সাহেবের আবদার মেটাতেই কলকাতায় আবির্ভাব ঘটেছিল রোলের

বছরের পর বছর ধরে বাঙালির রসনায় জায়গা করে নিয়েছে ভিন্ন স্বাদের কাঠি রোল। হরেক রকমের রোল পাওয়া যায় এই তিলোত্তমায়।

কলকাতার ভোজনরসিকদের সঙ্গে রোলের এক প্রেমের সম্পর্ক আছে। বিকেলে খাবার টেবিলে বা কোথাও ঘুরতে গিয়ে ফেরার সময় কম-বেশি সকলেই রোল খেতে পছন্দ করেন। কম খরচে মুখরোচক খাবার রোল। কলকাতাকে এমনিতেই ‘সিটি অফ জয়’ বলা হয়ে থাকে, সেই সঙ্গে মুখরোচক খাবারের শহর বললেও খুব একটা ভুল বলা হয় না। আবার গোটা দেশের মধ্যে সেরা রোলের ঠিকানা সেই কলকাতা। ছোট থেকে কলকাতায় বড় হওয়ার সুবাদে এই রোলের স্বাদ আমাদের অজানা নয়। ছোটবেলায় পুজোর সময় কিংবা অন্য কোথাও বেড়াতে গেলে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফেরার সময় দামি রেস্টুরেন্টের খাবারের বদলে হাতে থাকত একটি রোল। এই রোল মধ্যবিত্ত বাঙালির জনপ্রিয় খাদ্য। বিশ শতকের গোড়া থেকেই বাঙালি তাকে বরণ করে নিয়েছে। কিন্তু তখন কি আর কেউ জানত যে, কলকাতার এই রোল স্থানবিশেষে, তাও সুদূর মেক্সিকোয় ‘Burrito’ নামে পরিচিত। মানে মোদ্দাকথায়, তারা লতায়-পাতায় সম্পর্কে জড়িয়ে আছে। কিন্তু এই রোলের কনসেপ্ট কীভাবে এল জানেন কি? আর এই রোলের ধারণাই বা কে দিয়েছিলেন?

রোলের ইতিহাস বা বলতে গেলে কাঠি রোলের ইতিহাস জানতে হলে যেতে হবে ১৯০০ সালের ওদিকে। আর এটা জেনে অবাক হবেন, এই কলকাতার রোলের সঙ্গে ব্রিটিশদেরও এক যোগ ছিল। নিজাম দোকানের তৎকালীন মালিক রেজা হাসান একটি তাওয়া আর কিছু বিফ নিয়ে বসতেন কলকাতার রাস্তায়। আর সেই বিফ খেতে ভিড় করতেন অনেক ইংরেজ সাহেব। বিদেশ-বিভুঁইতে থেকেও যদি দেশের স্বাদ পাওয়া যায় সেই সুযোগ কি কেউ হাতছাড়া করে! তাই ইংরেজ সাহেব এবং তাঁদের আধিকারিকরা হাসানের দোকানের সামনে আসতে লাগলেন। আর আধিকারিকরা অনেক সময় তাঁদের ঊর্ধ্বতন অফিসারকে খুশি করতে হাসানের কাবাব ভেট হিসেবে পাঠাতেন।

একদিন হাসানের দোকানে এক ইংরেজ সাহেব এবং তার আধিকারিক এসে উপস্থিত হন। কিন্তু আধিকারিক একটু সমস্যায় পড়েছেন, কারণ তাঁর সঙ্গে আসা অফিসার ভীষণ খুঁতখুঁতে, কোনও জিনিসই তাঁর নাকি মনমতো হয় না। আধিকারিক খাবারের অর্ডার করতেই ইংরেজ অফিসার বলে বসলেন, তিনি কাবাব খাবেন, কিন্তু তাঁর হাতে যেন কাবাবের তেল না লাগে। এবার সেই আধিকারিক হাসানকে একথা জানালে তিনি পড়লেন মহা বিপদে। কাবাব খাবে কিন্তু হাতে তেল লাগবে না- এ কীভাবে হয়? তিনি বাড়িতে গিয়ে তাঁর স্ত্রীকে সব কথা জানালে হাসানের স্ত্রী একটি বুদ্ধি বের করলেন। স্ত্রীর কথামতো হাসান একটি ময়দার লেচি বানিয়ে বেলে তেলে হালকা ভেজে নিয়ে তার মধ্যে তুলতুলে বিফ কাবাব ভরে দিলেন। আর পরোটার বাইরের তেল যাতে হাতে না লাগে, সেই জন্য একটা কাগজে মুড়ে সাহেবকে দিলেন। সাহেবও খুশ, আর এইভাবেই রেজা হাসানের হাত ধরে কলকাতার প্রথম রোলের আবির্ভাব হলো।

আরও পড়ুন: মৃত প্রেমিকার স্মৃতিতে খাবারের নাম, মোগলাই খানার যে ইতিহাস চমকে দেবে

আবার অনেকের মধ্যে এই সাহেবের ব্যাপারটা নিয়ে অন্য মত আছে, সে যাই হোক, রেজা হাসানই যে রোলের জন্মদাতা, তা বলাই বাহুল্য। এবার রোলের কথা জানা হলো, কিন্তু কাঠি রোল কীভাবে এল? ব্যাপারটা আর কিছুই নয়। আসলে যখন রোলের চলন শুরু হয়, তখন একটি লোহার শিকের মধ্যে মাংস দিয়ে তাকে পোড়ানোর ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিকের পরিবর্তে বাঁশের কাঠির প্রচলন শুরু হয়। সেই থেকেই নাম কাঠি রোল। রোলের রহস্য জানলেই তো হবে না, কোথায় কোথায় ভালো মানের রোল পাওয়া যায়, তার হালহকিকত তো জানতে হবে, না কি?

নিজাম'স
নিজাম দিয়েই শুরু করা যাক। ২০২২ সালে দাঁড়িয়ে আজও নিজামে সেই পুরনো স্টাইলেই রোল বানানো হয়। রোলের পরোটাকে এখানে দু'ভাগে ভাগ করা হয়– ১. পাতলা পরোটা, যা কিনা বেশি ভারী হয় না, এবং যেখানে পরোটার স্বাদ নয়, মাংসের স্বাদ প্রাধান্য পায় বেশি। আর তার সঙ্গে একটু ঝিরিঝিরি করে কাটা পেঁয়াজ, লঙ্কাকুচি ছড়িয়ে তার ওপর একটু লেবুর রস– এই রোল তৈরি হয়ে যখন আপনার হাতে আসে, আর হাত থেকে যখন মুখে প্রবেশ করে- সে যেন এক আলাদা শান্তি। ২. লাচ্ছা পরোটা- এই পরোটা একটু মোটা হয় তুলনায়, তাই বলে একে অবজ্ঞা করবেন না যেন। আজকাল তারও ভীষণ নামডাক হয়েছে। এখানে মাংসের সঙ্গে হালকা গোলাপ জলের ব্যবহার করা হয়। নিজামে কিন্তু প্রথম ধরনের পরোটার রোলই পাওয়া যায়। আবার অন্য জায়গায় যেমন তাওয়ায় ভেজে মাংস বা কাবাব তৈরি হয়, এখানে কিন্তু তা নয়। নিজামে একটি ঘরে কাঠকয়লার আগুনে পুড়িয়ে কাবাব তৈরি হয়। আর সস দেওয়া হয় না, এতে শুধু থাকে পেঁয়াজ আর লেবুর রস। নিজেদের উন্নতমানের খাবারের সঙ্গে আপস করতে তারা নারাজ।

ইউপি বিহার
আবার অন্যদিকে এখন শুধু চিকেন, মাটন বা এগ রোলের সঙ্গে সঙ্গে বিফ রোলের প্রচলনও বেড়েছে। তাই বিফ রোল খেতে চাইলে যেতে হবে ইউপি বিহার রেস্তোরাঁতে। এদের কারবার বিফ নিয়েই। খিরি কাবাব, ভুনা কাবাবের জন্য এদের নামডাক। এরা আবার লাচ্ছা পরোটা-সহযোগে রোল বানান। দামেও অল্প আর স্বাদে নিরাশ হবেন না।

বাদশা
এরপরের গন্তব্য নিউ মার্কেটের ওদিকে। নাহুমস ছাড়িয়ে চৌরঙ্গির দিকে একটু হেঁটে শ্রীলেদার্স-এর পাশেই আছে বাদশা। এখানকার বিখ্যাত রোল হলো চিকেন রেশমি কাবাব রোল। বিশ্বাস করুন, এই রোল খেয়ে ঠকবেন না। এই রোলের বিশেষত্ব হলো, না পাতলা, না মোটা পরোটার মাঝখানে কয়েক টুকরো রেশমি কাবাব আর তার ওপর পেঁয়াজ, লঙ্কা আর হালকা গোলমরিচ ছড়ানো। দামও সাধ্যের মধ্যে, আর এত বছর বাদেও স্বাদে কোনও পরিবর্তন নেই। সেই প্রথম দিনের মতোই টেস্টি!

কুসুম রোলস
এবার হেঁটে চলে যান পার্ক স্ট্রিটের কুসুম রোলস-এ। বাঙালির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মাটন, চিকেন বাদ দিয়ে তাদের রোলের বিশেষত্ব হলো, মেটে দিয়ে তৈরি রোল। আবার তাতে চিজও দেওয়া। বিগত দুই দশক ধরে তারা কলকাতাবাসীর মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। তাদের অভিনবত্বই তাদের এগিয়ে রেখেছে।

বেদুইন
এরপর যেতে পারেন গোলপার্কের কাছে বেদুইন-এ। এদের অভিনবত্ব মাছের রোল বানিয়ে। মাছের কাবাব দিয়ে তৈরি হয় এই রোল। মাছে-ভাতে বাঙালি তাই চেখে দেখতে পারেন।

স্মোকচিনো
এখানেই হাঁপিয়ে গেলে হবে না। চলে আসুন রাসবিহারীর স্মোকচিনো-তে। এই দোকানে ডায়েট রোল বিক্রি করা হয়। অর্থাৎ, এই রোল তেলবিহীন, কিন্তু জিভে জল আনবেই। কম দামে স্বাস্থ্যকর রোল।

এইভাবেই বছরের পর বছর ধরে বাঙালির রসনায় জায়গা করে নিয়েছে ভিন্ন স্বাদের কাঠি রোল। আরও হরেক রকমের রোল পাওয়া যায় এই তিলোত্তমায়। বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ছাড়াও কলকাতা শহরের অলিগলিতে এখন অনেক গজিয়ে ওঠা দোকান পাওয়া যায়, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রোল পাওয়া যায়। স্বাদে কেমন হয় সেগুলো, তা আপনারাই না হয় বিচার করবেন। পুজো আসতে তো বেশি দেরি নেই, তাই রাতে প্যান্ডেল হপিংয়ে বেরলে এই রোল সেন্টারগুলোই আপনার রসনার ঠিকানা হয়ে উঠুক।

 

 

More Articles

;