ভয়াল বনে আছে কেউটে, ভেসে থাকে অদ্ভুত পেয়ারা বাজার

চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। অবিশ্বাস রূপ নিয়ে ঘন পেয়ারা বনাঞ্চল দুনিয়ায় আর আছে কিনা তা গবেষণার বিষয়। বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠির পরিচয় এই অনবদ্য পেয়ারা বনভূমি ও ভাসমান পেয়ারা বাজার।

Simanto Chowdhury
৪ মিনিট
ভয়াল বনে আছে কেউটে, ভেসে থাকে অদ্ভুত পেয়ারা বাজার

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: এই বাজার বিশ্বের একমাত্র অদ্বিতীয় চরিত্র নিয়ে দশকের পর দশক চলে আসছে। সওদা হয় পেয়ারা। বিকি কিনি সেরে নৌকা নৌকা পেয়ারা চলে যায় জটিল ধাঁধার মতো জলপথ ঘুরে দূর কোনওখানে। ঘন পেয়ারা গাছের বন আর নৌকার বাজার নিয়ে বিশ্বের বিস্ময় বাংলাদেশের ঝালকাঠি ভাসমান পেয়ারা বাজার।

সাবধান! এই ঘন বনে ঢুকবেন তো স্থানীয় কাউকে নিন। নৌকার মাঝি এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য। জলাভূমি বেষ্টিত এই বনে কিলবিল করে কেউটে। বিপদ আছে ওঁত পেতে।

চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। অবিশ্বাস রূপ নিয়ে ঘন পেয়ারা বনাঞ্চল দুনিয়ায় আর আছে কিনা তা গবেষণার বিষয়। বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠির পরিচয় এই অনবদ্য পেয়ারা বনভূমি ও ভাসমান পেয়ারা বাজার।

ভেসে থাকা পেয়ারা বাজার | ছবি সৌজন্যে : Google বর্ষায় জমে ওঠে এই পেয়ারা বাজার। খাঁড়ি দিয়ে নৌকায় যেতে আসতে যে কেউ মাথার উপর ঝুলতে থাকা পেয়ারা ছিঁড়ে নিতে পারেন। প্রকৃতির এই মিষ্টি উপহার সর্বত্র ছড়িয়ে। বাংলাদেশ সরকারের পর্যটন মন্ত্রক ও বরিশাল বিভাগ প্রশাসনিক তথ্য জানাচ্ছে, এই পেয়ারার এই বনভূমি ও বাজার এশিয়ার বৃহত্তম। এর অবস্থান বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বরিশাল এই তিন অঞ্চলের সীমানায় ছড়িয়ে থাকা জলাভূমিতে।

এই বনভূমি কিন্তু মানুষের তৈরি। অন্তত দুশো আড়াইশো বছর আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন গয়া গিয়েছিলেন তীর্থ করতে। গয়ার বিখ্যাত পেয়ারা এনে চাষ শুরু করেন। সেই পেয়ারা বাগান যাতে বর্ষার সময় বন্যায় নষ্ট না হয় তার জন্য তৈরি করা হয় বিশেষ জলাভূমি। ক্রমে বিস্তার লাভ করে।

বাংলাদেশ তথ্য বাতায়ন জানাচ্ছে, "ঝালকাঠি জেলার সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ও নবগ্রাম ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি গ্রামে পেয়ারা চাষ হয়ে আসছে বহুবৎসর ধরে। পেয়ারা হচ্ছে এই এলাকার মানুষের বেঁচে থাকার প্রথম অবলম্বন।"

ঝালকাঠি এই পেয়ারা বাজারের মুখ্য কেন্দ্র। চুলের মতো ছড়িয়ে থাকা জলপথের উপর নৌকা করেই পেয়ারা কেনা বেচা হয়। "বর্ষা মরসুমে যখন পেয়ারা পাকা শুর করে তখন চাষীরা নৌকা করেই বাগানে ঢোকে। পেয়ারা পেড়ে নৌকা ভরে অসংখ্য খাল পথে বাজারে নিয়ে আসে। এখানে প্রধান প্রধান বাজার হলো ভীমরুলি, শতদশকাঠি বাজার, আতা বাজার, ডুমুরিয়া বাজার, কুড়িয়ানা বাজার, আটঘর বাজার প্রভৃতি। "

ভেসে থাকা পেয়ারা বাজার | ছবি সৌজন্যে : Google ভারত বিভাগের পর বরিশাল পড়ে ততকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। পরে ১৯৭১ সালে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান কেটে জন্ম হয় বাংলাদেশের। ভয়াবহ মুক্তিযুদ্ধের টানা নয় মাস এই সাপে ভরপুর জটিল ভয়ঙ্কর ঝালকাঠি পেয়ারা বন ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম ঘাঁটি। জলে জঙ্গলের গোপন ডেরা থেকে পাকিস্তানি সেনার উপর বারবার গেরিলা কায়দায় হামলা চালিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। এমনও অনেক ঘটনা রয়েছে, সাপের ছোবলে মারা গিয়েছেন কোনও মুক্তিযোদ্ধা।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সময়কালের বর্ষার মাসগুলো ছিল পাকিস্তানি সেনার কাছে ভয়াবহ। পূর্ববাংলার নদী জলাভূমি বেষ্টিত এলাকায় রুখা সুখা পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনি একেবারেই কাহিল হয়ে পড়ে। এই সুযোগ নেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালানো মুক্তিযোদ্ধারা। ভারতীয় সেনার সাহায্য নিয়ে তাদের গেরিলা হামলায় পর্যদস্তু হয় পাক সেনা।

বাংলাদেশ জন্মের পর ঝালকাঠির এই পেয়ারা বনভূমি ধীরে ধীরে দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অংশীদার হয়েছে। আরও পরে ভাসমান পেয়ারা বাজার উঠে এসেছে পর্যটনের তালিকায়। বর্তমানে এই এলাকা বাংলাদেশ পর্যটন মন্ত্রকের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

বরিশাল শহর থেকে সড়কপথে চলে যাওয়া যায় আটঘর বাজারে। সেখানে সারি সারি নৌকা নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকেন মাঝিরা এখান থেকে নৌকা ভাড়া করে যাওয়া যায় ভিমরুলির পেয়ারা বাজারে। নৌকায় গেলে গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু খাল ও পেয়ারার বাগান থাকবে সবসময়। বাগানের ভিতর প্রবেশ করতে হলে প্রয়োজন পড়বে ছোট খেয়া নৌকার।

বরিশালের ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলি গ্রামের আঁকাবাঁকা ছোট্ট খালজুড়ে সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে পেয়ারার বিকিকিনি। ভিমরুলির আশপাশের সব গ্রামেই অসংখ্য পেয়ারা বাগান। হোগলা, সুপারি, আমড়া আর পেয়ারার বন ছড়িয়ে আছ। এসব বাগান থেকে চাষীরা নৌকায় করে ফল সরাসরি বাজারে নিয়ে আসেন।

ভেসে থাকা পেয়ারা বাজার | ছবি সৌজন্যে : Googleবিবিসি জানাচ্ছে, "বাংলাদেশের ভাসমান পেয়ারা হাটে আশেপাশের প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা থেকে পণ্য নিয়ে আসেন বিক্রেতারা। শত বছরের পুরনো এই হাটের আশেপাশে আছে দুইশত বছরের পুরনো পেয়ারা বাগান। যেসব বাগান থেকে উৎপাদন হয়ে লক্ষাধিক মণ পেয়ারা। এক সময় দাম না পেয়ে এই হাটে চাষীরা পেয়ারার নৌকা ডুবিয়ে দিয়ে খালি নৌকা নিয়ে ফিরে যেতো। পর্যটন সম্ভাবনা বাড়ায় এই বাজারের জৌলুস বাড়তে শুরু করেছে।স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙ্গা হচ্ছে এই পর্যটনের ফলে।"

শুনলে অবাকই হবেন, বিখ্যাত এই পেয়ারা বাজারের পেয়ারা অনলাইনেও বিক্রি করার সুবিধার্থে ফ্রি ওয়াইফাই জোনের ব্যবস্থা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে ইন্টারনেটে বেশি ভরসা না করেই প্রতিদিন পেয়ারার ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য সরাসরি বাজারে বিক্রি করেন বেশিরভাগ বিক্রেতা। প্রতিদিন পেয়ারা চাষিরা খুব ভোরে পেয়ারা বাগান থেকে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে ভাসমান হাটে আসেন। নৌকায় বসেই বিক্রি করেন। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা নৌকা থেকেই পেয়ারা কিনে ট্রলার অথবা ট্রাকে করে তাদের গন্তব্যে নিয়ে যান। বরিশাল অঞ্চলের ৪৩টি গ্রামের প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে আনুমানিক ২০ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়। সেই পেয়ারা পরে বাংলাদেশের সর্বত্র চালান হয়। এমনকি বিদেশেও চালান হচ্ছে।

শুধু পেয়ারা নয়, জলাজঙ্গলের এই অদ্ভুত বনাঞ্চলে পেয়ারার মরসুম শেষ হলে আসে আমড়া। সবশেষে আসে সুপারি। সবজি তো আছেই। এই ভাসমান হাটে শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে কেনাবেচা হয় কোটি কোটি টাকার পেয়ারা।

সৌজন্যে:

  • বাংলাদেশ তথ্য বাতায়ন, বরিশাল বিভাগ

  • floating guava market in Barisal, Bangladesh: Xinhua

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।