জনগণের টাকায় দেদার প্রচার! মোদি জমানায় বিজ্ঞাপনের পিছনে উড়ছে ২ কোটি টাকা রোজ
Modi Govt’s Advertisement: সরকারি প্রকল্প থেকে কর্মসূচী, প্রচারের ক্ষেত্রে যে ভাবে বিজ্ঞাপনের হাত ধরেছে সরকার, তা কার্যত অভাবনীয়। আর তার পিছনে কোষাগার থেকে খরচ হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

নব্বই ছিল বিজ্ঞাপনের দশক। প্রযুক্তির হাত ধরে যে নয়া যুগ উঠে এসেছিল, তার আরেকটি অন্যতম অস্ত্র ছিল বিজ্ঞাপন। নব্বইয়ের কবি তাই বলেছিলেন, 'মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।' কিন্তু পরবর্তী দশক দেখালো, বিজ্ঞাপনে শুধু মুখ ঢাকেই না। মুখ উঠেও আসে। কথায় বলে, ঢাক পেটানোর যুগ। আর লোকের কাছে পৌঁছনোর জন্য এই ঢাক পেটানো প্রয়োজনীয়। কিন্তু কতটা!
গত কয়েক বছর ধরেই আমরা দেখছি, কেন্দ্র হোক বা রাজ্য। সরকার যেন অনেকটাই বিজ্ঞাপন নির্ভর। রাস্তা জুড়ে, হোডিং জুড়ে রাজনৈতিক নেতাদের মুখ আগেও দেখা যেত। তবে তার মাত্রা আজ গিয়েছে বদলে। সরকারি প্রকল্প থেকে কর্মসূচী, প্রচারের ক্ষেত্রে যে ভাবে বিজ্ঞাপনের হাত ধরেছে সরকার, তা কার্যত অভাবনীয়। আর তার পিছনে কোষাগার থেকে খরচ হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সেই টাকা আসলে কার? জনগণের।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Jack Dorsey Indian Twitter Remark: বিজেপির নেতা সম্বিত পাত্র বলছেন, রাহুল গান্ধিই নেপথ্যে ডরসির পুতুল নাচাচ্ছেন।
২০১৪ সালে কংগ্রেস জমানার পতন ঘটিয়ে দেশে ক্ষমতায় আসে নরেন্দ্র মোদি সরকার। পরিসংখ্যান বলছে, সেই সময় থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার প্রায় ২.০৫ কোটি টাকা করে খরচ করছে প্রতিদিন। ঠিকই পড়ছেন। ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিজ্ঞাপনের পিছনে মোট ৬৪৯১.৫৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে মোদি সরকার। বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা করে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে প্রিন্ট মিডিয়ার বিজ্ঞাপন, তেমনই রয়েছে বৈদ্যুতিন মিডিয়ার বিজ্ঞাপনও। যা সবটাই দেওয়া হয়েছে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব কমিউনিকেশন (সিবিসি)-র মাধ্যমে। সরকারি হিসেব বলছে, গত ৮ বছর ৮ মাসে প্রিন্ট মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে মোদি সরকার খরচ করেছে এখনও পর্যন্ত ৩২৬০.৭৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যয় হয়েছে ৩২৬০.৭৯ কোটি টাকা। যা যোগ করলে দাঁড়ায় ৬৪৯১.৫৬ কোটি টাকার ওই বিরাট অঙ্কটা।
অঙ্কটা তাক লাগানোর মতো তো বটেই। সরকারি প্রকল্প, কর্মসূচী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিজ্ঞাপন তো প্রয়োজন। কিন্তু শুধু কি তাই! একই সঙ্গে রয়েছে হিন্দুত্ববাদের প্রচার, দলীয় কর্মসূচীর ঘোষণা। আর এই সমস্তটাই খরচ হচ্ছে কেন্দ্রের কোষাগার থেকে। যা আদতে আসছে আসলে জনসাধারণের দেওয়া কর থেকে। আয়কর থেকে জিএসটি, নানা রূপে নানা জায়গায় এই কর বিরাজমান। এদিকে, সরকারের কাছে রাজ্যের বকেয়া মেটানোর মতো টাকা নেই। রাস্তা করার টাকা নেই। হাসপাতাল করার টাকা নেই। শিক্ষার পিছনে খরচ করার মতো টাকা নেই। কিন্তু বিজ্ঞাপন দেওয়ার মতো আছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Petrol-Diesel Price: ভারত সরকার তার নাগরিকদের কাছে তেলবাবদ যে কর নেয়, তা নেয় না ভুটান সরকার। বরং তারা কোষাগার ভরানোর চিন্তা পাশে সরিয়ে রেখে নাগরিকদের পরিষেবা দেওয়ার ব্যপারেই অনেক বেশি বদ্ধপরিকর।

তবে জানা গিয়েছে, ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে বিজ্ঞাপনের পিছনে যে বিপুল টাকা খরচ করেছিল মোদি সরকার, তার তুলনায় গত আর্থিক বছরে বিজ্ঞাপনের খরচ নাকি কমেছে অন্তত ৬৮ শতাংশ। ২০১৪-১৫ সালে কেন্দ্রের বিজ্ঞাপন বাবদ প্রিন্ট মিডিয়ায় খরচ হয়েছিল ৪২৪.৮৪ কোটি টাকা। বৈদ্যুতিন মাধ্যমে খরচ হয়েছে ৪৭৩.৬৭ কোটি টাকার কাছাকাছি। ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে সেই খরচ আরও বেড়েছে। প্রিন্ট মিডিয়ার বিজ্ঞাপনের পিছনে ৫০৮.২২ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল সে বছর। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় খরচ হয়েছিল ৫৩১.৬০ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে প্রিন্ট মিডিয়ার বিজ্ঞাপনপিছু খরচ সামান্য কমলেও বাড়ে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার খরচ। পৌঁছয় প্রায় ৬০৯.১৫ কোটি টাকায়। আবার ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে বেড়েছে প্রিন্টমিডিয়ার খরচ। ৬৩৬.০৯ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বিজ্ঞাপনের পিছনে। ২০১৮ সাল থেকেই কিছুটা রাশ টানা হয়েছে বিজ্ঞাপনের খরচে। ২০২০-২১ অর্থেবর্ষে প্রিন্ট মিডিয়ার খরচ কমে আসে ১৯৭.৪৯ কোটি টাকায়। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় খরচ হয়েছে ১৬৭.৯৮ কোটি এবং প্রিন্ট মিডিয়ায় ১৯৭.৪৯ কোটি টাকা। ২০২১-২২ সালেও কমানো হয়েছে খরচ। গত অর্থবর্ষে বিজ্ঞাপনের জন্য প্রিন্ট মিডিয়াতে খরচ করা হয়েছে ১৭৯.০৪ কোটি টাকা এবং বৈদ্যুদিন মিডিয়ায় ১০১.২৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০১৪-১৫ সালে যেখানে বিজ্ঞাপনবাবদ মোট খরচ হয়েছিল ৮৯৮.৫১ কোটি টাকা, সেখানে গত অর্থবর্ষে খরচ হয়েছে মোট ২৮০.২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৬৮ শতাংশ কমেছে খরচ।
যদিও সংবাদমাধ্যমের দিক থেকে দেখতে গেলে একটি ব্যপার ভালো। প্রিন্ট হোক বা বৈদ্যুতিন মিডিয়া, তাদের আয়ের পিছনে যতটা না হাত পাঠকের থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি থাকে বিজ্ঞাপনের। আর সেখানে সরকারি বিজ্ঞাপন হচ্ছ সোনার ডিম পাড়া হাঁস। যার উপর অনেকটাই দাঁড়িয়ে থাকে সংবাদমাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের ভবিষ্যৎ। সরকারি বিজ্ঞাপনের মুখ চেয়ে অনেক সময় অনেক কিছুই গিলেও নিতে হয় সংবাদমাধ্য়মকে। কারণ দিনের শেষে কথা বলে পাকস্থলি। আর মিডিয়াকে বশে রাখার ক্ষেত্রে এর চেয়ে মোক্ষম ব্রহ্মাস্ত্রও বা কী-ই বা থাকতে পারে সরকারের হাতে! কিন্তু প্রতিবছর সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হচ্ছে শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনের জন্য, সে টাকাটা উন্নয়নের পিছনে ব্যয় হলে কত কী করা যেত, ভেবে দেখেছেন কখনও?
অবিজেপি রাজ্যগুলি প্রায়শই অভিযোগ করে কেন্দ্রের তরফে রাজ্যের বকেয়া রয়ে গিয়েছে বড় অংশ। ডিএ চেয়ে রাস্তায় আন্দোলন করছেন হাজারও সরকারি কর্মী। কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত বাড়ছে দিনদিন। দোষারোপ বাড়ছে, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বাড়ছে। এর মধ্যে ঘুরে যাচ্ছে ভোট। আরও বাড়ছে বিজ্ঞাপনের খরচ। কিন্তু সমস্যা মিটছে না। হাসপাতালে পরিকাঠামোর অভাব থেকে শুরু করে শিক্ষা, রয়েছে হাজারটা সমস্যা। গ্রামাঞ্চলে তো তা আরও কয়েকগুণ বেশি। বাড়ছে স্কুলছুটের হার। অথচ বিজ্ঞাপন পৌঁছে গিয়েছে সেখানেও। 'আচ্ছে দিন'-এর প্রতিশ্রুতি পৌঁছেছে, নরেন্দ্র মোদীর 'নোটবন্দি'-র ঘোষণা পৌঁছেছে। ঘোষণা পৌঁছেছে লকডাউনেরও। অথচ অতিমারিতে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটেও বাড়ি পৌঁছতে পারেননি বহু পরিযায়ী শ্রমিক, বা তাঁদের শবদেহ পৌঁছেছে। কিন্তু সেসব জায়গাতেও বিজ্ঞাপন পৌঁছে গিয়েছে অবলীলায়। প্রযুক্তির জোর বোধহয় একেই বলে। যে প্রযুক্তিতে ভর করে 'ডিজিটাল ইন্ডিয়া', 'আচ্ছে দিন' আসার স্বপ্ন দেখাচ্ছে মোদি সরকার। আমরা স্বপ্ন দেখছি বিজ্ঞাপনে।







