাতা-র দোল-কিসসা

‘দেখো আলী হোরি খেলত, নন্দলাল রে

সঙ্গ লিনি আপনি কয়ি গোয়াল বাল রে।

রঙ্গ ভরি পিচকারী লিয়ে করমে মুরারি,

নাচত, গাওত, হাসত, ফিরত,

রঙ্গত গোপিয়ন কী নয়ি সারি’

রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে আছে রঙের কোলাজ। ফুটপাথের খাঁজে-খাঁজে সুগন্ধি আবিরের প্রলেপ। ‘আভা’, ‘চন্দনা’, কতরকম তাদের নাম। ওপাশ থেকে ভেসে আসছে খোল-করতালের শব্দ। দক্ষিণ কলকাতা-র প্রতাপাদিত্য রোড অঞ্চলে দোলৎসবের প্রভাতী সেরে মঠে ফিরছেন একদল গৌড়ীয় বৈষ্ণব। কানে আসছে কীর্তনের মিঠে সুর। তাদের কোনোটা পরজ, কোনোটা আবার বসন্ত। পুরবী-র কোমল ধৈবতের পর মধুবন্তি-র কোমল গান্ধারের ব্যবহার বোধহয় একমাত্র বাংলাদেশের কীর্তনেই সম্ভব। খানিক দূরে লালপাড়া-র কিশোর-কিশোরীরা বারান্দার চৌহদ্দিতে সাজিয়ে রাখছে রঙের বালতি। খানিক পরেই শুরু হবে দোল খেলা। ঘণ্টা তিন-চারেকের নির্ভেজাল আনন্দ। তারপর গুমোট ঘুমে ঢলে পড়বে পাড়া। নির্জন দুপুরে একলা পাক খেয়ে যাবে আবিরের গন্ধ মাখা বসন্ত বাতাস। এর কিছুদিন পরেই শোনা যাবে টি এস এলিয়ট বর্ণিত ‘নিষ্ঠুর এপ্রিল’-এর পদধ্বনি। বসন্তের এমন দারুণ মর্মবেদনাকে কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া আর কেই বা বুঝেছেন।

আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে দোলের দিন কলকাতা শহরের রঙ খেলার চিত্রটা ঠিক আজকের মতো ছিল না। স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যমভ্রাতা মহেন্দ্রনাথ দত্ত তার কিছুটা বর্ণনা দিয়েছেন। বাজারে তখনও প্যাকেটে করে কেমিকেল রঙ বিক্রি করার প্রথা চালু হয়নি। জলের মধ্যে আবির গুলে সেই রঙিন জল দিয়ে দোল খেলতেন কলকাতাবাসী। এ ছাড়াও শোলার নুটির ভেতর আবির ভর্তি করে বাচ্চারা একে অন্যের শরীর তাক করে ছুঁড়ে মারতেন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ছিল অঢেল। চিনির মুড়কি, চিনির মট, ফুটকড়াইয়ের মতো নানান খাবার সাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় এ দিন মহাভোজ চলত। মহেন্দ্রবাবু উনিশ শতকের শেষদিকের কথা লিখছেন। এর আরও কিছু আগে, অর্থাৎ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় জানবাজারে রাণী রাসমণি-র বাড়িতেও ধুমধাম করে দোল উৎসব পালন করা হত। রাসমণি-র বাড়ির উঠোন এ দিন আবিরের রঙে সেজে উঠত। নানান মানুষ তাঁর পায়ে একমুঠো আবির দিয়ে প্রণাম সাড়তে সেখানে এসে উপস্থিত হতেন।

একদল মনে করেন, মধ্য কলকাতার লালদিঘি বা লালবাজার অঞ্চলের নামকরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দোলৎসব। বর্তমানের লালবাজারে নাকি দোল উপলক্ষে সে সময় বিরাট মেলার আয়োজন করা হত। বিক্রি হত নানান রঙের আবির থেকে শুরু করে হরেকরকমের কুমকুম। বিভিন্ন মানুষ সেই মেলায় আসতেন, নিজেদের পছন্দ মতো দোলের সামগ্রী কিনে নিয়ে যেতেন। সেই থেকেই নাকি সে অঞ্চলের নাম হয়ে যায় লালবাজার। এ ছাড়াও এখনকার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ঠিক পেছনে ছিল লালদিঘি। সেই দিঘির একধারে শ্যামরায়ের মন্দির। দোলের দিন নাকি কাতারে কাতারে মানুষ জড়ো হয়ে রঙ মাখাতেন রাধাকৃষ্ণের মূর্তিতে। সেই রঙে দিঘির জল লাল হয়ে উঠত। সেখান থেকেই নাম লালদিঘি।

এই লালদিঘি-র দোল খেলাকে কেন্দ্র করেই একটা ধুন্ধুমার গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীর কথা। তখন লালদিঘির মালিক ছিলেন ডাকসাইটে জমিদার লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার। শ্যামরায়ের বিগ্রহও ছিল তাঁদের পারিবারিক সম্পত্তি। দোলের দিন এই বিগ্রহকে কেন্দ্র করে আশেপাশের অঞ্চলে ব্যাপক শোরগোল পড়ে যেত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন আসতেন মজা দেখতে। সে সময় বিশেষ কোনও কারণে লালদিঘি থেকে শ্যামরায়ে-র মূর্তি সরিয়ে কালীঘাটে নিয়ে গিয়ে রাখা হয়েছিল। সেখানেই নিয়মিত পুজো পেতেন তাঁরা। তবে দোলের দিন তাঁদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসা হত মন্দিরে। এই লালদিঘিই নাকি একসময় ইংরেজদের সান্ধ্য ভ্রমণের জায়গা ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিস্তর কাঠ-খড় পুড়িয়ে তাঁরা দিঘি সংস্কার করেছিলেন। তা যাই হোক, ঘটনাটা ঘটেছিল দোলের দিন। মজুমদারদের বাড়িতে সেদিন তিল ধারণের জায়গা নেই। হাজার হাজার মানুষ রঙ মেখে আনন্দ উদযাপনে ব্যস্ত। ঠিক এমন সময় কয়েকজন ইংরেজ সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। ‘নেটিভ’দের রঙ খেলার দৃশ্য দেখে তাঁদের বড়ই আমোদ হল। গন্ধে গন্ধে বাড়ির চৌহদ্দি ডিঙিয়ে ঢুকে পড়লেন ভেতরে।

দোল চলছিল পুরোদমে। হঠাৎ দেউড়ির ভেতরে দারুণ গণ্ডগোল শুরু হল। ঝড়ের বেগে সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন মজুমদারদের মোক্তার অ্যান্টনিসাহেব। তিনি অবশ্য ইংরেজ ছিলেন না। অ্যান্টনি সাহেবে এসেছিলেন খাস পর্তুগাল থেকে। ইংরেজ সৈন্যদের বাড়িতে ঢুকতে দেখেই তিনি তাঁদের হুঁশিয়ারি দিলেন। আর এক পাও যেন তাঁরা না এগোয়, এগোলেই বিপদ। সবাই তো অবাক, ব্যাপারখানা কী? আসলে ইংরেজদের উপর অ্যান্টনিসাহেব ছিলেন হাড়ে হাড়ে চটা। তিনি থাকতে কয়েকজন ‘ম্লেচ্ছ’ ইংরেজ নির্বিঘ্নে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়বে, তা কি কখনো হয়? আশেপাশের মানুষজন তখন রঙ খেলা থামিয়ে চুপটি করে মজা দেখছেন। একদিকে রাগে অগ্নিশর্মা অ্যান্টনিসাহেব, অন্যদিকে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ইংরেজ-দের ছোট্ট সেনাদল।

ততক্ষণে খবর পৌঁছে গেছে জব চার্নকের কাছে। সব কাজ ফেলে তিনি তড়িঘড়ি ছুটে এসছেন মজুমদার বাড়িতে। এরপরেই তিনি রাগে ফেটে পড়লেন, ‘কি, এতবড় সাহস, আমার লোকেদের বাঁধা দেওয়া? আজ তোমার একদিন কী আমারই একদিন।’ অ্যান্টনি-র উপর চড়াও হয়ে এলোপাথাড়ি চাবুক চালাতে লাগলেন চার্নক সাহেব। অ্যান্টনিসাহেব পাল্টা প্রতিবাদ করার সুযোগটুকুও পেলেন না। চার্নকের কাছে পরাজিত হয়ে তিনি কোনোরকমে মান-সম্মান বাঁচিয়ে কাঁচরাপাড়া পালালেন। তারপর আর তাঁকে কোনোদিন লালদিঘির আশেপাশে দেখা যায়নি।

তথ্যঋণ

‘কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা’- মহেন্দ্রনাথ দত্ত

‘বাবু বিবি সম্বাদ’- অর্ণব সাহা

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।