যিনি জানতেন গুলি আসবে, তবু কলম থামাননি
Gauri Lankesh: গৌরী লঙ্কেশ জন্মসূত্রে লড়াকু ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর ‘আধুনিক’। বাবা পি. লঙ্কেশ ছিলেন কন্নড় সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মহীরূহ, কিন্তু মেয়ে গৌরী বড় হয়েছিলেন ইংরেজি মিডিয়ামের আবহে।
বেঙ্গালুরুর রাজরাজেশ্বরী নগরের বাড়ির সামনে যখন আততায়ীর বুলেট তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়, তখন পৃথিবী জেনেছিল এক ‘অগ্নিকন্যা’র কথা। কিন্তু সেই আগুনের জন্ম একদিনে হয়নি। গৌরী লঙ্কেশের জীবনের সবচেয়ে বড় 'স্কুপ' কোনো রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি ছিল না; তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় 'স্কুপ' ছিলেন তিনি নিজেই। একজন ‘হাই-প্রোফাইল’ ইংরেজি সাংবাদিক, যিনি সাউথ বেঙ্গালুরুর আভিজাত্য আর কফি-টেবিল কালচার ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন ধুলোবালি মাখা এক অনিশ্চিত জীবন। বেছে নিয়েছিলেন পিতার বিশাল ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের এক স্বতন্ত্র অস্তিত্ব গড়ার লড়াই।
গৌরী লঙ্কেশ জন্মসূত্রে লড়াকু ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর ‘আধুনিক’। বাবা পি. লঙ্কেশ ছিলেন কন্নড় সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মহীরূহ, কিন্তু মেয়ে গৌরী বড় হয়েছিলেন ইংরেজি মিডিয়ামের আবহে। আশির দশকের শেষ এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে গৌরী ছিলেন দিল্লির সাংবাদিক মহলে এক পরিচিত নাম।
সেই সময় তিনি কাজ করতেন ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ এবং ‘সানডে’ ম্যাগাজিনে। তাঁর তৎকালীন সহকর্মী এবং প্রাক্তন স্বামী চিদানন্দ রাজঘট্টের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, গৌরী ছিলেন জীবনকে উপভোগ করা এক তরুণী। তিনি ভালোবাসতেন ইংরেজি সাহিত্য, হলিউডের সিনেমা এবং দীর্ঘ আড্ডা। তখন তাঁর সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু ছিল লাইফস্টাইল, আর্ট এবং আরবান কালচার। কন্নড় রাজনীতি বা গ্রামীণ কর্ণাটকের জটিল সমীকরণ তখন তাঁর ভাবনার চৌহদ্দিতেও ছিল না।
তিনি তখন এমন এক জগতের বাসিন্দা, যেখানে সাংবাদিকতা মানে হলো এসি রুমের আলোচনা, চমৎকার ইংরেজি গদ্য এবং সমাজের উঁচুতলার খবর। বাবার প্রতিষ্ঠিত ‘লঙ্কেশ পত্রিকে’-এর কট্টর সরকারবিরোধী অবস্থান এবং রুক্ষ মেজাজ থেকে তিনি নিজেকে সচেতনভাবেই দূরে রাখতেন। তিনি ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন, পরে সাংবাদিক হন—কিন্তু সেই সাংবাদিকতা ছিল নিরাপদ দূরত্বের। তখন কেউ ভাবতেও পারেনি যে, এই মেয়েটিই একদিন কন্নড় ভাষায় কলম ধরবে এবং সেই কলম তরোয়ালের চেয়েও ধারালো হবে।
২০০০ সালে পি. লঙ্কেশের মৃত্যু গৌরীর জীবনে এক বিশাল ভূমিকম্প হয়ে আসে। ‘লঙ্কেশ পত্রিকে’ তখন কর্ণাটকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ট্যাবলয়েড। বাবার মৃত্যুর পর প্রকাশক যখন পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন গৌরীর রক্তে থাকা সুপ্ত জেদ জেগে উঠল। তিনি মেনে নিতে পারেননি যে বাবার আজীবনের লড়াই এভাবে শেষ হয়ে যাবে।
দিল্লির কেরিয়ার, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং আভিজাত্য—সব ছেড়ে তিনি ফিরে এলেন বেঙ্গালুরুতে। কিন্তু পথটা সহজ ছিল না। সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ভাষা। গৌরী ইংরেজিতে ভাবতে এবং লিখতে অভ্যস্ত ছিলেন। কন্নড় তিনি বলতে পারতেন, কিন্তু সাংবাদিকতার উপযুক্ত কন্নড় লেখা তাঁর কাছে ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gauri Lankesh : মুসলমানদের থেকেও তাদের কাছে এই মহিলা ভয়ানক, কারণ গৌরী একজন হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও এই হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে লড়েছেন।
প্রথমদিকে তিনি ইংরেজিতে আর্টিকেল লিখতেন এবং তা কন্নড়ে অনুবাদ করাতেন। কিন্তু শীঘ্রই তিনি বুঝলেন, অনুবাদের ভাষায় বাবার পত্রিকার সেই ‘আগুন’ পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি নিজেই কন্নড় লিখতে শুরু করলেন। তাঁর কন্নড় ব্যাকরণগতভাবে নিখুঁত ছিল না, তাতে ইংরেজি শব্দের মিশেল থাকত। কিন্তু তা কখনওই তাঁর পাঠক এবং তাঁর লেখার মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তিনি পাঠকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার ভঙ্গিতে লিখতে শুরু করলেন। এই নতুন স্টাইলটিই পরে তাঁর ইউএসপি (USP) হয়ে দাঁড়ায়। তিনি প্রমাণ করলেন, পাণ্ডিত্য দিয়ে নয়, আবেগ দিয়ে পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছনো যায়।
ভাই বনাম বোন—আদর্শের সংঘাত ও একার লড়াই
বাবার মৃত্যুর পর ভাই ইন্দ্রজিৎ লঙ্কেশ এবং গৌরী মিলে পত্রিকা চালাচ্ছিলেন। কিন্তু ২০০৫ সাল নাগাদ আদর্শগত পার্থক্য প্রকট হয়ে ওঠে। ইন্দ্রজিৎ চেয়েছিলেন পত্রিকাটিকে বাণিজ্যিকীকরণ করতে এবং বিজ্ঞাপনের জন্য দ্বার উন্মুক্ত করতে। অন্যদিকে, গৌরী ছিলেন বাবার মতোই আপসহীন—‘নো অ্যাডভারটাইজমেন্ট পলিসি’-তে বিশ্বাসী।
সংঘাত চরমে পৌঁছয় যখন গৌরী নকশালদের একটি সাক্ষাৎকার ছাপান এবং ভাই ইন্দ্রজিৎ তাঁর বিরুদ্ধে ‘নকশাল সমর্থনের’ অভিযোগ আনেন। পত্রিকাটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ইন্দ্রজিৎ নিজের মতো পত্রিকা চালাতে থাকেন, আর গৌরী শূন্য হাতে বেরিয়ে আসেন।
সেই দিনটি ছিল গৌরীর জীবনের দ্বিতীয় জন্ম। তিনি শুরু করলেন ‘গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে’। পকেটে টাকা নেই, অফিস নেই, শুধু আছে মুষ্টিমেয় কিছু অনুগত সহকর্মী এবং বাবার রেখে যাওয়া আদর্শ। তিনি নিজের গয়না বিক্রি করেছেন, ব্যক্তিগত লোন নিয়েছেন, কিন্তু পত্রিকার পাতায় কোনোদিন কোনো কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের জায়গা দেননি। তিনি বলতেন, “বিজ্ঞাপন নিলে আমাকে তাদের কথা শুনতে হবে, আর আমি শুধু আমার পাঠকদের কথা শুনতে চাই।”
সাংবাদিক থেকে ‘অ্যাক্টিভিস্ট-এডিটর’
‘গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে’ কেবল একটি পত্রিকা ছিল না, এটি ছিল একটি আন্দোলন। ইংরেজি সাংবাদিকতার ‘অবজেক্টিভিটি’ বা নিরপেক্ষতার মুখোশ তিনি ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাংবাদিককে অবশ্যই নিপীড়িতের পক্ষে বা ‘সাবজেক্টিভ’ হতে হবে। তিনি কলম ধরলেন কর্ণাটকের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে। চিকমাগালুরের ‘বাবা বুদানগিরি’ দরগাকে যখন ‘দক্ষিণের অযোধ্যা’ বানানোর চেষ্টা করা হলো, গৌরী তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। তিনি শুধু লিখলেন না, রাস্তায় নেমে আন্দোলন করলেন। এই সময় থেকেই তিনি প্রশাসনের এবং দক্ষিণপন্থী শক্তির চক্ষুশূল হয়ে উঠলেন। তাঁর অফিসটি ছিল অদ্ভুত। সেখানে কোনো হায়ারার্কি বা পদমর্যাদা ছিল না। দলিত কর্মী, মুসলিম ছাত্রনেতা, এবং মূলস্রোতে ফিরতে চাওয়া মাওবাদীরা সেখানে নির্ভয়ে আসত। তিনি তাদের মা, বোন এবং বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সাংবাদিকতার সেই প্রথাগত দেওয়াল ভেঙে দিয়েছিলেন যেখানে সাংবাদিক এবং বিষয়ের (subject) মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখতে হয়।
শেষের দিনগুলোতে গৌরী ব্যক্তিগত জীবনে বেশ একা ছিলেন, কিন্তু জনজীবনে ছিলেন অসংখ্য মানুষের ভিড়ে। তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মানহানির মামলা হয়েছে। তাঁকে জেলে যেতে হয়েছে, জামিন নিতে হয়েছে। আর্থিক অনটনে পত্রিকার কাগজ কেনা দায় হয়েছে। কিন্তু তিনি থামেননি।
তিনি জানতেন তাঁকে থামানোর চেষ্টা করা হবে। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে এক সম্পাদকীয়তে তিনি লিখেছিলেন,
আমার নিজের রাজ্যে, আজ ‘মৃত্যু’ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। কিন্তু আমরা মাথা নত করব না।
গৌরী লঙ্কেশ দেখালেন যে, একজন নারী, যিনি একসময় হাই-হিল আর পার্টি পছন্দ করতেন, তিনি চাইলে হাওয়াই চটি পরে রোদে পুড়ে কৃষকের মিছিলে হাঁটতে পারেন। এই যে শ্রেণি-উত্তরণ (Class transition), এই যে নিজের কমফোর্ট জোনকে ধ্বংস করে এক বৃহত্তর স্বার্থে নিজেকে সঁপে দেওয়া—এটাই গৌরী লঙ্কেশের আসল উত্তরাধিকার।
গৌরী লঙ্কেশকে কেবল ‘নিহত সাংবাদিক’ হিসেবে মনে রাখাটা তাঁর প্রতি অবিচার। তাঁর জীবন ছিল এক রূপকথার মতো সফর—যেখানে রাজপ্রাসাদের সুখ ছেড়ে রাজকুমারী পথে নেমেছিলেন ধুলোবালি গায়ে মাখবেন বলে। তিনি কন্নড় জানতেন না ভালো করে, অথচ কন্নড় সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, ভাষা বা ব্যাকরণ নয়, সাংবাদিকতার আসল শক্তি হলো সাহস এবং সততা।






