বাপ্পি লাহিড়ী থেকে অভিষেক চট্টোপাধ্যায়, ২০২২-এ যাঁদের মৃত্যু কাঁদিয়েছে আমজনতাকে
Eminent People death 2022 : নিজেদের কাজ, সৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁরা। সেরকমই কয়েকজনকে বছর শেষের মুহূর্তে স্মরণ করে নেওয়া…

একটু একটু করে আরও একটা বছর শেষের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে পৃথিবী। হাতে গোনা কয়েকটা দিন, তারপরই নতুন সকাল, নতুন দিনের আগমন। আসবে ২০২৩, নতুন বছর। ২০২২-এ পৃথিবী দেখেছে অনেক ঘটনার ঘনঘটা। দেখেছে বিশ্বকাপের মহারণ। স্বপ্নপূরণ, হতাশা, হাসি কান্নার মধ্যে দিয়ে কেটে গিয়েছে একটা গোটা বছর। আনন্দের পাশাপাশি এসেছে মন খারাপ। ২০২২-এও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন অনেক প্রথিতযশা মানুষ। নিজেদের কাজ, সৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁরা। ইতিহাসের অঙ্গ হয়ে গিয়েছেন। সেরকমই কয়েকজনকে বছর শেষের মুহূর্তে স্মরণ করে নেওয়া…
শাঁওলি মিত্র (১৬ জানুয়ারি)
কেবল শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্রের মেয়ে হিসেবেই তাঁর পরিচয় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলার নাট্যচর্চার ইতিহাসে শাঁওলি মিত্র নিজেই একটা অধ্যায়। একটা সময়। ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’র ‘বঙ্গবালা’ উপহার দিয়েছেন ‘নাথবতী অনাথবৎ’, ‘বিতত বীতংস’, ‘কথা অমৃতসমান’-এর মতো নাটক। ২০২২-এর শুরুতেই ৭৩ বছর বয়সে চলে গেলেন বঙ্গ নাট্যমঞ্চের এক স্রষ্টা, শাঁওলি মিত্র।
পণ্ডিত বিরজু মহারাজ (১৭ জানুয়ারি)
ঠিক যেন পরপর বজ্রাঘাত। শাঁওলি মিত্রের মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই চলে গেলেন পণ্ডিত বিরজু মহারাজ। তাঁর নাচ, তাঁর কত্থক, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত যেন কবিতার মতো ছড়িয়ে পড়ত মঞ্চে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকত জনগণ। পণ্ডিতজির মৃত্যু যেন একটা যুগের পরিসমাপ্তি; শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্যের আঙিনায় যে ক্ষতি কখনই পূরণ হওয়ার নয়।
নারায়ণ দেবনাথ (১৮ জানুয়ারি)
এ বছরের শুরুর দিকে ভারতীয় সাহিত্যের ইন্দ্রপতন। নারায়ণ দেবনাথ বাংলার কমিক মানচিত্রের সম্রাট। বহু বছর পেরিয়ে আজও তাঁর সৃষ্ট ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ‘হাঁদা ভোঁদা’, ‘নন্টে ফন্টে’ ছোটদের ভরসা। যুগ যুগ ধরে বাংলার শিশুদের বন্ধু হয়ে গিয়েছেন তিনি। ২০২১ সালে পদ্মশ্রী পেয়েছিলেন। কিন্তু নিতে যাওয়ার মতো শরীরের জোর আর ছিল না। তাঁর মৃত্যুতে সাহিত্যের একটা উজ্জ্বল যুগের অবসান হল।
লতা মঙ্গেশকর (৬ ফেব্রুয়ারি)
তিনি ভারতরত্ন। ভারতের কোকিল। তাঁর নামই হল তাঁর পরিচয়। লতা মঙ্গেশকরকে নতুন করে পরিচয় করার ধৃষ্টতা বোধহয় কারও নেই। বছরের শুরুর দিকেই তাঁর মৃত্যুর সংবাদ যখন সামনে আসে, ভেঙে পড়ে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী। তাঁর গানে, প্রতিভায়, সৃষ্টির জাদুতেই তাঁকে স্মরণ করা। ভারতের সঙ্গীতের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন তিনি।
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় (১৫ ফেব্রুয়ারি)
মাত্র কয়েকদিন আগে চলে গিয়েছেন লতা মঙ্গেশকর। ন’দিন পর আবারও ইন্দ্রপতন। স্রেফ ‘গীতশ্রী’ আখ্যার মধ্যে দিয়ে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে চেনা সম্ভব নয়। বাংলার সঙ্গীত জগতে তিনি একের পর এক মাইলস্টোন তৈরি করে গিয়েছেন। সুচিত্রা সেনের লিপে তাঁর গান, বাংলা সিনেমা এই জুটির চিরকালীন ভক্ত। ভারতীয় সঙ্গীতের আঙিনায়ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় কালজয়ী একটি নাম। কিন্তু কোভিড এসে তাঁকে কাবু করে ফেলল একেবারে। শোনা যায়, মৃত্যুর আগে তিনি মান্না দে’র একটি গান শুনছিলেন। “এই শহর থেকে আরও অনেক দূরে…”। সত্যি মিথ্যা জানা যায়নি; কিন্তু এমন স্বর্গীয় মুহূর্তের হাতছানি তো তিনিই দিয়েছিলেন, তাঁর গানের মাধ্যমে।
বাপ্পি লাহিড়ী (১৫ ফেব্রুয়ারি)
বাংলা, ভারতের সঙ্গীত জগত তখন হারিয়েছে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে। একইদিনে ভেসে এল দুঃসংবাদ। বলিউডের ‘ডিস্কো কিং’ বাপ্পি লাহিড়ীর মৃত্যু স্তব্ধ করে দিল মুম্বই, কলকাতাকে। ‘আই অ্যাম আ ডিস্কো ডান্সার’-এর রংচঙে আবহ বদলে গেল সাদা কালোয়। ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে উঠল, ‘কাভি আলভিদা না কহেনা’।
শেন ওয়ার্ন (৪ মার্চ)
কেবল অস্ট্রেলিয়ার নন, বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা স্পিনার তিনি। ১৪৫ টি টেস্টে ৭০৮ টি উইকেট। পিচের মধ্যে প্রতিটি বলে তাঁর জাদু, তাঁর ঘূর্ণির কাছে পরাস্ত হয়েছেন বিশ্বের তাবড় ব্যাটসম্যানরা। রাজার মুকুট পরেই যেন মাঠে নেমেছিলেন শেন ওয়ার্ন। কিন্তু জীবনের পিচে এতো তাড়াতাড়ি শেষ হবে তাঁর ইনিংস, ভাবতে পারেনি কেউ।
অভিষেক চট্টোপাধ্যায় (২৪ মার্চ)
বাংলা সিনেমার অন্যতম তারকা তিনি। তাপস পাল, উৎপল দত্ত, সন্ধ্যা রায়দের সঙ্গে কাজ করেছেন। তরুণ মজুমদার, প্রভাত রায়দের মতো পরিচালকদের ভরসার পাত্র। সিনেমার পাশাপাশি টিভি সিরিয়ালেও দেখা যেত অভিষেক চট্টোপাধ্যায়কে। কিন্তু মাত্র ৫৭ বছর বয়সে নিভে গেল প্রদীপ।
কেকে (৩১ মে)
অকস্মাৎ! বজ্রাঘাত! নব্বইয়ের দশক থেকে যে লোকটার গলা, সুর ছিল ভারতের তরুণ প্রজন্মের স্পন্দন, তিনিই হঠাৎ থেমে গেলেন। ‘কৃষ্ণকুমার কুন্নথ’ তো কেবল খাতায় কলমে; আপামর ভারতবাসীর কাছে তিনি কেকে। কলকাতার বুকে একটি অনুষ্ঠান করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপরই মৃত্যু… মাত্র ৫৩ বছর বয়সে! তাঁর প্লেলিস্ট আজও ভারতীয় তরুণদের কাছের সঙ্গী। শেষ গানটিও করেছিলেন, “হাম রহে ইয়া না রহে কাল”।
তরুণ মজুমদার (৪ জুলাই)
সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল, বাংলা চলচ্চিত্রের এই ত্রয়ীর বাইরেও প্রবাদপ্রতিম কয়েকজন পরিচালক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম তরুণ মজুমদার। পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত এই পরিচালক জীবনে বহু পুরস্কার পেয়েছেন। উপহার দিয়েছেন ‘বালিকা বধূ’, ‘আলো’, ‘কাচের স্বর্গ’, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘দাদার কীর্তি’, ‘পলাতক’, ‘গণদেবতা’র মতো বহু সিনেমা। এ বছর জুলাইয়ে তাঁর প্রয়াণ যেন একটি যুগের অবসান।
নির্মলা মিশ্র (৩১ জুলাই)
‘ও তোতা পাখি রে’, এই গানটি শুনে চোখের কোল ভিজে ওঠেনি, এমন বাঙালি খুব কমই আছে। নির্মলা মিশ্র সেই অজস্র কান্নায় সুর দিয়েছেন। কেবল বাংলা নয়, ভারতের সঙ্গীত ইতিহাসে কিংবদন্তির স্থানটি নিজের দক্ষতায় অর্জন করেছেন। বাংলা ছাড়াও ওড়িয়া, অসমিয়া ভাষাতেও গান গেয়েছেন। সৃষ্টির জাদুতে অমর করে রেখেছেন নিজেকে। সেই নির্মলা মিশ্রই চলে গেলেন এ বছর।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ (৮ সেপ্টেম্বর)
বিশ্ব ইতিহাসের একটা বড়ো অধ্যায়ের সমাপ্তি। ৭০ বছর ২১৪ দিন ধরে ব্রিটিশ সিংহাসনে ছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। দেখেছেন পৃথিবীর নানা ওঠাপড়া। দেখেছেন বিশ্বযুদ্ধ, উপনিবেশগুলির স্বাধীনতা যুদ্ধ, চাঁদে মানুষের প্রথম পা, টুইন টাওয়ার ধ্বংস ইত্যাদি ইত্যাদি। ৯৬ বছর বয়সে শেষ হল ব্রিটিশ রাজ পরিবারের স্তম্ভের জীবন। চলে গেলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
ঐন্দ্রিলা শর্মা (২০ নভেম্বর)
বয়স মাত্র ২৪। বাংলা টিভি সিরিয়াল, চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত মুখ ছিলেন। কিন্তু সেসব বললে ঐন্দ্রিলা শর্মার লড়াইকে স্পর্শ করা যায় না। দু’বার ক্যানসারকে পরাস্ত করে ফিরে এসেছিলেন জীবনকে। ভালোবেসেছিলেন মানুষকে, এই পৃথিবীকে। কিন্তু হঠাৎ ব্রেন স্ট্রোক হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হন। গোটা বাংলা তাঁর সুস্থতার প্রার্থনায় দিন গুজরান করে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সেই কালান্তক ক্যানসারই তাঁকে ফের আক্রমণ করে। এবার আর পারলেন না ঐন্দ্রিলা। কিন্তু তাঁর এই লড়াই, আরও লাখ লাখ মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে থেকে গেল। ঐন্দ্রিলার হাসি অমর হয়ে রইল বাংলা সিনেমার ক্যানভাসে।















