প্রদীপের নিচে এত অন্ধকার? স্বাধীনতার ৭৫-এ কোথায় দাঁড়িয়ে ভারত

এখনও স্বাস্থ্য সংবিধানের মৌলিক অধিকার নয়! বেকারত্বর জ্বালা বুকে নিয়ে কত যুবকের স্বপ্ন ফানুসের মতো শূন্যে বিলীন হয়ে যায়! এর পরেও ইসরো মহাকাশে তিরঙ্গা ওড়ায়।

tiasa gupta
৪ মিনিট
প্রদীপের নিচে এত অন্ধকার? স্বাধীনতার ৭৫-এ কোথায় দাঁড়িয়ে ভারত

'আজাদি কা অমৃত মহোৎসব, হর ঘর তিরঙ্গা’- এই উৎসবের অংশ তো সেই নাগরিকও, যে দেশের স্বাধীনতা দিবসের মাহেন্দ্রক্ষণে খিদের জ্বালা সহ্য করে ঘুমোতে যায়। তার ক্ষীণ কণ্ঠ আওয়াজ না তুললেও মনে মনে হয়তো বলে ওঠে- 'পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। উৎসব হয়তো তাকে স্পর্শ করে না, তার কণ্ঠস্বর শোনার মতো ধৈর্য কি আছে এই উৎসবমুখর দেশের?

উৎসবের ঢাকে কাঠি পড়েছিল গত বছর ১৪ মার্চ। সবরমতী আশ্রম থেকে 'আজাদি কা অমৃত মহোৎসব'-এর সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই ঢাকের তালে তাল মিলিয়ে অঢেল আয়োজন কেন্দ্রের। দেশের আম-নাগরিকের মনে স্বাধীনতার ৭৫- এর পুণ‍্যলগ্নে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করার মধ্যে দোষ কোথায়? কিন্তু এই দেশেই তো আজও, স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও ফুটপাথে কত শিশু পেটে খিদের জ্বালা লুকিয়ে রেখে ঘুমোতে যায়! এখনও স্বাস্থ্য সংবিধানের মৌলিক অধিকার নয়! বেকারত্বর জ্বালা বুকে নিয়ে কত যুবকের স্বপ্ন ফানুসের মতো শূন্যে বিলীন হয়ে যায়! এর পরেও ইসরো মহাকাশে তিরঙ্গা ওড়ায়। দেশের 'আজাদি কা অমৃত মহোৎসব' উদযাপনে নয়া উদ্যোগ ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো-র। স্বাধীনতার ৭৫ বছর উপলক্ষে সবচেয়ে ছোট বাণিজ্যিক রকেট SSLV উৎক্ষেপণ করবে ইসরো। এই রকেটে ভর করে মহাকাশে উড়বে তিরঙ্গা। শুধু ইসরো নয়, কেন্দ্রের নির্দেশ মেনে দেশকে উপহার দিচ্ছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-ও। ভারতের যেসব সৌধ ও স্থাপত্য আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র মাধ্যমে দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, সেইসব স্থানে প্রবেশের জন্য দিতে হবে না কোনও টাকা। ৫ অগাস্ট থেকে ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ওই সৌধগুলিতে ঢোকা যাবে বলে জানানো হয়েছে কেন্দ্রের তরফে।

অন্যদিকে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বেকারত্ব

চড়া মূল্যবৃদ্ধির আবহে কাজের বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ল। উপদেষ্টা সংস্থা সিএমআইই-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রবিবার (৭ অগাস্ট) শেষ হওয়া সপ্তাহে বেকারত্ব একলাফে পৌঁছেছে ৯.৬৬ শতাংশে। তার আগের সপ্তাহে তা ছিল ৬.৭৩ শতাংশ। শুধু গ্রামেই ওই হার ৫.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে পৌঁছেছে ১০ শতাংশের (৯.৮৮ শতাংশ) কাছে। শহরেও বেকারত্ব ৯ শতাংশের ওপরে। ৩১ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে এই হার ছিল ৮.৩১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সুদ বৃদ্ধির জেরে শিল্পের মূলধন জোগাড় করার খরচ বেড়েছে।

ভারতে সাক্ষরতা

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পাকিস্তান মানেই দুর্নীতি! ইমরান খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে

ইমরান খানের গদিচ্যুতি হওয়ার পরেও ঠিক যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল তেহরিক-এ-ইনসাফ, তখনই এই ঘটনা সামনে আসা আবারও যে তাদের যথেষ্ট বিপদে ফেলবে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছে। তারপরেও স্কুলছুটের প্রবণতা কমানো যায়নি। স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব পালন করছে দেশ। কিন্তু দেশের অসংখ্য শিশু প্রাথমিক শিক্ষার মুখ দেখছে না। স্বাধীনতার এত বছর পর নিরক্ষরতায় আমাদের অগ্রণী অবস্থান কি লজ্জা দেয় না?

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অজর্নের সময় দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ১২ শতাংশ। ২০১১ সালে এই হার বেড়ে হয়েছে ৭৪.০৪ শতাংশ। ২০০৮ সালের জুন মাসে জাতীয় নমুনা সমীক্ষা কার্যালয় (এনএসএসও) পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭ বছর পর্যন্ত সাক্ষরতার হার ৭২ শতাংশ। কিন্তু পূর্ণবয়স্কদের (১৫ বছর ও তার বেশি) সাক্ষরতার হার ৬৬ শতাংশ। সাক্ষরতার ক্ষেত্রে এই উন্নতি পাঁচগুণ হলেও ভারতে সাক্ষরতার হার বিশ্বের গড় সাক্ষরতার হার ৮৪ শতাংশর অনেকটাই নিচে। বর্তমানে নিরক্ষর জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বে প্রথম ভারত। একাধিক নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ সত্ত্বেও ভারতে সাক্ষরতা বৃদ্ধির হার শ্লথ। ২০১১ সালের জনগণনায় দেখা গেছে, ভারতের ২০০১ থেকে ২০১১ দশকীয় সাক্ষরতা বৃদ্ধির হার ৯.২ শতাংশ, যা পূর্ববর্তী দশকীয় হারের তুলনায় অনেক কম।

শিশুমৃত্যু রুখতে ব্যর্থতা

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও এই দেশ শিশুমৃত্যু আটকাতে পারেনি। পরিসংখ্যান বলছে, এ-ব্যাপারে ভারত বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপালেরও পিছনে। ইউনিসেফ প্রতি বছরই তাদের রিপোর্ট দ্য স্টেট অফ ওয়ার্ল্ড’স চিলড্রেন-এ পৃথিবীর সব দেশের ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেট বা শিশুমৃত্যুর হারের চিত্র তুলে ধরে। এরা যে ছবি তুলে ধরেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ভারত রয়েছে ১৩৯তম স্থানে। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, চিনের পিছনে। অর্থাৎ, প্রতিবেশী দেশের তুলনায় ভারত শিশুমৃত্যু রুখতে ব্যর্থ। বলছে পরিসংখ্যান।

স্বাস্থ্য মৌলিক অধিকার নয়

সরকারি হাসপাতালের বেহাল দশা। অভিযোগ, ডাক্তাররা বেসরকারি হাসপাতালের দরজা দেখিয়ে দেন কখনও কখনও। দেশে কর্পোরেট হাসপাতালের রমরমা। স্বাধীনতার পর এতগুলো বছর কেটে গেছে। দেশে কত আইন হয়েছে। কত আইন রদ হয়েছে। কিন্তু সংবিধানের মৌলিক অধিকারের মধ্যে ঠাঁই পায়নি স্বাস্থ্য। এদেশের টাকার অভাবে কত নাগরিককে বিনা চিকিৎসায় মরতে হয়। তাহলে এটাই কি বরাত লিখন?

স্বাস্থ্যের অধিকার আমাদের দেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের মধ্যে নেই। নির্দেশক নীতিতে স্বাস্থ্যের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। একথা জানিয়ে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের পরামর্শদাতা পুণ্যব্রত গুণ একসময়ে বলেছিলেন, "আমরা দেখি যে, ১৯৪৮-এ ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অফ হিউম্যান রাইটস-এ স্বাস্থ্যের অধিকারের উল্লেখ ছিল। এরপর যখন সংবিধান রচিত হল, তখন সংবিধান প্রণেতারা স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃতি দেননি। মানুষকে বেঁচে থাকতে গেলে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিষেবাও প্রয়োজন।"

৩১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি 'মন কী বাত’ অনুষ্ঠানে `হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচি নিয়ে কথা বলেন। তিনি সব দেশবাসীর কাছে আবেদন করেন, তাঁরা যেন সকলেই এই হর ঘর তিরঙ্গা অভিযানে শামিল হন। বাড়িতে, সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের প্রোফাইল পিকচারেও জাতীয় পতাকার ছবি লাগানোর অনুরোধ করেন। দেশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে কি জানতে চাইবে, প্রদীপের নিচে এত অন্ধকার বলেই কি উৎসবে ভুলিয়ে রাখার এই তৎপরতা?

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।