দোস্তি বনি রহে

Trump-Modi Friendship: বারবার এক অপরের বক্ষলগ্ন হয়ে সমাজমাধ্যমে ছবি প্রচার করেছেন। জোর গলায় দাবি করেছেন, আমরা বন্ধু। কিন্তু এ কেমন ঘনিষ্ঠতা যেখানে পিছন থেকে নয় সামনে থেকেই ‘বন্ধু'র পিঠে ছুরি মারা যায়?

Arka Deb
৩ মিনিট
দোস্তি বনি রহে

হাত বাড়ালেই বন্ধু সবাই হয় না। কিন্তু যে সখ্য ও সমঝোতা আমরা দেখে আসছি বছরের পর বছর, তাকে কী নামে ডাকব? মোদী-ট্রাম্পের সম্পর্কের ভিয়েন নিয়ে প্রশ্নটা উঠছে, ভারতের উপর ট্রাম্প ২৫% পণ্যশুল্ক এবং জরিমানা চাপানোর পর। এই ট্রাম্পের প্রচারে বারবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছুটে গিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। বারবার এক অপরের বক্ষলগ্ন হয়ে সমাজমাধ্যমে ছবি প্রচার করেছেন। জোর গলায় দাবি করেছেন, আমরা বন্ধু। কিন্তু এ কেমন ঘনিষ্ঠতা যেখানে পিছন থেকে নয় সামনে থেকেই ‘বন্ধু'কে ছুরি মারা যায়? দার্শনিকরা এমন বন্ধুত্বের তল পেয়েছেন কি?

অ্যারিস্টটল বলেছেন, বন্ধুত্ব তিন রকম। একরকমের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে শুধুই ফূর্তির জন্য, ফ্রেন্ডশিপ অফ প্লেজার। অন্য আরেক ধরনের বন্ধুত্বে দুই পক্ষই মিতালিকে কাজে লাগায় কিছু তাৎক্ষণিক সুবিধের জন্য। সেই সুবিধা নেওয়া ফুরিয়ে গেলে বন্ধুত্বের দাবিও ফিকে হয়ে যায়, একে অন্যেকে গোল্লায় যাও বলা যায়। আর এক ধরনের বন্ধুত্ব রয়েছে যা কখনও সখনও চিরস্থায়ী হতে পারে। অ্যারিস্টটলের ভাষায় তা সদগুণের বন্ধুত্ব। ট্রাম্প মোদীর বন্ধুত্ব দার্শনিক জায়গা থেকে দেখলে তা ওই মধ্যপন্থার। অর্থাৎ তাৎক্ষণিক লাভের জন্য একে অন্যের আলোকছটা শুষে নেওয়ার বন্ধুত্ব।

মোদী-ট্রাম্পের বন্ধুত্ব

সাম্প্রতিক অতীতে বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর কথাটা বলেই ফেলেছিলেন। বহুভাষাবিদ জয়শঙ্করের কথায়, “আসলে এক জাতীয়তাবাদী আর এক জাতীয়তাবাদীকে এইভাবেই সম্মান প্রদর্শন করে। একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে।” একথাটির খোসা ছাড়িয়ে নির্যাসটুকু পড়তে চাইলে বোঝা যাবে, আসলে জাতীয়তাবাদকে শিখণ্ডী করে প্রচার ও প্রসারের দুই রাজনেতাই যে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে চেয়েছিলেন, তাতে একে অন্যের নিরঙ্কুশ সহযোগিতা দরকার ছিল। আর সে কারণেই টেক্সাসের হিউস্টনে হাউডি মোদীর আয়োজন। মোদী বারবার বলেছেন, আমেরিকাকে ফের মহান করে তোলার জন্য ট্রাম্পের তাগিদ নাকি তাঁকে অভিভূত করে। ট্রাম্প নিশ্চয় স্মৃতিধর, তাই ভারতকে বংশদন্ড হাতে ধরিয়ে দেওয়ার সময় তিনি তাঁর বিবৃতির শেষে জুড়ে দিয়েছেন একটি অমোঘ শব্দবন্ধ MAGA, যার অর্থ মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন।

মোদীর বক্ষলগ্ন ট্রাম্প

শেষ কয়েক বছরে বন্ধুত্বের নিদর্শন রাখতে ট্রাম্প মোদী কোনোপক্ষই কোনো কসুর করেনি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোদীর নামাঙ্কিত স্টেডিয়াম উদ্বোধন করতে সপরিবারে ভারতে এসেছেন ট্রাম্প। প্রতিবার ট্রাম্পের জয়ের পর মোদী সমাজমধ্যমে জয়োল্লাসে ফেটে পড়েছেন, আবার ট্রাম্পও মোদীর নাম মুখে আনার সময় ‘বন্ধু’ শব্দটি জুড়ে দিয়েছেন। সেই ট্রাম্পই ভারতের উপর ২৫ শতাংশ শুল্কনীতি চাপিয়ে দিলেন। পাকিস্তান বাংলাদেশের উপর চাপানো হল ১৯ ও ২০ শতাংশ। ভারতকে সবক শেখাতে চাপালেন জরিমানাও। রাশিয়ার সঙ্গে সখ্যের 'শাস্তি'।

ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদী

আসলে যে বন্ধুত্ব শুধুই ব্যবহারিক সেখানে স্বার্থের বাইরে কোনোপক্ষই একটি পা-ও ফেলে না। চিনের সঙ্গে পাকিস্তানের নৈকট্যকে রোধ করতে ট্রাম্পের দরকার পাকিস্তানের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ। পাকিস্তানের নতুন সরকার মার্কিন 'পাপেট' বললে অত্যুক্তি হবে না। অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সম্প্রতি রাশিয়াকে ইউক্রেন প্রশ্নে কোনঠাসা করতে শুরু করেছে পশ্চিমা বিশ্ব। সেই রাশিয়া থেকেই ভারত যখন সস্তা দরে জ্বালানি কিনছে, ট্রাম্প তখন বন্ধুত্বের যাবতীয় পুরোনো প্রথা, রীতিনীতি বিসর্জন দিতে একবারও দ্বিধা করছেন না। স্টেপআউট করে বলছেন, ভারতের অর্থনীতি মৃতপ্রায়। ভারত-রাশিয়া গোল্লায় যাক!

ভারতবর্ষে উগ্র জাতীয়তাবাদী হওয়া বইয়ে দিতে নরেন্দ্র মোদীর যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো উত্তর-সত্যে বিশ্বাসী রাষ্ট্রনায়কের প্রয়োজন ছিল, তেমনই ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রয়োজন ছিল মোদীর মতো একজন নেতা। যিনি ভোট এলে একদিকে নিজেকে যেমন বিশ্বগুরু সাজিয়ে তোলেন, অন্যদিকে ঠিক ট্রাম্পের ঢংয়েই অপরায়ন শুরু করেন। “ওদের বেশি বাচ্চা”, “ঘুসপেটিয়া” শব্দগুলি আকছার বলেন জনসভায় দাঁড়িয়ে। এমনকি আজ যেমন মোদীর ভারতে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে একদল মানুষকে ‘ঘাড়ধাক্কা’ দেওয়া হচ্ছে, ঠিক তেমনই বেনাগরিক দাগিয়ে ট্রাম্পের আমেরিকা থেকে তাড়ানো হয়েছিল বহু সাধারণ মানুষকে। হাতে হাতকড়া, পায়ে শিকল বেঁধে যখন কয়েকশো ভারতীয়কে অমৃতসর ফেরত পাঠাল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, কিচ্ছুটি বলেননি মোদী। কারণ ভয় দেখানো, খেদানো, দূরে ঠেলে দেওয়ার রাজনীতিতে তাঁরা একে অন্যের পরিপূরক। যে কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করতে পারেন মেক্সিকান অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের বক্তব্য মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির প্রচারকৌশলের সঙ্গে কেমন মিলে যায়।

এই বন্ধুত্ব ঠিক এমন দেওয়া-নেওয়ারই। সেই দেওয়া-নেওয়া ফুরোলে কী পড়ে থাকে? আজ যখন আসীম মুনিরের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সারছেন ট্রাম্প, মুখে বলছেন: ভারত গোল্লায় যাক, মোদীকে বন্ধুত্বের জন্যে খোঁটা দিচ্ছে তামাম বিরোধীরা, মোদী ট্রাম্পকে নিভৃত আলাপে কী বলবেন? অভিমান দেখাবেন? নাকি বলবেন দোস্তি বনি রহে?

লিখেছেন
Arka Deb
Arka Deb
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।