বিশ্বজুড়ে দারিদ্রের চরমসীমায় পৌঁছে যাবে লাখ লাখ মানুষ, কোথায় দাঁড়িয়ে ভারত?

করোনাভাইরাস অতিমারীর প্রথম পর্যায়ে বিশ্বের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে সবাই কম-বেশি চিন্তিত ছিলেন। ভারত-সহ অন্যান্য দেশে বহু মানুষই আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন এই কোভিডের লকডাউনের সময়কালে। কিন্তু, এই আর্থিক ক্ষতির সময়ের মধ্যেই একটি নতুন রিপোর্ট সামনে এসেছে গত সোমবার, যেখানে দাবি করা হয়েছে, করোনাভাইরাস-জনিত লকডাউনের সময় নাকি প্রতি ৩০ ঘণ্টায় তৈরি হয়েছেন একজন করে নতুন বিলিয়নিয়ার। আন্তর্জাতিক অ-লাভজনক প্রতিষ্ঠান অক্সফ‍্যাম ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে সারা বিশ্বে। দাভোসের সুইস টাউনে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সভা চলাকালীন সময়ে একটি বিবৃতিতে এই কথা ঘোষণা করেছে ওই সংস্থাটি। তাদের ওই রিপোর্টের নাম দেওয়া হয়েছে, 'প্রফিটিং ফ্রম পেইন'।

 

তাদের রিপোর্টে অক্সফ‍্যাম ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, এই করোনাভাইরাসের লকডাউন এবং তার পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বের সর্বমোট ৫৭৩ জন মানুষ বিলিয়নিয়ার হয়ে উঠেছেন। অর্থাৎ, হিসেব করে দেখতে গেলে প্রতি ৩০ ঘণ্টা অন্তর একজন করে ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন বিলিয়নিয়ার। তবে এই রিপোর্টের অন্য আরেকটি দিকও রয়েছে, যেখানে সেই সংস্থা জানিয়েছে, ২০২২ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের ২৬৩ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্রের চরমসীমায় পৌঁছবেন, অর্থাৎ, প্রতি ৩৩ ঘণ্টায় ১ মিলিয়ন মানুষ। ওই রিপোর্টের বক্তব্য, বর্তমানে সারা বিশ্বে বিলিয়নিয়ারদের কুক্ষিগত মোট সম্পত্তির পরিমাণ, সারা বিশ্বের গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্টের প্রায় ১৩.৯ শতাংশের কাছাকাছি। ২০০০-এর পর থেকে এই অনুপাত প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০০ সালের আগে পর্যন্ত বিলিয়নিয়ারদের কুক্ষিগত সম্পত্তির পরিমাণ ছিল, সারা বিশ্বের গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্টের ৪.৪ শতাংশ, যেখানে আজ এই সংখ্যাটা এর প্রায় ৩ গুণ।

 

রিপোর্টে আরও জানানো হয়েছে, খাদ্য এবং এনার্জি সেক্টরে যে সমস্ত বিলিয়নিয়ার কাজ করেন, তাদের সম্পত্তির পরিমাণ এই অতিমারীর সময়ে প্রতি দুই দিন অন্তর ১ বিলিয়ন ডলার করে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে ২,৬৬৮ জন বিলিয়নিয়ার রয়েছেন। এই সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে, এই মুহূর্তে আবিশ্ব যত জন মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে রয়েছেন, তাদের সমস্ত সম্পত্তি মিলিয়ে হিসাব করলেও, তার থেকে বেশি সম্পত্তি রয়েছে বিশ্বের বেশ কয়েকজন বিলিয়নিয়ারের কাছে। বিলিয়নিয়ারদের তালিকার শীর্ষে থাকা ১০ জনের সম্পত্তির পরিমাণ সারা বিশ্বের দারিদ্রসীমার নিচে থাকা ৪০ শতাংশ মানুষের থেকেও বেশি।

 

আরও পড়ুন: দেশের নব্বই শতাংশের রোজগার এতটা নিচে! সরকারি নথিতে স্পষ্ট ভারতের অর্থনীতির চেহারা

 

এই সংস্থার এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর গ্যাব্রিয়েলা বুচার জানিয়েছেন, "দাভোস শহরে এসে বিশ্বের সমস্ত বিলিয়নিয়াররা তাদের সাফল্যের পার্টি করছেন। এই প্যানডেমিকের সময় প্রায় প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে খাদ্যদ্রব্য এবং সমস্ত ধরনের শক্তি উৎসের দাম। যেমনভাবে দাম বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশস্যের, ঠিক তেমনভাবেই দাম বৃদ্ধি হয়েছে পেট্রোল, ডিজেল এবং অন্যান্য জ্বালানির। কিন্তু বিলিয়নিয়ারদের জন্য এটাই হয়ে উঠেছে সুযোগ। একটা সময় এমন ছিল, যখন দারিদ্র ছিল একটা সমস্যা। সেই সময় সমাজের একটা অংশের মানুষ খাদ্যের অভাবে অনেকটা কষ্ট করতেন। এই বিষয়টা এখন অনেকটা পরিবর্তিত হয়েছে। এখনকার দিনে দারিদ্র শুধুমাত্র আর সমাজে একটা অংশের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটা এখন একটা বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা বিশ্বের মানুষ এই সমস্যার মধ্য দিয়ে লড়াই করছেন। ন্যূনতম খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু টাকা প্রয়োজন, তাও এখন অনেকের কাছে বাড়ন্ত। কিন্তু তার মধ্যেই সুবিধে করে নিয়েছেন কিছু বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষ। তাদেরকেই আজ এই সমাজ বিলিয়নিয়ার বলে বরণ করে নিয়েছে।"

 

বুচার আরও বললেন, "এই মুহূর্তে বিলিয়নিয়ারদের ভাগ্য অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। তবে এটা তাদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্য কিন্তু নয়। বরং তারা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সমাজের মধ্যে কিছু সমস্যার সৃষ্টি করে এসেছেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাঁরা খাদ্যের অভাব তৈরি করে এসেছেন, জ্বালানির অভাব তৈরি করে এসেছেন। সেই সময় তাঁদের কাছে এটা আয় করার একটা রাস্তা ছিল শুধুমাত্র। কিন্তু করোনাভাইরাস অতিমারীর সময় এই বিষয়টা আরও ভয়ংকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা বিশ্বে শুরু হয়েছে খাদ্যের অভাব। পুঁজিপতিদের লোভ-লালসার শিকার হয়েছেন বহু মানুষ। যেভাবে তাঁরা এত বছর ধরে সিস্টেমে পুরোপুরি ঘুণ ধরিয়ে দিয়েছেন, শুধুমাত্র সেই সিস্টেমের জোরেই আজ তাঁদের আঙুল ফুলে-ফেঁপে হয়ে উঠেছে কলাগাছ। আগামী ২০ বছর ধরেও বিশ্বের সমস্ত পুঁজিপতিরা এভাবেই লাভ গ্রহণ করবেন এই ঘুণ ধরে যাওয়া সিস্টেমের। অন্যদিকে, দারিদ্রের অন্ধকারে ডুবে যেতে শুরু করবে আরও কিছু পরিবার।"

 

ভারতের ক্ষেত্রে ছবিটা কীরকম?

গত এপ্রিলে ভারতে খাদ্য এবং শক্তি পণ্যের দামে একটা বিশাল মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ করা গিয়েছিল। এপ্রিল মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকেও এরকমই একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাদের প্রকাশিত মুদ্রাস্ফীতির খতিয়ান থেকে। ১২ মে প্রকাশিত ওই খতিয়ানে সরাসরি দেখা যায়, মুদ্রাস্ফীতি সবথেকে বেশি প্রভাব ফেলেছে মূলত মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের আর্থিক পরিস্থিতির ওপরেই। আর এই মুদ্রাস্ফীতির সবথেকে বড় প্রভাব পড়েছে তাদের জীবনযাত্রার মানের ওপর। ভারতের অর্থ দপ্তরের প্রকাশিত ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা ছিল, মুদ্রাস্ফীতির সবথেকে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং ভারতের সবথেকে দরিদ্র শ্রেণির মানুষের ওপর।

 

এই রিপোর্ট তৈরির জন্য ভারতীয় জনগণকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। প্রথমত, দরিদ্র এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত ২০ শতাংশ, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত ৬০ শতাংশ এবং উচ্চবিত্ত ২০ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকাও তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়- খাদ্য-পানীয়, জ্বালানি-বিদ্যুৎ এবং পরিশোধিত খনিজ দ্রব্য (খাদ্যপণ্য এবং জ্বালানি তৈল বাদ দিয়ে)।

 

এই রিপোর্টের পরিসংখ্যান থেকে উঠে এসেছিল, কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স ২০২১-'২২ অর্থবর্ষে নেমে এসেছিল ৫.৫ শতাংশে, যার মধ্যে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত বর্গের মানুষেরাই। তার পাশাপাশি, ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অর্গানাইজেশনের একটি তথ্য থেকে উঠে আসে, এই মুহূর্তে ভারতের আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের খাদ্যদ্রব্যের থেকেও বেশি খরচ হয়ে থাকে অত্যাবশ্যকীয় অন্যান্য সামগ্রীর উপর। বিদ্যুতের খরচ, জ্বালানি তেল, শিক্ষাখাতে খরচ থেকে শুরু করে আরও অন্যান্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ এই মুহূর্তে অনেকটাই বেশি। যেখানে একটা সময় ২০১১ সালে খাদ্যের জন্যই খরচ হতো বেশি, সেখানে আজ চিত্রটা সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। শুধুমাত্র শহর কিংবা শহরতলি এলাকায় না, গ্রামের দিকেও এই চিত্রটা কিন্তু একই।

 

শহরের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ মানুষ এমন রয়েছেন, যাঁদের পক্ষে এই ধরনের জ্বালানির খাতে খরচ করাটা খুব একটা সমস্যার নয়, কিন্তু গ্রামের দিকে এই হিসেবটা ১০ শতাংশে গিয়ে ঠেকে যায়। অর্থাৎ বাধ্য হয়েই, গ্রামীণ মানুষকে খাদ্যের খরচ কমাতে হচ্ছে বইকি! খাদ্যের খরচ বাদে অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের খরচ প্রতি মাসে পরিবর্তিত হলেও, এই মুহূর্তে যা ট্রেন্ড, তা দেখে বোঝা যাচ্ছে, প্রতি মাসে এই খরচ ক্রমাগত বাড়ছেই। সেই অবস্থায় এবার যদি খাদ্যদ্রব্যের দামও বৃদ্ধি পায়, তাহলে ভারতের গ্রামীণ সাধারণ মানুষের সমস্যা তো বাড়বেই, শহর এবং শহরতলির মানুষের জন্যও সমস্যা মাথা চাড়া দিতে শুরু করবে। ভারতে এক বছর আগে যেখানে সার্বিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৪.২৩ শতাংশ, সেখানেই এই মুহূর্তে সার্বিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৭.৭৯ শতাংশ এবং শুধুমাত্র খাদ্যের মুদ্রাস্ফীতির হারও ১.৯৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৮.৩৮ শতাংশ, যা রীতিমতো চিন্তার বিষয় সাধারণ মানুষের জন্য।

 

মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব

যদি কোনও অঞ্চলে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়, তাহলে তার সবথেকে ক্ষতিকর প্রভাবটা পড়ে নিম্ন এবং মধ্য আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রেই। কোনও একটি সময় মুদ্রাস্ফীতি দেখা গেলে, যে-কোনও দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়। তার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা অসম লড়াই। বিশ্ব ব্যাঙ্কের একটি অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকে উঠে এসেছে, মুদ্রাস্ফীতির সময়ে যে কোনও দেশের কোনও একটি নিম্নবিত্ত পরিবার; সেই দেশের একটি উচ্চবিত্ত পরিবারের থেকে গড়ে ৩ শতাংশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ, যদি সারা দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার হয় ১০ শতাংশ, সেখানেই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতির হার ১৩ শতাংশ হয়ে দাঁড়ায়।

 

যদি এরকমভাবেই মুদ্রাস্ফীতি চলতে থাকে, তাহলে সারা বিশ্বে আরও ৭.৫ শতাংশ থেকে ৯.৫ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে পৌঁছে যাবে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট ডেভিড মালপাস তার একটি বক্তৃতায় জানিয়েছিলেন, "সাধারণ মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় বৃদ্ধি না হলেও সারা বিশ্বে মূল্যবৃদ্ধি তরতরিয়ে বাড়তে শুরু করেছে। যদি সারা বিশ্বে ১ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, তাহলেও প্রায় ১ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে পৌঁছে যেতে পারে।" সেখানেই, সারা বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতির হার অনেকটাই বেশি; তাই অনেক বেশি মানুষ যে মুদ্রাস্ফীতিজনিত সমস্যার মধ্যে পড়বেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

মালপাস উল্লেখ করেন, মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে সবথেকে বেশি সমস্যার মধ্যে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষরাই। উচ্চবিত্ত মানুষদের ক্ষেত্রে কিছুটা সময়ের জন্য দামি জিনিস কেনা অনেকটাই সহজ। কিন্তু, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সেই জিনিসটা সবসময় কেনা সহজ নয়। এর ফলেই সারা বিশ্বে বাড়ছে অপুষ্টি এবং ম্যালনিউট্রিশনের মতো রোগ। অপুষ্টির জন্য সারা বিশ্বে মৃত্যু হচ্ছে শিশুদের। ভারতও এই তালিকার বাইরে নয়। এই দেশেও ঠিক একইরকমভাবে সমস্যা রয়েছে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে। লকডাউন-পরবর্তী সময়ে অনেকেই নিজেদের চাকরি খুইয়েছেন। আয় করার কোনও বিকল্প পথ খুঁজে না পাওয়ার দরুন, অনেকেই খুঁজে নিয়েছেন আত্মহত্যার পথ, অনেকে আবার দারিদ্রের নিম্নসীমায় অবতীর্ণ। এই লকডাউন অনেককেই করেছে সর্বস্বান্ত; আবার অনেকের কাছেই খুলে দিয়েছে লাভের গুড় খাওয়ার রাস্তা। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে তরতরিয়ে, 'ধনী হচ্ছেন আরও ধনী, আর গরিব হচ্ছেন আরও গরিব।'

More Articles

;