বন্ধু নাকি শত্রু, কেমন ছিল সন্ধ্যা-লতা জুটির সম্পর্ক?

বাঙালির মনে চিরকাল অমলিন থাকবেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ।আধুনিক বাংলা গানের মাধ্যমে শ্রোতাদের মন জয় করলেও অনায়াসেই গাইতে পারতেন সব ধরনের গান। তাই কর্মজীবনে ভারতের একাধিক বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ও সুরকারদের সঙ্গে বারবার কাজ করেছেন গীতশ্রী। বাংলা সিনেমার পাশাপাশি গান গেয়েছিলেন হিন্দি ছবিতেও। সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গেও তাঁর বন্ধুত্বও ছিল যথেষ্ট চর্চার বিষয়।

১৯৫০ সালে বাংলা থেকে মুম্বাই পাড়ি দেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। তবে সে যাওয়া নিয়েও প্রথমে একেবারেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেননি তিনি। ১৯৪৮ সালে মুম্বই যাওয়ার জন্য ডেকে পাঠান শচীন দেববর্মন। অবশেষে দু'বছর পরে দাদা ও দিদির সাথে মুম্বই যান সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। তবে খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি মুম্বইবাস। মাত্র সতেরোটি হিন্দি ছবিতে গান গেয়েই কলকাতা ফিরে আসেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। ‘সাজা,’ ও 'এক দো তিনের’ মত ছবিতে গান গেয়েছেন তিনি।

শচীন দেব বর্মনের ডাকে মুম্বই গেলেও প্রথম গান কিন্তু গাওয়া হয়নি তাঁর সুরে। প্রথম প্লেব্যাক গেয়েছিলেন অনিল বিশ্বাসের সুরে ১৯৫১ সালে। 'তারানা' ছবির সেই গানে সাথে ছিলেন লতা মঙ্গেশকরও। লতার সঙ্গে ডুয়েট গেয়েছেন- 'তু বোল পাপিহে বোল' গানটিও। সঙ্গীত জগতের দুই নক্ষত্র লতা ও সন্ধ্যার বন্ধুত্ব গাঢ় হতে শুরু করে তারানা ছবির গানের রেকর্ডিং থেকেই। তবে সমবয়সী দুই শিল্পীর বন্ধুত্ব নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকেই বলেন, তাঁরা দুজন আদতে একে ওপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। সন্ধ্যার আচমকা কলকাতা ফেরত আসার পিছনেও নাকি লতাই  প্রধান কারণ। তিনি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন বলেও শোনা যায়। তবে গীতশ্রী বরাবর বলেছেন তাঁদের দুজনের মধ্যে যথেষ্ট সুসম্পর্ক রয়েছে। কলকাতা ফেরার পরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ঢাকুরিয়ার বাড়িতে দেখাও করে গেছেন লতা। গুজব শুনে একদিন হাসির ছলে লতা নাকি সরাসরি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,' তোমাকে আমি হিংসে করব কেন?' উত্তরে হেসে উঠেছিলেন সন্ধ্যা।

আরও পড়ুন-সন্ধ্যার পর যেন নিকষ কালো রাত্রি– বাপ্পি লাহিড়িও চললেন, রইল পড়ে অতলান্ত কীর্তি…

শুধু তাই নয় মুম্বইয়ে থাকাকালীন বাঙালি খাবারের স্বাদ পেতে একাধিকবার তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন লতা।মুম্বাইয়ে মায়ের সাথে থাকেতেন সন্ধ্যা। তাঁর মায়ের হাতের রান্না খেতেই তাঁর বাড়ি যেতেন মারাঠি সুর সম্রাজ্ঞী। একইভাবে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ও মারাঠি খাবারের টানে পৌঁছে গিয়েছেন বন্ধু লতার বাড়িতে। গানের মাধ্যমে দুই তারকার মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠলেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁরা দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনেও কথা বলতেন। ভাগ করে নিতেন দুজনের সুখ দুঃখের গল্পও। দু'জনেই মুগ্ধ ছিলেন তাঁদের কাজের প্রতি কিন্তু তাঁদের কাজের ক্ষেত্রে নিজস্বতাও বজায় রেখেছিলেন দুই শিল্পী।

তাঁদের সম্পর্কের রসায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও দুজনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক যে তাতে বিন্দুমাত্র নষ্ট হয়নি তা একাধিকবার বলেছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। বাস্তবে লতা- সন্ধ্যা খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। কলকাতা ফেরত আসা নিয়ে গীতশ্রী একটি সাক্ষাৎকারে নিজেই স্বীকার করেছেন হিন্দি গান গেয়ে মানসিক তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না সেজন্যই ফিরে আসেন বাংলায়।নিজের আত্মজীবনীতেও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন । তাঁর কথায়,‘ লতা নাকি আমার বিরুদ্ধে পলিটিক্স করেছে? একথা একেবারেই মিথ্যা'।  

শেষদিনে দু'জনে মিলিয়েও গেলেন খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে। হিন্দি ও বাংলা সঙ্গীত জগতের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো গীতশ্রীর মৃত্যুতে।

More Articles

;