অন্তর্বাস কম কিনছেন পুরুষরা, ভারতের অর্থনীতিতে অশনি সংকেত! আশ্চর্য হলেও সত্যি
কোনও দেশের অবস্থা বিচার করার ক্ষেত্রে পুরুষদের অন্তর্বাস কেনার প্রবণতাও হতে পারে একটি অন্যতম নিয়ামক! অবাক লাগলেও ব্যাপারটা কিন্তু সত্যি।

জলে কুমির ডাঙায় বাঘ, বলতে গেলে এটাই হলো এখন বিশ্ব অর্থনীতির স্বরূপ। এই মুহূর্তে অর্থনীতি কোন পথে এগোচ্ছে, বাজারের মন্দা কীরকমভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব একটা সহজ কাজ নয়। যদিও এর ওপরেই অনেকটা নির্ভর করে ভারত তথা বিশ্বের অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ। ভারতীয় টাকার দাম পড়ছে ক্রমাগত। ডলারের নিরিখে প্রায় ৮০ টাকার থেকেও বেশি চলছে টাকার দাম। মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্ধারিত সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে গত এপ্রিল মাসেই। পাইকারি বাজারে চলছে ১৫% শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি। অন্যদিকে, সাধারণ খুচরো বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ ৭.১% শতাংশের কাছাকাছি। তাই ভারতীয় অর্থনীতিতে যে মন্দা চলছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
কোনও নির্দিষ্ট দেশে অর্থনৈতিক মন্দার পরিমাণ কীরকম, এই নিয়ে নীতি নির্ধারক এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছে নানা রকমের মত; রয়েছে নানা রকম থিওরি। তবে, সবাই রীতিমতো এক বাক্যে স্বীকার করছেন, সামনের সম্ভাব্য প্রতিটি পথই অত্যন্ত খারাপ এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার কুৎসিতও বটে। এই মুহূর্তে পথ মূলত তিনটে- উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বদ্ধস্ফীতি বা স্ট্যাগফ্লেশন এবং রিসেশন বা মন্দা। বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস, গত মাসে বলেছেন, বেশিরভাগ দেশই রয়েছে মন্দার দিকে। এই দেশগুলির তালিকায় শামিল রয়েছে ভারতের নামও।
কিন্তু, দেশের আর্থিক অবস্থা ভালো হচ্ছে না কি খারাপ হচ্ছে এটা বোঝার মাপকাঠি কী? এই আর্থিক অবস্থার পরিসংখ্যান নির্ণয় করতেও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে রয়েছে দ্বন্দ্ব। কেউ যেমন মূল্যস্ফীতির নিরিখে কোনও দেশের আর্থিক অবস্থা বিচার করেন, তো কেউ কেউ আবার এমনও রয়েছেন, যাঁরা কোনও দেশের আর্থিক অবস্থা বিচার করতে ব্যবহার করেন মুদ্রাস্ফীতির মাপকাঠি। তবে আপনারা কি জানেন, কোনও দেশের অবস্থা বিচার করার ক্ষেত্রে পুরুষদের অন্তর্বাস কেনার প্রবণতাও হতে পারে একটি অন্যতম নিয়ামক! অবাক লাগলেও ব্যাপারটা কিন্তু সত্যি। তাত্ত্বিকভাবে দেখতে গেলে তো অবশ্যই। বাজার অর্থনীতির কিছু বিশেষ তত্ত্বে এই নিয়ামতের উল্লেখ পাওয়া যায়, এবং এই নিয়ামক তত্ত্বের নাম- পুরুষের অন্তর্বাস সূচক বা Men's Underwear Index (MUI)।
আমেরিকার প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যালান গ্রিনস্প্যান হলেন এই নিয়ামক তত্ত্বের প্রবক্তা। সাতের দশকের গোড়ার দিকের কথা। সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নেমে এসেছিল এক ভয়ংকর স্ট্যাগফ্লেশন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তরফ থেকে জানানো হয়েছিল, বিশ্ববাজারের আর্থিক অবস্থা হতে চলেছে আরও খারাপ। ঠিক সেই সময়ই এই বিশেষ থিওরি নিয়ে হাজির হন অর্থনীতিবিদ অ্যালান গ্রিনস্প্যান। তিনি বলেন, বাজার অর্থনীতির সঙ্গে পুরুষদের অন্তর্বাস কেনার প্রবণতা সম্পূর্ণভাবে সম্পর্কিত। যদি কোনও পুরুষ অন্তর্বাসের জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করেন, তাহলে বুঝতে হবে সকলের কাছে অতিরিক্ত ডিজপোজেবল মানি রয়েছে। অর্থাৎ, সেই দেশের আর্থিক অবস্থা ভালো। কিন্তু যদি পুরুষরা অন্তর্বাসের জন্য টাকা খরচ করা বন্ধ করে দেন, তাহলে বুঝতে হবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা কারও হাতে বিশেষ একটা নেই। অর্থাৎ সেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।
অ্যালান গ্রিনস্প্যানের এই নিয়ামক থিওরি প্রথমদিকে খুব একটা গ্রহণ করা না হলেও, ১৯৮০ সালে তিনি যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের শাসনকালে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারপার্সন হন, তখন তিনি নিজের থিওরিকে আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করেন। ২০০৬-'০৭ সালের অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ-এর চেয়ারপার্সন। বুশ, ক্লিনটন এবং দ্বিতীয় বুশের আমলজুড়ে তিনিই এই পদে আসীন ছিলেন। ১৯৮০-'৮১ সাল থেকেই তিনি নিজের তৈরি এই উপপ্রমেয় নিয়ে আরও গবেষণা করতে শুরু করেন। বাজার অর্থনীতির একাধিক সার্ভে এবং নানা গবেষণা থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন, যদি আমেরিকার পুরুষরা অন্তর্বাস কম কেনেন, তাহলে বাজার অর্থনীতিতে মন্দা নেমে আসে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অস্থির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মাঝেই হঠাৎ করে ইপিএফও শেয়ারের বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি করাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা।
এই নিয়ামক তত্ত্বের সপক্ষে একাধিক যুক্তিও রয়েছে। দেখতে গেলে সারা বিশ্বে প্রায় সকল পুরুষেরই প্রবণতা থাকে বাইরে গিয়ে কাজ করার বা টাকা রোজগারের। দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিশ্ব না, প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতেও এখনও অধিকাংশ বাড়িতেই পুরুষরা হয়ে থাকেন উপার্জনকারী। এই কারণে, তাদের মূল লক্ষ্য থাকে তাদের বাইরের পোশাকের দিকে। অর্থাৎ, যে পোশাক সকলে দেখতে পাবেন, সেই পোশাকের জন্যই খরচ করার প্রবণতাটা বেশি রাখেন তারা। অন্তর্বাসের দিকে তাদের নজর খুব একটা থাকে না। এই কারণে, অন্তর্বাস খুব একটা কেনার প্রয়োজনও পড়ে না। তবে, কোনও সময়ে যদি এমনটা দেখা যায় যে, কোনও দেশের পুরুষরা অন্তর্বাস কিনছেন একটু বেশি মাত্রায়, তাহলে বুঝতে হবে, সেই দেশের মানুষের হাতে টাকার পরিমাণ অনেকটাই বেশি। মানুষের হাতে আছে বেশ মোটা অঙ্কের ডিজপোজেবল মানি। অর্থাৎ, সেই সময়ে সেই দেশের অর্থনীতি ভালো জায়গায় আছে, মানুষের হাতে টাকা রয়েছে খরচ করার মতো।
তবে, কোনও সময় যদি এমন একটা অবস্থা হয় যে, কোনও একটি নির্দিষ্ট দেশের পুরুষরা অন্তর্বাস কিনছেন না, তাহলে বুঝতে হবে সেই দেশের মানুষের হাতে খুব একটা ডিজপোজেবল মানি নেই। অর্থাৎ, সেই দেশের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার অর্থনীতিতে একাধিক সময়ে একাধিক সার্ভেতে এই বিষয়টার প্রমাণ মিলেছে। তবে ভারতের জন্যেও কি একই নিয়ম কার্যকরী? MUI কি ভারতের বাজার অর্থনীতির সঠিক নিয়ামক হয়ে উঠতে পারবে?
২০১৯-'২০ আর্থিক বছরের সমীক্ষা অনুযায়ী, সেই সময় থেকেই ভারতের একাধিক অন্তর্বাস-নির্মাতা সংস্থার বিক্রি ছিল নিচের দিকে। ভারতের সবথেকে বড়ো ৪টি পুরুষ অন্তর্বাস-নির্মাতা কোম্পানি- পেজ ইন্ডাস্ট্রি (জকি), লাক্স ইন্ডাস্ট্রি (লাক্স কোজি), ভিআইপি ইন্ডাস্ট্রি (ভিআইপি), এবং ডলার ইন্ডাস্ট্রির (ডলার) পরিসংখ্যান দেখলে স্পষ্ট শুধুমাত্র পেজ ইন্ডাস্ট্রিতে ২.৮ শতাংশ বিক্রি বৃদ্ধি হলেও বাকি তিনটি সংস্থাই চলেছে একেবারে মন্দায়। এর মধ্যে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ভিআইপি ইন্ডাস্ট্রি। সেই সময় থেকেই ভারতে আর্থিক মন্দা কাজ করতে শুরু করে। তারপর করোনাভাইরাস পরিস্থিতি চলে আসায় দেশের আর্থিক পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও দুর্বিষহ। অর্থনীতিবিদদের মতে, চাহিদার অভাবে দেশে বাড়ি-গাড়িসহ একাধিক ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে চাকরি থেকে ছাঁটাই হয়েছে। কাজ হারানো এবং আয় কমে যাওয়ায় ভারতীয়রা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রে অনেক বেশি রাশ টানতে বাধ্য হয়েছেন। পেজ ইন্ডাস্ট্রিজের বিক্রি যেখানে প্রতি বছরে প্রায় ১০ শতাংশ করে বৃদ্ধি পায়, সেখানেই ২০১৯-'২০ আর্থিক বছরে বৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ। এই মুহূর্তে এই কোম্পানিটির বিক্রি চলতে শুরু করেছে ঋণাত্মক দিকে। তবে, এই অন্তর্বাস ইনডেক্স দিয়ে ভারতের আর্থিক অবস্থার বিচার কি সত্যিই সঠিক?
বিশ্বের অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার বিচারের ক্ষেত্রে এই নিয়ামক নীতিটি কার্যকর হলেও ভারতের। বাজার অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই অন্তর্বাস নিয়ামক তত্ত্ব খুব একটা ভালোভাবে কাজ করে না। এর বেশ কিছু কারণও রয়েছে। প্রথমত, ভারতে একটা বড় সংখ্যার জনতা এমন আছেন, যাঁরা সাধারণত অন্তর্বাস হিসেবে ল্যাঙট ব্যবহার করেন। এর ফলে তাঁরা এই হিসেবের মধ্যে আসতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, যাঁরা ধুতি পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাঁরা একটি বিশেষ ধরনের আন্ডারপ্যান্ট ব্যবহার করেন অন্তর্বাস হিসেবে। এরাও এই পরিসংখ্যান থেকে ছিটকে গেলেন। এরপর আসছে ব্র্যান্ডের বিষয়টা। ভারতে অনেকেই আছেন, যাঁরা লোকাল ব্র্যান্ডের পোশাক ব্যবহার করেন। আর স্বাভাবিকভাবেই তারা এই একই ধরনের লোকাল ব্র্যান্ডের অন্তর্বাস ব্যবহার করেন। এই সমস্ত লোকাল ব্র্যান্ডের না কোনও পরিসংখ্যান সামনে আসে, আর না কোনও নিয়ামক তত্ত্বের নিরিখে এই সমস্ত ব্র্যান্ডের বিচার সম্ভব। তাই এঁরাও এই পরিসংখ্যান থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ভারতে সাধারণত অন্তর্বাসের দিকে নজরটা একটু কমই দেওয়া হয়। বিশেষ করে পুরুষের অন্তর্বাসের ক্ষেত্রে। বিগত কয়েক বছর ধরে স্বচ্ছতার ব্যাপারে সকলেই সচেতন হলেও, ভারতে মনে করা হয়, ধনী মানুষরাও একটি অন্তর্বাস এমন সময় পর্যন্ত ব্যবহার করেন, যতক্ষণ না তাতে ছিদ্র তৈরি হয়। তাই এই ধরনের অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গেও অর্থনীতির কোনও সম্পর্ক থাকে না। আর সর্বোপরি, ভারতে প্রায় ৯০ শতাংশ পুরুষ নিজের অন্তর্বাস কেনা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না। তার বাড়ির মহিলা সদস্যরাই তাঁর জন্য অন্তর্বাস কিনে আনেন, তাই এখানেও এই তত্ত্ব কাজ করে না।
তবে আগের বিপক্ষ যুক্তিগুলো প্রথম বিশ্বের দেশের ক্ষেত্রে খুব একটা গ্রাহ্য না হলেও পরের বিপক্ষ যুক্তিটি অবশ্যই সমগ্র বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য, এবং সেটি হলো ফ্যাব্রিকের ভিন্নতা। যে সময় গ্রিনস্প্যান এই তত্ত্ব নিয়ে এসেছিলেন, সেই সময় অন্তর্বাস তৈরির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কটন ফ্যাব্রিকই ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন সেরকম পরিস্থিতি আর নেই। এই যুগে কটনের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পলিয়েস্টার ও নাইলন (এটিও এক ধরনের পলিমার) ফ্যাব্রিকের ব্যবহার। এছাড়াও মাইক্রোমোডাল ফ্যাব্রিকের অন্তর্বাসও সারা বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই ধরনের ফ্যাব্রিক খুব একটা সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। ফলে অন্তর্বাস নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।
২০২২ সালের MUI হিসেব করে আমেরিকায় আবারও অর্থনৈতিক মন্দার সম্ভাবনা আছে বলে আশঙ্কা করছেন সে-দেশের অর্থনীতিবিদরা। সেই সম্ভাবনা যদি সত্যি হয়, তাহলে অবধারিতভাবে আমাদের দেশের চাকরির বাজারেও তার প্রভাব পড়বে। ডলার ইন্ডাস্ট্রির ম্যানেজিং ডিরেক্টর বিনোদকুমার গুপ্তা বলছেন, বেকারত্বের সাম্প্রতিক হার যে স্তরে পৌঁছে গিয়েছে, তাতে আমজনতা অন্তর্বাসের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রে আগের থেকে অনেক বেশি সংযত মনোভাব দেখাতে শুরু করেছেন। তাঁর কথার সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন পেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজিং ডিরেক্টরও। তবে, ভারতের বাজার অর্থনীতিতে আদৌ মন্দা আসবে কি না, সেটা এই অন্তর্বাস সূচকের মাধ্যমে এখনই হয়তো বলা সম্ভব নয়। যেদিন ভারতের অর্থনীতি আরও অগ্রগতি করবে এবং ভারতের পুরুষদের মধ্যে অন্তর্বাস বিষয়ক সচেতনতা তৈরি হবে, সেদিন হয়তো এই সূচকের মাধ্যমে ভারতের অর্থনীতির বিচার করা যাবে। কিন্তু, তার আগে পর্যন্ত MUI ভারতের অর্থনৈতিক বিচারের ক্ষেত্রে এমনও কোনও দরকারি ফ্যাক্টর না।
















