পুরীর মন্দিরের ধনরত্ন যেভাবে লুঠ হয়ে চলে গিয়েছিল দিল্লিতে

সে অনেককাল আগের কথা। যাবতীয় পাগলামির পর রাজকোষ একরকম শূন্য করেই মুহম্মদ-বিন-তুঘলক মারা গিয়েছেন। তার খেসারত গুনছিল সুলতানি শাসন। ‘পাগলা রাজা’-র প্রিয় পাত্র ফিরোজ শাহকে দিল্লির মসনদে বসার অনুরোধ করা হয়েছে। ফিরোজ শাহ এমনিতেই শান্ত স্বভাবের মানুষ। রাজনীতির ঝামেলা তাঁর বিশেষ পছন্দ ছিল না। কাজেই তিনি প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। এদিকে সুলতানের মারা যাওয়ার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। অরক্ষিত সাম্রাজ্যের লোভে থাট্টায় মোঙ্গল ও নানা ডাকাতদের চূড়ান্ত অত্যাচার শুরু হল। মধ্যমণি নেই। দস্যুদের সামনে অসংগঠিত সেনারা দাঁড়াতে পারছে না। তুঘলক মারা যাওয়ার তিনদিনের মাথায় রাজকোষ আক্রমণ করে বসল তারা। ভাবগতিক সুবিধের নয় দেখে সেনারাও আখের গুছিয়ে নিতে শুরু করল। ১৩৫১ খৃস্টাব্দে তুর্কি দাস তাগিরের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে মহম্মদ-বিন-তুঘলক যেদিন মারা গেলেন, তার চার দিনের মাথায় এইসব যাবতীয় বিশৃঙ্খলা লক্ষ করে একরকম বাধ্য হয়েই সিংহাসনে বসেন ফিরোজ শাহ।

তখত্ গ্রহণের দিনদুয়েকের মাথায় সৈন্য দলের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনলেন ফিরোজ শাহ। পরের দিন কয়েকজন আমিরকে পাঠালেন আক্রমণরত মোঙ্গলদের উদ্দেশে। সেই সংগঠিত আক্রমণে বন্দি হল মোঙ্গল আমিরেরা। হেরে গেল থাট্টাবাসী দুর্বৃত্ত। বাকি মোঙ্গল সেনা তখন পালিয়ে প্রাণ বাঁচাল। সার্বিকভাবে দমিত হল বিদ্রোহ। ফিরোজ শাহ সিস্তান হয়ে দিল্লিতে ফেরার পথ ধরলেন। কিন্তু রাজধানীতে নতুন সুলতানের অনুপস্থিতিতে ঘটে গিয়েছিল আরেক কাণ্ড। ফিরোজের তখতে বসা মেনে নিতে পারেননি মহম্মদ-বিন-তুঘলকের আরেক প্রিয় পাত্র আহমদ আয়াজ। বয়স তাঁর সত্তর ছাড়িয়েছে, কিন্তু সলতানাতের লোভ বড় বিষম বস্তু! তিনি সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে সুলতানের অনুপস্থিতিতে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। রাজকোষ উজাড় করে নিজেদের লোকেদের কোঁচড় ভরে তুললেন। ফিরোজ এই খবর পেলেন দিল্লি ফেরার পথে। সরাসরি দিল্লি ফিরলেন না। তাঁর মামাবাড়ি দেবপালপুরে (মতান্তরে দিকপালপুর) সেনা নিয়ে অবস্থান করলেন। ফলে সরাসরি হামলার মুখে পড়তে হল না। এদিকে পালানো অসম্ভব বুঝতে পেরে হাঁসি থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে প্রায় ত্রিশ কোশ দূরে এসে আয়াজ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলেন। তখতে বসেই এই বিচক্ষণতার পরিচয় ফিরোজের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছিল।

এহেন ফিরোজ শাহ দু'দু'-বার বাংলা আক্রমণ করে বসলেন। তাঁর সুলতান হওয়ার আগে যেসব এলাকা সলতানাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, সেগুলিকে পুনরায় সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা খুব একটা করেননি তিনি। কিন্তু বাংলা আক্রমণের কারণ ছিল। এদিকে বাংলায় তখন ইলিয়াস শাহ স্বাধীন সুলতান হয়ে বসেছেন। সাতগাঁও, লখনউতি ও সোনারগাঁও দখল করে ‘বাঙ্গালাহ্‌’ নাম প্রবর্তন করেছেন ইলিয়াস শাহ। ক্রমে চম্পারণ, গোরক্ষপুর, বারাণসী অবধি ইলিয়াসের সাম্রাজ্য এগিয়ে এলে ফিরোজ কিঞ্চিৎ নড়েচড়ে বসেন। ১৩৫৩ সালে ৯০,০০০ অশ্বারোহী, প্রচুর পদাতিক, ধনুর্বিদ ও এক হাজার রণতরী নিয়ে বাংলার দিকে রওনা হন ফিরোজ। ইলিয়াস যুদ্ধ করেননি। চম্পারণ, ত্রিহুত, গোরক্ষপুর ছেড়ে ইলিয়াস সরে আসেন ক্রমশ পূর্বে। তাঁর রাজধানী পাণ্ডুয়াও দখল করে নেন সুলতান। তখন পরিবার-পরিজন নিয়ে একডালা দুর্গে আশ্রয় নেন ইলিয়াস। দুর্গ অবরোধ করেন ফিরোজ, কিন্ত কিছুতেই সুবিধে করে উঠতে পারেন না। তার ওপর বর্ষা চলে আসে। মশা, মাছি, সাপের উপদ্রবে, জমির পাঁকে শুকনো অঞ্চলের মানুষ নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। অবরোধ তুলতে বাধ্য হন ফিরোজ। তিনি একটু সরে এলেই ইলিয়াস শাহ পিছন থেকে সুলতানি বাহিনীকে আক্রমণ করেন। কিন্তু বিশেষ সুবিধা হয় না। আবার আশ্রয় নেন দুর্গের ভেতরেই। ফলে বিফলমনোরথ ক্রুদ্ধ ফিরোজ আবার রাজধানীর দিকে ফেরেন।

আরও পড়ুন: স্বয়ং জগন্নাথের লীলা না কি অন্য অলৌকিক— পুরীর মন্দিরে যে রহস্যের উত্তর পাওয়া যায়নি আজও 

এই ফেরার পথেই ক্রুদ্ধ সুলতান বহু রাজ্যপাট দখল করতে করতে ফেরেন। উড়িষ্যা আক্রমণের কোনও পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। কিন্তু চলার পথে আকস্মিকভাবেই কলিঙ্গ আক্রমণ করেন ফিরোজ। তখন উড়িষ্যার রাজা চতুর্থ ভানুদেব। পূর্বগঙ্গা বংশের এই শেষ রাজাটি ছিলেন অত্যন্ত অযোগ্য। তাঁকে ‘আকটা’ বা ‘আবট’ বলেও ডাকত লোকে। উড়িষ্যার জনগণের কাছে তিনিই ছিলেন ‘পাগল রাজা’। রাজ্যচালনার বিন্দুবিসর্গও তাঁর জানা ছিল না। কাজেই ফিরোজ শাহ বঙ্গ আক্রমণ করছেন, যে কোনও সময় তাঁর রাজ্যের উপরেও যে আক্রমণ নামতে পারে– একথা তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। ওই রাজনৈতিক সংকটজনক অবস্থায় তিনি তাঁর রাজ্য ছেড়ে বাইরে গিয়েছিলেন। তাঁর রাজধানীতে ফিরতে ফিরতে ফিরোজ শাহ পুরীর মন্দিরের যাবতীয় ধনরত্ন লুঠ করে জাজানগর হয়ে চলে গিয়েছেন দিল্লির পঠে। বস্তুত, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের বিপুল ধনরত্ন লুঠ করতে ফিরোজ শাহকে কোনও রকম প্রতিরোধের মুখেই পড়তে হয়নি। ত্রিমূর্তির কী পরিণতি হয়েছিল, তা তেমন জানা যায় না। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অরক্ষিত অবস্থায় আক্রান্ত হয়ে মন্দিরের সেবায়েতরা ত্রিমূর্তি বিগ্রহ ছুঁড়ে ফেলেন মহোদধিতে। মহোদধির অর্থ বঙ্গোপসাগর। যদিও এর কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। এরপরে আরও একবার বাংলা আক্রমণ করেন ফিরোজ শাহ। সেবারও যুদ্ধে জিতে উঠতে পারেননি তিনি। অগত্যা বাংলার স্বাধীনতা তাঁকে স্বীকার করে নিতে হয়। যদিও সেবার উড়িষ্যা আর আক্রমণ করেননি সুলতান। অবশ্য ততদিনে পূর্বগঙ্গা বংশটিই অপদার্থ চতুর্থ ভানুদেবের পাল্লায় পড়ে শেষ হয়ে গিয়েছে। রয়ে গিয়েছে তাঁর বিনা যুদ্ধে মন্দিরের ধনসম্পদ হারানোর গল্পটি।

More Articles

;