চাকরি হোক বা আড্ডা, একটানা বসে থাকা মানেই মৃত্যুকে ডেকে আনা
Sitting Disorder: সারা বিশ্বে প্রতি বছর যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার ৪ শতাংশ মৃত্যু হয় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে।

তারুণ্য ধরে রাখার ইচ্ছেটা সবার। বার্ধক্য কেউই চায় না। তবে চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ পড়বে, এটাই বোধহয় স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কেননা এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তবে অনেকে অকালে বুড়িয়ে যায়। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপনের চালচিত্রের ওপর মূলত নির্ভর করে, বার্ধক্য ঠিক কত তাড়াতাড়ি হানা দেবে শরীরে। খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম, কাজের চাপ, মানসিক অস্থিরতা— সবই অকালে বার্ধক্যকে ডেকে আনে। ত্বকে বলিরেখা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া, পেশির ক্ষয়, নিস্তেজ ত্বক এবং ক্লান্তি বার্ধক্যের পূর্বলক্ষণ। এই লক্ষণগুলি দেখা দিচ্ছে মানেই শঙ্কিত হয়ে পড়ার কোনও কারণ নেই। কারণ আগে হোক বা পরে, বার্ধক্য অনিবার্য। তবে অকাল বার্ধক্য একেবারেই প্রত্যাশিত নয়। দৈনন্দিন জীবনে অজান্তেই এমন কয়েকটি ভুল অনেকে করে ফেলেন, যার ফলস্বরূপ সময়ের আগেই বয়সের ছাপ পড়ে যায় শরীরে।
অকালবার্ধক্য কী?
বয়স বাড়ার সঙ্গে বৃদ্ধ হওয়া স্বাভাবিক, তবে কখনও কখনও আমরা আমাদের বয়সের আগেই বুড়িয়ে যেতে শুরু করি। অনেকগুলি অঙ্গভঙ্গি, যেমন মুখের চামড়া কুঁচকে যাওয়া, তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হওয়া, হাতে ভারী ব্যাগ তুলতে ব্যথার অনুভূতি হওয়া, চুল সাদা হয়ে যাওয়া। এর সাধারণ কারণগুলি হলো, অনেক এনজাইম এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও দেহে নতুন কোশ এবং টিস্যু গঠনের হার হ্রাস পাওয়া। তবে কখনও কখনও যখন এই লক্ষণগুলি সময়ের আগে তাদের প্রভাব দেখাতে শুরু করে, তখন একে অকালবার্ধক্য বলা হয়। এটি প্রায়শই ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে সাধারণত ঘটে থাকে। কিন্তু শুধু হরমোনের প্রভাব, খাওয়াদাওয়া বা অতিরিক্ত চিন্তার ফলেই যে অকালবার্ধক্য আসে, তা কিন্তু নয়। আমাদের আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে অকালবার্ধক্যর আরেকটা প্রধান কারণ, একটানা বসে থাকা বা বসে বসে কাজ করা।
প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে আজকাল বেশিরভাগ কাজ করা যায় কম্পিউটারের মাধ্যমে। ফলে, কায়িক পরিশ্রম কমে গিয়েছে, বেড়েছে মাথা খাটানোর কাজ। আজকাল বেশিরভাগ অফিসেই টানা বসে কম্পিউটার বা ল্যাপটপে কাজ করতে হয়। দেখা গেছে, দিনের মধ্যে দীর্ঘ ৮-১১ ঘণ্টা আমাদের চেয়ারে বসে কাজ করার দরুন বিভিন্ন রকমের শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। কুড়ি বছর বয়সে যদি আপনার চামড়া কুঁচকে যেতে থাকে, ত্বকে বলিরেখা দেখা যায়, তাহলে কেমন লাগবে? গবেষণায় দেখা গেছে, টানা বসে কাজ করার ফলে মহিলাদের থেকে পুরুষদের মধ্যেই বেশি শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।
আমাদের মধ্যে অনেকেরই বসে থাকার চাকরি। অনেকেরই আবার অবসর কাটে বসে বসেই। আড্ডাও হয় বসেই। কিন্তু বেশিক্ষণ বসার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিপদ। সাম্প্রতিক গবেষণায় দাবি, ৩ ঘণ্টার বেশি টানা বসে থাকলে ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক বা ক্যানসারের সম্ভাবনা বেড়ে যায় বহুগুণ। এমনকী, মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে। চাকরি হোক বা অবসর, আড্ডা হোক বা কাজ, টানা বসে থেকেছেন কি মরেছেন! দেখা গেছে, সারা বিশ্বে প্রতি বছর যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার ৪ শতাংশ মৃত্যু হয় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে। সংখ্যাটা ৪ লক্ষ ৩৩ হাজার। ৩ ঘণ্টার বেশি টানা বসে থাকলে মৃত্যুকে সাদরে ডেকে আনছেন আপনার জীবনে।
স্পেনের সান জর্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই মারাত্মক তথ্য। গবেষকরা বলছেন, খুব কম বিরতিতে একভাবে বসে কাজ করলে বা টিভি দেখলে টাইপ-টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায় ৯০ শতাংশ। বেশি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ। ৫৪ শতাংশ ফুসফুস ক্যানসার, ৬৬ শতাংশ জরায়ু ক্যানসার ও কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। একটানা বসে থাকলে শরীরের নয়টি অঙ্গ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়- মাথা, হাত, পা, পায়ের পাতা, ঘাড়, পিঠ, ফুসফুস, পাকস্থলী এবং হার্ট।
একটানা বসে থাকায় কী কী সমস্যা দেখা দেয়
১. দীর্ঘ সময় ধরে অফিসের টেবিলে বসে থাকার কারণে শরীরে চর্বি জমতে পারে। একটি সমীক্ষা বলছে যে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকে এবং যারা অফিসে টেবিলে কাজ করে থাকে, তারাই খুব দ্রুত পেটের চর্বি বাড়ার শিকার করে। এর কারণ, বসে থাকার সময় শারীরিক বিপাক ক্রিয়া ধীর হয়ে ক্যালোরি বার্ন কমে যায় এবং বেশিক্ষণ বসে থাকলে আপনার কোমরের চারপাশে চর্বি জমা সহজ হয়ে ওঠে।
২. অতিরিক্ত সময় একটানা বসে থাকার কারণে আপনার দেহের কোনও শারীরিক পরিশ্রম হয় না। এতে করে আপনার দেহের সঠিক কার্যকলাপ ব্যাহত হয়। এর ফলে খুব তাড়াতাড়ি আপনার দেহ বুড়িয়ে যায়।
৩. একটানা বসে থাকার ফলে দেহের নিচের অংশের স্বাভাবিক কার্যকলাপ একেবারেই হয় না। সেই সঙ্গে আমাদের পরিপাকতন্ত্রের ওপর পড়ে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব। স্বাভাবিক খাদ্য-হজম প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হয়। এর ফলে হজমে সমস্যার কারণে দেহে নানা ধরনের সমস্যা হওয়া শুরু করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
WhatsApp Down: ফেসবুক এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো সার্ভিস অনেক বেশি মানুষ অনেক দীর্ঘ সময়ের জন্য একটানা ব্যবহার করেন। এর ফলে সমস্যার সম্ভাবনা বাড়ে।
৪. মেরুদণ্ডের ওপর অনেক বেশি চাপ পড়ে, যখন আপনি অনেক বেশি সময় একটানা বসে থাকেন। মেরুদণ্ডের জয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্থ হয় অনেক বেশি।
৫. একটানা বসে থাকার ফলে শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেরও সমস্যা দেখা দেয়। যারা একটানা বসে কাজ করতে থাকে, তাদের নানা ধরনের মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, যেমন, হ্যালুসিনেশন, চিন্তা-ক্ষমতা লোপ পাওয়া, বুদ্ধি কমে যাওয়া ইত্যাদি।
৬. গবেষণায় দেখা যায়, যারা একটানা বসে থাকে এবং শারীরিক পরিশ্রম একেবারেই করে না- তাদের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি হার্টের সমস্যা, উচ্চ-রক্তচাপ, ডায়বেটিস এবং ক্যানসারের মতো রোগ দেখা দেয়।
প্রতিকার
বেশিক্ষণ বসে থাকা আমাদের শরীরকে বুড়িয়ে দেয়। আমরা যখন এক জায়গায় অনেকক্ষণ বসে থাকি, তখন তা আমাদের শরীরের ওপর খুব খারাপ প্রভাব ফেলে। মায়োক্লিনিকের করা গবেষণায় দেখা গেছে, কেউ যদি এক জায়গায় ৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বসে কাজ করে, তাও কোনও শারীরিক কার্যকলাপ ছাড়া, তাহলে তা ধূমপান এবং স্থূলতার মতোই বিপজ্জনক। তবে পরিত্রাণেরও উপায় রয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ:
অফিসে একটানা বসে কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আধঘণ্টা কাজের পর দু'-মিনিট হাঁটা জরুরি। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করলেও ভালো। প্রয়োজনে কম্পিউটারেও দাঁড়িয়ে কাজ করা যেতে পারে। অফিসে লাঞ্চ সারা যেতে পারে দাঁড়িয়ে।
বসে বসেই সহজ কিছু ব্যায়াম করে নিলে উপকার। মোবাইলে কথা বলার সময় হেঁটে কথা বলতে পারলে ভালো। সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের চেয়ারে বসে না থেকে একটু উঠে গিয়ে তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে কথা বলার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। আইটি সেক্টর থেকে ব্যাঙ্ক, মিডিয়ার মতো বহু ক্ষেত্রে একটানা বসে কাজ করাটাই দস্তুর। কিন্তু কিছুটা বদলে নিতেই হবে সেই অভ্যেস।
কাজ করার সময় কাঁধ যেন আরামে থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। প্রতি আধঘণ্টা পর গলা ঘুরিয়ে, হাত মাথার ওপর দিয়ে এবং পাশে ঘুরিয়ে ব্যায়াম করে নিতে হবে।
সকালে বা রাতে খাবার পর হাঁটাহাঁটি করলে শরীরের বার্ধক্য অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। তাছাড়া লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করলে তাও শরীরের জন্য উপকারী।
এই সমস্তকিছু ছাড়াও রোজ নিয়ম করে কয়েকটি সহজ যোগব্যায়াম করতে পারেন। তাতে আপনার অমূল্য সময়ের মধ্যে থেকে ১০ মিনিট মতো লাগবে। এতে আপনি সুরাহাও পাবেন এবং ত্বকে তারুণ্যের ছাপও আসবে।
সিদ্ধাসন: এটি বেশ সহজ আসন। পা ভাঁজ করে বসতে হবে। হাত থাকবে হাঁটুর ওপর। বুড়ো আঙুল ঊরুর ভিতরে থাকবে। শিরদাঁড়া সোজা এবং স্থির। চোখ বন্ধ করে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় থাকবে।
উপকারিতা- হাঁটু ও পায়ের পেশি ফ্লেক্সিবল হবে।
মুন পোজ: ডেস্ক বা চেয়ারে বসেই বুকভরে শ্বাস নিন। তারপর হাত ওপরের দিকে তুলুন। তারপর ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। প্রতিবার শ্বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিরদাঁড়া আরও একটু বেশি টান করুন।

মুন পোজ
উপকারিতা- এই আসনে ঝুঁকে বসা বা দাঁড়ানোর অভ্যাস কমবে সঙ্গে কোমর ও পিঠের ব্যথা কমে যাবে।

ওয়াইড লেগ ফরওয়ার্ড বেন্ড
ওয়াইড লেগ ফরওয়ার্ড বেন্ড: দুই পা যতটা সম্ভব দুই দিকে ছড়িয়ে দাঁড়ান। হিপে হাত রাখুন। তারপর ধীরে ধীরে একদিকের পা ভাঁজ করুন। তারপর মাটিতে হাত রাখুন। পুরো শরীর যেন টান থাকে।
উপকারিতা- এতে কোমর, হাঁটু, কাঁধে বেশ আরাম পাবেন।







