সপ্তাহে মাত্র ২ ঘণ্টা ওজন তুললেই কমতে পারে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি! বলছে গবেষণা
বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড টিএইচ চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথ-এর সাম্প্রতিক একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বলছে, সপ্তাহে মাত্র ৯০ মিনিট থেকে দুই ঘণ্টা (অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট) ওয়েট ট্রেনিং করলেই অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমে যেতে পারে। গবেষক ইওয়েন ঝাং-এর নেতৃত্বে প্রায় ১ লক্ষ ৪৭ হাজার পুরুষ ও মহিলার উপর টানা ৩০ বছর ধরে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে।
ভাবুন তো, বয়স যখন আশি বা নব্বই ছুঁইছুঁই, তখনও আপনি নিজের ব্যাগ নিজে পিঠে ঝুলিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন দুনিয়াময়! কিংবা কোনো কষ্ট ছাড়াই কোলে নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, মেতে উঠছেন তাদের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলায়। কেমন হতো বলুন তো?
আজকাল সাতাশ-আটাশ বছরের তরুণ-তরুণীরা এমন একটা স্বাধীন, রোগমুক্ত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। যেমন ব্রিটেনের বছর আটাশের তরুণী এলিজাবেথ। এলিজাবেথ এখনই নিয়মিত ওজন তোলার ব্যায়াম বা ওয়েট ট্রেনিং করেন। কেন জানেন? কারণ তিনি চান, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যেন তাকে কারও উপর যাতে নির্ভর করতে না হয়।
আমরা অনেকেই ভাবি, জিমে গিয়ে ওজন তোলা বা ওয়েট ট্রেনিং করা মানেই হলো পেশীবহুল শরীর বানানো বা বডি বিল্ডিং। কিন্তু বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড টিএইচ চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথ-এর সাম্প্রতিক একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা আমাদের সম্পূর্ণ অন্য এক কথা বলছে। গবেষক ইওয়েন ঝাং-এর নেতৃত্বে প্রায় ১ লক্ষ ৪৭ হাজার পুরুষ ও মহিলার উপর টানা ৩০ বছর ধরে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে। আর তার ফলাফল যা এসেছে, তা এককথায় চমকপ্রদ!
গবেষণা বলছে, সপ্তাহে মাত্র ৯০ মিনিট থেকে দুই ঘণ্টা (অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট) ওয়েট ট্রেনিং করলেই অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে যেতে পারে।
বিজ্ঞানের চোখে ‘সুইট স্পট’
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Body Clock And Fitness: যুক্তরাজ্যের 'ওপেন হার্ট' (Open Heart) জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, নিজের ক্রোনোটাইপের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যায়াম করলে হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পায়।
বিজ্ঞানীরা এই গবেষণায় একটি চমৎকার ‘সুইট স্পট’ বা আদর্শ সময়ের খোঁজ পেয়েছেন। সেটি হলো সপ্তাহে ৯০ থেকে ১১৯ মিনিট। দীর্ঘদিন ধরে যারা নিয়মিত এইটুকু সময় শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম বা স্ট্রেংথ ট্রেনিং করেছেন, তাদের শরীরে অলৌকিক সব পরিবর্তন দেখা গিয়েছে:
হৃদরোগের ছুটি: যারা নিয়মিত এই ব্যায়াম করেছেন, সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো হৃদরোগে মারা যাওয়ার ঝুঁকি কমেছে প্রায় ১৯%।
মস্তিষ্ক থাকবে চনমনে: সবচেয়ে বড় চমক দেখা গিয়েছে স্নায়ুজনিত রোগের ক্ষেত্রে। বয়স বাড়লে ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমারের মতো স্মৃতিভ্রংশের রোগে ভোগেন অনেকেই। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নিয়মিত ওয়েট ট্রেনিংয়ে এই ধরনের রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি কমে গিয়েছে ২৭% পর্যন্ত!
অকাল মৃত্যুকে ফাঁকি: যেকোনো কারণে হুট করে অকাল মৃত্যুর সামগ্রিক ঝুঁকি কমে গিয়েছে প্রায় ১৩%।
কিন্তু অনেকেই ভাবতে পারেন, সপ্তাহে ২ ঘণ্টায় যদি এত লাভ হয়, তবে রোজ ২ ঘণ্টা করলে তো অমর হয়ে যাব! গবেষকেরা কিন্তু এি বিষয়ে সাবধান করেছেন। তারা দেখেছেন, সপ্তাহে ১২০ মিনিট বা ২ ঘণ্টার বেশি ওয়েট ট্রেনিং করলে বাড়তি কোনো লাভ হয় না। অর্থাৎ, বেশি খাটলেই বেশি ফল—এই নিয়ম এখানে খাটছে না। উল্টে চোট-আঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কেন স্ট্রেংথ ট্রেনিং এত শক্তিশালী?
আমাদের পেশী বা মাসল কেবল শরীরকে আকৃতি দেয় না, এটি আসলে একটা আস্ত ওষুধের কারখানা। যখন আমরা ওজন তুলি, তখন আমাদের পেশী থেকে এক ধরনের বিশেষ রাসায়নিক কণা নিঃসৃত হয়, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘মায়োকাইনস’ (Myokines)। এই কণাগুলি রক্তে মিশে সোজা চলে যায় মাথায় এবং আমাদের মস্তিষ্ককে বুড়িয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বয়স ধরে রাখা বা চিরযৌবন পাওয়ার গবেষণায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বজুড়ে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন প্রযুক্তি ব্যবসায়ী (টেক এন্টারপ্রেনার) ব্রায়ান জনসন। তবে বহু বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালার পর, নিজের এই দীর্ঘ পথচলা থেকে তিনি বেশ অদ্ভুত এবং সহজ একটি শিক্ষা পেয়েছেন।
তাছাড়া, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরের হাড় ক্ষয়ে যেতে থাকে, পেশী আলগা হয়ে যায়। ওয়েট ট্রেনিং হাড়ের ঘনত্ব বাড়ায়, বাতের বা জয়েন্টের ব্যথা কমায় এবং শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখে।
সুপার কম্বো: ১ আর ১ মিলে যখন ১১!
হাঁটা, জগিং, সাঁতার বা সাইকেল চালানোর মতো অ্যারোবিক এক্সারসাইজের উপকারিতা তো আমরা সবাই জানি। বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থাগুলিও সব সময় এগুলি করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু এই নতুন গবেষণা বলছে, আপনি যদি দীর্ঘায়ু হতে চান, তবে আসল ম্যাজিক লুকিয়ে আছে ‘সুপার কম্বো’র মধ্যে।
যারা সপ্তাহে বেশ কয়েক ঘণ্টা অ্যারোবিক এক্সারসাইজ (যেমন জগিং বা সাইক্লিং) করার পাশাপাশি এই ৯০ থেকে ১২০ মিনিট স্ট্রেংথ ট্রেনিং করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৫৩ থেকে ৫৮% পর্যন্ত কমে গিয়েছে! চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের জন্য এর চেয়ে বড় লাইফ হ্যাক আর হতেই পারে না।
যেভাবে শুরু করবেন
হুট করে কালই জিমে গিয়ে খুব বেশি ভারী ওজন তোলার কোনো প্রয়োজন নেই। শুরুটা হোক সহজ এবং নিয়মতান্ত্রিক।
সপ্তাহে মাত্র ২ দিন সময় বার করুন। প্রতি সেশনে ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট রাখুন। পুরো শরীরের ব্যায়াম যেমন—স্কোয়াটস, পুশ-আপ, এবং হালকা ওজন নিয়ে বডি রোটেশনের মতো বেসিক মুভমেন্টগুলি করুন।
প্রথম দিনই ভারী ওজন না তুলে আস্তে আস্তে ওজন বা রেপসের সংখ্যা বাড়ান। ব্যায়ামের ‘ফর্ম’ বা অঙ্গভঙ্গি ঠিক রাখা সবচেয়ে জরুরি, না হলে চোট লাগতে পারে। প্রয়োজনে শুরুর দিকে কোনো ট্রেনারের সাহায্য নিন।
পেশী তৈরি ও তা ধরে রাখার জন্য খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন (ডিম, মাছ, মাংস, ডাল বা পনির) রাখা দরকার। আর শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন।
আপনার বয়স যদি একটু বেশি হয়, কিংবা শরীরে যদি আগে থেকেই কোনো বড় রোগ বা সমস্যা থাকে, তবে যেকোনো নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই একবার ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জিম বা ওয়েট ট্রেনিং মানেই কেবল তরুণদের সিক্স-প্যাক বানানোর জায়গা নয়। এটা আসলে সুস্থভাবে বাঁচার, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়িয়ে বুড়ো বয়সেও পৃথিবী ঘুরে দেখার এক অমোঘ চাবিকাঠি।






