গুগল ডাক্তার সহায়, নিজের চিকিৎসক নিজের হাতে, মৃত্যুকে ডাকছেন?
সামগ্রিকভাবে সভ্যতার সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে ইন্টারনেটে চিকিৎসা। এবার তাকে আশ্রয় করে রোগ নিরাময়ের চেষ্টা আসলে মানবতাকে ধ্বংসের নামান্তর।

ভার্চুয়ালি হেলথ কেয়ার। অর্থাৎ অনলাইনে চিকিৎসা, অনলাইনে পড়াশোনা, অনলাইনে খাওয়াদাওয়া, ডাক্তার দেখানো- এই ব্যবস্থা কোভিডকালে গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। এখন ভার্চুয়াল চিকিৎসার বিপদের দিক চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন ডাক্তাররা। পৃথিবীটা যদি ভার্চুয়ালের চাকায় ঘোরে, তাহলে অনলাইনে সাঁতার আর নাচ শেখাও সম্ভব? যদি সবকিছু ভার্চুয়ালি না হয়, তাহলে চিকিৎসা গুগুলের দৌলতে এত সহজলভ্য হয়ে উঠলে এর পরিণামও মারাত্মক। বলা ভালো, রোগ শরীরে বাসা বাঁধল, আর ছুটে গেলেন গুগল ডাক্তারের কাছে, এ কার্যত নিজের পায়ে কুড়ুল মারা! নিজের জন্য আগাম কবরটা কি খুঁড়ে রাখছেন না গুগুল ডাক্তারের সৌজন্যে? যে সম্ভাবনা সভ্যতার সংকট, তাকে অচিরেই ত্যাগ করা উচিত। ভার্চুয়াল ওটি, ভার্চুয়াল অস্ত্রোপচার- এসব কি সোনার পাথরবাটি নয়? তাহলে গুগল ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে সেলফ ডায়াগনসিস অর্থাৎ নিজের রোগ নিজে নির্ধারণ করবেন কেন? বর্তমানে বিশ্ব গুগলের মতো সার্চ ইঞ্জিনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এক মুহূর্তে গুগল আপনার মনের জিজ্ঞাসা মিটিয়ে দিচ্ছে সহজেই। এতে দোষ কী! তাই বলে গুগল ডাক্তার আপনার রোগ নিরাময় করবে? এমবিবিএস, এমডি, এফআরসিএস, এমএস- এইসব ডিগ্রি অর্জন করতে যাঁরা কালঘাম ঝরান, তাঁদের প্রয়োজন এত সহজে মিটিয়ে দিতে পারে গুগল ডাক্তার? বোধহয় না, আর তাই এমন ভার্চুয়াল চিকিৎসাকে আশ্রয় করলে, তা বিপদকে আলিঙ্গন করার শামিল। কীভাবে?
ভার্চুয়াল হেলফ কেয়ার– এই ব্যবস্থা বেশি করে চালু হয় কোভিডকালে। তখন ডাক্তাররাও অনলাইনে পরিষেবা দেওয়া শুরু করেন। অনলাইনে কী করে হার্ট, লাং এবং শরীরের অন্য অঙ্গ পরীক্ষা ছাড়াই শুধুমাত্র সিম্পটম অর্থাৎ লক্ষণের কথা শুনে শুরু হলো ওষুধ প্রেসক্রাইব? রোগ মারাত্মক হলেই রোগীর গন্তব্য হতো হাসপাতাল, তার আগে এই প্রবণতা সেই সময় থেকে জাঁকিয়ে বসল। এরপর রোগ হলেই রোগীরা গুগলের সাহায্য নিয়ে রোগের লক্ষণ সার্চ ইঞ্জিনে পুট করে ওষুধ জেনে নিচ্ছেন। এর নাম 'সেলফ ডায়গনোসিস’। অর্থাৎ, প্রকৃত ডাক্তারের সাহায্য না নিয়ে নিজের রোগ নিজে নির্ণয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সুকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, "এই প্রবণতা ভয়ংকর। প্রথমে অনেকে গুগল ডাক্তারের কাছে যান, তারপর হালে পানি না পেলে আসল ডাক্তারের কাছে ছোটেন। তখন রোগে অনেক ঘারিয়ে গেছে।" তিনি আরও বলেন, "সেলফ মেডিকেশন একটা ভয়ংকর দিক। সারা দেশে জেনেরিক নেমের থেকে ট্রেড নেমে অনেক ওষুধ বিক্রি হয়। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অনেক ওষুধ বিক্রি হয়। অনেক প্রেসক্রিপশন ইনকমপ্লিট। এগুলো এন্টারটেন করা হয়। এর ফল মারাত্মক হতে পারে। অর্থাৎ প্রেসক্রিপশন ছাড়া মুখে ওষুধ চাইলে তা কাউকে দেওয়া উচিত না।"
কমন সিনারিও অর্থাৎ সবার ভেতর জমে থাকা সাধারণ প্রবণতা কী?
হঠাৎ মাথা ঘুরে গেল, চোখ চুলকোচ্ছে, হার্ট রেট ঊর্ধ্বমুখী। চলে গেলেন ফোন বা ল্যাপটপের সামনে। গুগল ডাক্তারের শরাণাপন্ন হয়ে সার্চ ইঞ্জিনে লিখে ফেললেন সিম্পটম। তারপর চলে এল ওষুধের নাম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই রেজাল্ট কিন্তু সঠিক হয় না। একজন ডাক্তার রোগীকে পরীক্ষা করে যে চিকিৎসা সাজেস্ট করবেন, গুগল ডাক্তার কখনওই তা করতে পারে না। ফলে এই প্রবণতা মারাত্মক। এমনকী, এর ফলে মৃত্যু অকালে দরজায় এসে কড়া নাড়তে পারে। কমিউনিটি মেডিসিনের চিকিৎসক তুষারকান্তি সাহা বলেন, "ধরুন কারও পেন অ্যবডোমেন। অর্থাৎ পেটে ব্যথা। কী কারণে এটা হচ্ছে, তা বলতে পারে না গুগল ডাক্তার। এর জন্য ক্লিনিক্যাল একজামিনেশন প্রয়োজন। সেটা করতে পারেন একজন ফিজিশিয়ান। ক্লিনিক্যাল একজামিনেশনের মাধ্যমে দেখা যায় এটা অ্যাপেন্ডিসাইটিস, কোলাইটিস, গ্যাসট্রাইটিস না কার্ডিয়াক কোনও রোগের কারণে হচ্ছে। যাঁর গ্যাসট্রাইটিসের সমস্যা তাঁকে গুগল দিয়ে দিল কার্ডিয়াকের ওষুধ। ভেবে দেখুন কী বিপজ্জনক!’
Dr. Google-এর শরণাপন্ন
গুগলকে আশ্রয় করে সারা বিশ্বে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় আর এখন নতুন নয়। কানাডায় এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১৩ সালে মোট কানাডাবাসীর অর্ধেক গুগল সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করে। ২০২০ সালে এটা অনেক বেড়ে যায়। ৬৯ শতাংশ কানাডাবাসী ইন্টারনেট ব্যবহার করে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত খবরাখবর জানে। এবং ২৫ শতাংশ তাঁদের ফিটনেস এবং স্বাস্থ্যের হালহকিকত বোঝার চেষ্টা করে ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পুষ্টিবিদদের মতে বেশ কিছু কারণে অনেকেই ভাত খাওয়া বন্ধ করলেও এর বহুমুখী পুষ্টিগুণ শরীরের পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ভার্চুয়াল কেয়ার এবং অনলাইন সেলফ ডায়গনোসিস, অর্থাৎ, নিজে রোগ নির্ণয়ের প্রবণতা কেন বাড়ছে? অনেক সময় ডাক্তারের চেম্বার বাড়ি থেকে কাছে নয়, ফলে যাওয়ার অসুবিধে। চেম্বারে গিয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। অনলাইনে নিজে নিজে রোগ নির্ণয়ে এসবের ঝুঁকি নেই। তার ওপর অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তারদের ফিজ জোগাড় করা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই প্রথম অবস্থায় অনেকেই চান গুগলকে আশ্রয় করে সহজ সমাধান। বিপদ জেনেও।
নিজে রোগ নির্ণয়ের বিপদ
ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করতে গেলে শুধু যে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তা নয়, এর ফলে এক ধরনের আতঙ্ক ও ভয় রোগীদের মধ্যে বাসা বাঁধে। রোগ নিরাময়ে অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারে আপনি 'সাইবারকন্ড্রিয়া’-য় আক্রান্ত নন তো? মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংস করে দিতে পারে এই রোগ, কাজেই এখনই সাবধান হন।
কাকে বলে 'সাইবারকন্ড্রিয়া'?
সামান্য মাথা ব্যথা, শরীরের ব্যথা বা অন্যান্য ছোটখাটো অসুখের উপসর্গ দেখা দিলেই, ডাক্তারকে এড়িয়ে ইন্টারনেটে সব ধরনের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ওয়েবসাইট ঘেঁটে নিজে থেকে যে-কোনও একটি রোগের পরিকল্পনা করে নেওয়াকেই বিজ্ঞানীরা 'সাইবারকন্ড্রিয়া' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ভয়ংকর ও সাধারণ রোগের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে অনেকেরই স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ওয়েবসাইট ঘেঁটে ফেলাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যার ফলে আতঙ্কে ভুগছেন এইসব মানুষ। চিকিৎসকদের মতে এটি একটি বৃহৎ মানসিক সমস্যা, আর এই সমস্যাটির নামই হলো সাইবারকন্ড্রিয়া।
সেলফ ডায়গনোসিস বিপজ্জনক বলে বিপদঘণ্টা বাজালেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সুকুমার মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, "অনেকে গুগল থেকে ঘুমের ওষুধের নাম জেনে যেতে পারেন। এতে সুইসাইডের সম্ভাবনাও থেকে যাচ্ছে। বিপজ্জনক ওষুধ জমিয়ে একদিন কেউ সেটা খেয়ে ফেললেন। মৃত্যু অনিবার্য।"
চিকিৎসক তুষারকান্তি দাস বলেন, "মন ভালো করার ওষুধ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেট থেকে কোনও ওষুধ খেলে সাবকনশাস মাইন্ডে বিপদ জাঁকিয়ে বসতে পারে। প্রাথমিকভাবে উপকার পেলেও কোনও স্থায়ী সমস্যা হতে পারে। এর পরিণাম মারাত্মক!"
সোশ্যাল মিডিয়া ও মানসিক স্বাস্থ্য
সোশ্যাল মিডিয়া অনেক সময় বিপদের কারণ হতে পারে। যেমন অনেকে এই সব প্ল্যাটফর্মে রোগ সম্পর্কে তথ্য শেয়ার করে রেমিডি অর্থাৎ সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন। ডাক্তাররা বলছেন, এর ফল মারাত্মক। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কানাডায় অ্যাকটিভ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ২০২১ সালে বেড়ে হয়েছে ১.১ মিলিয়ন। সেই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যে ইন্টারনেটের প্রভাব ভয়ংকর চেহারা নিচ্ছে।
আমরা ইন্টারনেটে যা কিছু দেখি, সবটাই যে সঠিক, তা কিন্তু একেবারেই নয়। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ৫৫ শতাংশর বেশি লোক বিগত বছরে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য অনুসন্ধান করতে ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই কোনও না কোনও রোগের দ্বারা আক্রান্ত। তারা সকলেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজেদের রোগটি নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি আমাদের মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাবের পরিবর্তে নেতিবাচক প্রভাব বেশি ফেলছে। যার ফলে দেখা দিচ্ছে, নানা ধরনের মানসিক সমস্যা। এভাবেই ইন্টারনেট প্রভাব বিস্তার করছে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর।
সামগ্রিকভাবে সভ্যতার সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে ইন্টারনেটে চিকিৎসা। এবার তাকে আশ্রয় করে রোগ নিরাময়ের চেষ্টা আসলে মানবতাকে ধ্বংসের নামান্তর। প্রকৃত ডাক্তাররা বিপদঘণ্টা বাজাচ্ছেন, তাঁদের পরামর্শ না শুনে গুগল ডাক্তারের কাছে গেলে যে নিজের কবর নিজে খুঁড়ে রাখছেন!







