জনগণের টাকায় দেদার প্রচার! মোদি জমানায় বিজ্ঞাপনের পিছনে উড়ছে ২ কোটি টাকা রোজ

Modi Govt’s Advertisement: সরকারি প্রকল্প থেকে কর্মসূচী, প্রচারের ক্ষেত্রে যে ভাবে বিজ্ঞাপনের হাত ধরেছে সরকার, তা কার্যত অভাবনীয়। আর তার পিছনে কোষাগার থেকে খরচ হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

Sohini Das
৪ মিনিট
জনগণের টাকায় দেদার প্রচার! মোদি জমানায় বিজ্ঞাপনের পিছনে উড়ছে ২ কোটি টাকা রোজ

নব্বই ছিল বিজ্ঞাপনের দশক। প্রযুক্তির হাত ধরে যে নয়া যুগ উঠে এসেছিল, তার আরেকটি অন্যতম অস্ত্র ছিল বিজ্ঞাপন। নব্বইয়ের কবি তাই বলেছিলেন, 'মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।' কিন্তু পরবর্তী দশক দেখালো, বিজ্ঞাপনে শুধু মুখ ঢাকেই না। মুখ উঠেও আসে। কথায় বলে, ঢাক পেটানোর যুগ। আর লোকের কাছে পৌঁছনোর জন্য এই ঢাক পেটানো প্রয়োজনীয়। কিন্তু কতটা!

গত কয়েক বছর ধরেই আমরা দেখছি, কেন্দ্র হোক বা রাজ্য। সরকার যেন অনেকটাই বিজ্ঞাপন নির্ভর। রাস্তা জুড়ে, হোডিং জুড়ে রাজনৈতিক নেতাদের মুখ আগেও দেখা যেত। তবে তার মাত্রা আজ গিয়েছে বদলে। সরকারি প্রকল্প থেকে কর্মসূচী, প্রচারের ক্ষেত্রে যে ভাবে বিজ্ঞাপনের হাত ধরেছে সরকার, তা কার্যত অভাবনীয়। আর তার পিছনে কোষাগার থেকে খরচ হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সেই টাকা আসলে কার? জনগণের।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিজেপির বিরুদ্ধে বললেই টুইটার বন্ধের হুমকি দিয়েছিল সরকার! অভিযোগ কতখানি সত্য?

Jack Dorsey Indian Twitter Remark: বিজেপির নেতা সম্বিত পাত্র বলছেন, রাহুল গান্ধিই নেপথ্যে ডরসির পুতুল নাচাচ্ছেন।

২০১৪ সালে কংগ্রেস জমানার পতন ঘটিয়ে দেশে ক্ষমতায় আসে নরেন্দ্র মোদি সরকার। পরিসংখ্যান বলছে, সেই সময় থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার প্রায় ২.০৫ কোটি টাকা করে খরচ করছে প্রতিদিন। ঠিকই পড়ছেন। ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিজ্ঞাপনের পিছনে মোট ৬৪৯১.৫৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে মোদি সরকার। বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা করে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে প্রিন্ট মিডিয়ার বিজ্ঞাপন, তেমনই রয়েছে বৈদ্যুতিন মিডিয়ার বিজ্ঞাপনও। যা সবটাই দেওয়া হয়েছে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব কমিউনিকেশন (সিবিসি)-র মাধ্যমে। সরকারি হিসেব বলছে, গত ৮ বছর ৮ মাসে প্রিন্ট মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে মোদি সরকার খরচ করেছে এখনও পর্যন্ত ৩২৬০.৭৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যয় হয়েছে ৩২৬০.৭৯ কোটি টাকা। যা যোগ করলে দাঁড়ায় ৬৪৯১.৫৬ কোটি টাকার ওই বিরাট অঙ্কটা।

অঙ্কটা তাক লাগানোর মতো তো বটেই। সরকারি প্রকল্প, কর্মসূচী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিজ্ঞাপন তো প্রয়োজন। কিন্তু শুধু কি তাই! একই সঙ্গে রয়েছে হিন্দুত্ববাদের প্রচার, দলীয় কর্মসূচীর ঘোষণা। আর এই সমস্তটাই খরচ হচ্ছে কেন্দ্রের কোষাগার থেকে। যা আদতে আসছে আসলে জনসাধারণের দেওয়া কর থেকে। আয়কর থেকে জিএসটি, নানা রূপে নানা জায়গায় এই কর বিরাজমান। এদিকে, সরকারের কাছে রাজ্যের বকেয়া মেটানোর মতো টাকা নেই। রাস্তা করার টাকা নেই। হাসপাতাল করার টাকা নেই। শিক্ষার পিছনে খরচ করার মতো টাকা নেই। কিন্তু বিজ্ঞাপন দেওয়ার মতো আছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আপনার থেকে অন্তত ৩৭ টাকা কমে পেট্রোল কিনছে ভুটান! ৯ বছরে কত টাকা বাড়তি দিলেন ভেবেছেন?

Petrol-Diesel Price: ভারত সরকার তার নাগরিকদের কাছে তেলবাবদ যে কর নেয়, তা নেয় না ভুটান সরকার। বরং তারা কোষাগার ভরানোর চিন্তা পাশে সরিয়ে রেখে নাগরিকদের পরিষেবা দেওয়ার ব্যপারেই অনেক বেশি বদ্ধপরিকর।

তবে জানা গিয়েছে, ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে বিজ্ঞাপনের পিছনে যে বিপুল টাকা খরচ করেছিল মোদি সরকার, তার তুলনায় গত আর্থিক বছরে বিজ্ঞাপনের খরচ নাকি কমেছে অন্তত ৬৮ শতাংশ। ২০১৪-১৫ সালে কেন্দ্রের বিজ্ঞাপন বাবদ প্রিন্ট মিডিয়ায় খরচ হয়েছিল ৪২৪.৮৪ কোটি টাকা। বৈদ্যুতিন মাধ্যমে খরচ হয়েছে ৪৭৩.৬৭ কোটি টাকার কাছাকাছি। ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে সেই খরচ আরও বেড়েছে। প্রিন্ট মিডিয়ার বিজ্ঞাপনের পিছনে ৫০৮.২২ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল সে বছর। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় খরচ হয়েছিল ৫৩১.৬০ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে প্রিন্ট মিডিয়ার বিজ্ঞাপনপিছু খরচ সামান্য কমলেও বাড়ে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার খরচ। পৌঁছয় প্রায় ৬০৯.১৫ কোটি টাকায়। আবার ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে বেড়েছে প্রিন্টমিডিয়ার খরচ। ৬৩৬.০৯ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বিজ্ঞাপনের পিছনে। ২০১৮ সাল থেকেই কিছুটা রাশ টানা হয়েছে বিজ্ঞাপনের খরচে। ২০২০-২১ অর্থেবর্ষে প্রিন্ট মিডিয়ার খরচ কমে আসে ১৯৭.৪৯ কোটি টাকায়। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় খরচ হয়েছে ১৬৭.৯৮ কোটি এবং প্রিন্ট মিডিয়ায় ১৯৭.৪৯ কোটি টাকা। ২০২১-২২ সালেও কমানো হয়েছে খরচ। গত অর্থবর্ষে বিজ্ঞাপনের জন্য প্রিন্ট মিডিয়াতে খরচ করা হয়েছে ১৭৯.০৪ কোটি টাকা এবং বৈদ্যুদিন মিডিয়ায় ১০১.২৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০১৪-১৫ সালে যেখানে বিজ্ঞাপনবাবদ মোট খরচ হয়েছিল ৮৯৮.৫১ কোটি টাকা, সেখানে গত অর্থবর্ষে খরচ হয়েছে মোট ২৮০.২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৬৮ শতাংশ কমেছে খরচ।

যদিও সংবাদমাধ্যমের দিক থেকে দেখতে গেলে একটি ব্যপার ভালো। প্রিন্ট হোক বা বৈদ্যুতিন মিডিয়া, তাদের আয়ের পিছনে যতটা না হাত পাঠকের থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি থাকে বিজ্ঞাপনের। আর সেখানে সরকারি বিজ্ঞাপন হচ্ছ সোনার ডিম পাড়া হাঁস। যার উপর অনেকটাই দাঁড়িয়ে থাকে সংবাদমাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের ভবিষ্যৎ। সরকারি বিজ্ঞাপনের মুখ চেয়ে অনেক সময় অনেক কিছুই গিলেও নিতে হয় সংবাদমাধ্য়মকে। কারণ দিনের শেষে কথা বলে পাকস্থলি। আর মিডিয়াকে বশে রাখার ক্ষেত্রে এর চেয়ে মোক্ষম ব্রহ্মাস্ত্রও বা কী-ই বা থাকতে পারে সরকারের হাতে! কিন্তু প্রতিবছর সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হচ্ছে শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনের জন্য, সে টাকাটা উন্নয়নের পিছনে ব্যয় হলে কত কী করা যেত, ভেবে দেখেছেন কখনও?

অবিজেপি রাজ্যগুলি প্রায়শই অভিযোগ করে কেন্দ্রের তরফে রাজ্যের বকেয়া রয়ে গিয়েছে বড় অংশ। ডিএ চেয়ে রাস্তায় আন্দোলন করছেন হাজারও সরকারি কর্মী। কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত বাড়ছে দিনদিন। দোষারোপ বাড়ছে, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বাড়ছে। এর মধ্যে ঘুরে যাচ্ছে ভোট। আরও বাড়ছে বিজ্ঞাপনের খরচ। কিন্তু সমস্যা মিটছে না। হাসপাতালে পরিকাঠামোর অভাব থেকে শুরু করে শিক্ষা, রয়েছে হাজারটা সমস্যা। গ্রামাঞ্চলে তো তা আরও কয়েকগুণ বেশি। বাড়ছে স্কুলছুটের হার। অথচ বিজ্ঞাপন পৌঁছে গিয়েছে সেখানেও। 'আচ্ছে দিন'-এর প্রতিশ্রুতি পৌঁছেছে, নরেন্দ্র মোদীর 'নোটবন্দি'-র ঘোষণা পৌঁছেছে। ঘোষণা পৌঁছেছে লকডাউনেরও। অথচ অতিমারিতে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটেও বাড়ি পৌঁছতে পারেননি বহু পরিযায়ী শ্রমিক, বা তাঁদের শবদেহ পৌঁছেছে। কিন্তু সেসব জায়গাতেও বিজ্ঞাপন পৌঁছে গিয়েছে অবলীলায়। প্রযুক্তির জোর বোধহয় একেই বলে। যে প্রযুক্তিতে ভর করে 'ডিজিটাল ইন্ডিয়া', 'আচ্ছে দিন' আসার স্বপ্ন দেখাচ্ছে মোদি সরকার। আমরা স্বপ্ন দেখছি বিজ্ঞাপনে।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সিজেপির কর্মসূচির আগে ৬ হাজার পুলিশ, দুর্ভেদ্য দুর্গ কনট প্লেস

Connaught Place protest: সিজেপির কর্মসূচির আগে কনট প্লেস এবং তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে দিল্লি পুলিশ। কনট প্লেসের আশপাশে ৬ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?