আর্জেন্টিনা না ফ্রান্স, বিশ্বকাপ ফাইনালে বাংলার ভোট যে দিকে
FIFA world cup 2022 : এক পক্ষ মেসির মুখের দিকে তাকিয়ে, আরেক পক্ষ এমবাপেদের তারুণ্যের ভরসায়। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে তেতে আছে শিলিগুড়ি থেকে সুন্দরবন।

শনিবারের রাত পেরিয়ে কেবল রবিবার ভোরের অপেক্ষাটাই ছিল। ১৮ ডিসেম্বরের দিনটিও ক্যালেন্ডারে লাল কালি দিয়ে দাগ কাটা ছিল। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ শুরু হতে আর মাত্র কিছুক্ষণের অপেক্ষা। আর্জেন্টিনা না ফ্রান্স – শেষ হাসি হাসবে কে সেটা তো সময়ই বলবে। কিন্তু বাংলা জুড়ে উদ্দীপনার অন্ত নেই। যেন দুটো শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়েছে গোটা বঙ্গদেশ। এক পক্ষ মেসির মুখের দিকে তাকিয়ে, আরেক পক্ষ এমবাপেদের তারুণ্যের ভরসায়। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে তেতে আছে শিলিগুড়ি থেকে সুন্দরবন।
লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ। পায়ের জাদু দেখিয়েছেন তিনি। তাঁর হাতেই কাপ উঠুক, চাইছে অনেক বাঙালি। রবিবার আর্জেন্টিনার সমর্থনে কলকাতার সল্টলেকের দত্তাবাদ অঞ্চলে শিব মন্দিরের এক যজ্ঞের আয়োজন করা হয়। আর্জেন্টিনার জয়ের কামনা করে সমস্ত নিয়ম মেনে পুরোহিত দিয়ে চলে এই যজ্ঞ। পাশাপাশি আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে চাপিয়ে প্রিয় ফুটবলার লিওনেল মেসির জন্য নীল-সাদা কেকও কাটে আয়োজকরা।
এদিকে আর্জেন্টিনার পতাকায় ঢেকেছে কলকাতার শহর থেকে গ্রাম, রাজপথ থেকে অলিগলি। চারিদিকে পতাকার পাশাপাশি টাঙানো হয়েছে মেসির ছবি। বাদ যায়নি মিষ্টির দোকানগুলিও। ক্রেতাদের আকর্ষণের জন্য মিষ্টির দোকানেও মিষ্টিতে লেগেছে আর্জেন্টিনার ছোঁয়া। আর্জেন্টিনার জার্সির রঙে মিষ্টির পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ক্ষীরের ফুটবল, ক্ষীরের বিশ্বকাপ। ফাইনালের আগে এমন মিষ্টিতে সেজে উঠেছে হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়ার কুলগাছিয়া এলাকার একটি মিষ্টির দোকান। মিষ্টির দোকানে অন্য মিষ্টির সঙ্গে শোভা পাচ্ছে আর্জেন্টিনার মিষ্টি। দেদার বিকোচ্ছেও সেই মিষ্টি। শুধু তাই নয়, বাদ যাচ্ছে না বিশ্বকাপও।
দোকানের মালিক অলিভ খাঁ জানান, মারাদোনার পর মেসি যেভাবে মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছে, সেদিকে তাকিয়েই এই মিষ্টি তৈরি করা হয়েছে। তাঁর দাবি, তিনি আর্জেন্টিনার সমর্থক নন। তিনি একজন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ। অন্যদিকে ফাইনাল ম্যাচের আগে এই অভিনব মিষ্টি পাওয়ায় খুশি ক্রেতারাও। তাঁদের মতে, খেলার মাঝে এই মিষ্টি মানুষের উন্মাদনা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
আরেক প্রসিদ্ধ মিষ্টি প্রস্তুতকারক সংস্থা ব্রজনাথ গ্র্যান্ড সন্স এবার বিশেষ ধরনের রসগোল্লা ফুটবল কেক তৈরি করেছে। ফুটবল কাটলেই বেরিয়ে আসবে একের পর এক রসগোল্লা। চলতি বিশ্বকাপে খেলা হচ্ছে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি ফুটবল দিয়ে। সেই ফুটবলের অনুকরণেই প্রায় ১৫-১৬ পাউন্ডের বিশেষ বিশ্বকাপ ফুটবল কেক তৈরি করেছে তারা।
পশ্চিম মেদিনীপুরে আবার অভিনব উদ্যোগ! রবীন্দ্রনগর নাগরিক সমিতি মাত্র ২৫০ টাকায় জায়ান্ট স্ক্রিনে এই ফুটবল খেলা দেখানোর বন্দোবস্ত হয়েছে। কেবল তাই নয়, খেলা চলাকালীন স্ন্যাক্স ও রাতে ডিনারের ব্যবস্থা করেছে। ফুটবল প্রেমীরা রাতে যাতে খেয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেজন্যই এমন ব্যবস্থা। ইতিমধ্যে ব্যানার নিয়ে তারা বিভিন্ন জায়গায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে, বিজ্ঞাপন দিয়েছে সোশ্যাল মাধ্যমেও। আর এই সেই বিজ্ঞাপনে খুশি হয়ে দর্শকরাও ইতিমধ্যেই নাম নথিভুক্ত শুরু করেছে সমিতির স্থানীয় কার্যালয়ে। এখন অপেক্ষার রাত ফুরানোর।
সমিতির উদ্যোক্তা শুভজিৎ মণ্ডল বলেন, জঙ্গলমহলের মানুষকে ফুটবল খেলা দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই অভিনব উদ্যোগ। তাছাড়া আমরা নামমাত্র একটা মূল্য নিচ্ছি, যাতে তারা নিজেদের নাম নথিভুক্ত করে এবং নির্দিষ্ট সময়ে খেলা উপভোগ করতে পারে। গোটা বিশ্বের সঙ্গে জঙ্গলমহলের মানুষকে এই ফুটবলের স্বাদ উপভোগ করার জন্যই এই প্রচেষ্টা আমাদের।"
উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙার সরকার পাড়ায় দেখা গেল সাজো সাজো রব। রাস্তার দু’পাশে অতীতের দিকপাল ফুটবলারদের ছবি দিয়ে ব্যানার টাঙানো হয়েছে। কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের খেলার বিভিন্ন মুহূর্ত, স্টেডিয়ামে ফ্যানেদের উন্মাদনার টুকরো টুকরো চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এলাকার যুবকদের উদ্যোগে। যেন মনে হবে এক টুকরো কাতার। রাতে ম্যাচ দেখানোর জন্য বড় এলইডি স্ক্রিন লাগানো হয়েছে, খেলা দেখতে আসা সর্বসাধারণের জন্য থাকবে চা, কফি, স্ন্যাক্সের ব্যবস্থা।
এদিকে আর্জেন্টিনা নিয়ে উন্মাদনার পাশাপাশি তাদের প্রতিপক্ষ ফ্রান্সের জয়ের কামনায় যজ্ঞ, পূজা অর্চনার আয়োজন করা হয় হুগলি জেলার চন্দননগরে। পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করে এবং পূজা সামগ্রী দিয়ে হোম যজ্ঞ দিয়ে ফ্রান্সের বিজয়ের কামনা করলেন। ফ্রান্সের স্টার ফুটবলার এমবাপে থেকে শুরু করে ফ্রান্সের জাতীয় পতাকা - সবকিছুতে চন্দনের তিলক কাটা হয়। মহিলারা শাঁখ বাজান, আর শঙ্খ ধ্বনিতে যেন গোটা চন্দননগর ফ্রান্সময় হয়ে গেল। হোম যজ্ঞের মাধ্যমে চন্দননগরবাসী ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন, আজ যেন ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্স আর্জেন্টিনাকে ধরাশায় করে। সেইসঙ্গে তাঁদের প্রার্থনা, ফ্রান্সের তারকা ফুটবলার এমবাপেই যেন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে একের পর এক গোল করে গোল্ডেন বুট ছিনিয়ে নেন।
এছাড়াও ফাইনাল ম্যাচকে সামনে রেখে রাজ্যের একাধিক জায়গায় পিকনিক করা হচ্ছে। কোথাও আবার প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালকে ঘিরে গোটা বিশ্বের সঙ্গে উন্মাদনায় ভাসছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ।















