ভারতে ক্রিপ্টোকারেন্সির ভবিষ্যৎ কী? বিটকয়েন নিয়ে কি ভাবনা কেন্দ্রীয় সরকারের?

একটা সময় ছিল যখন ভারতবাসী শুধু মাত্র হাতে টাকা পয়সা দিয়েই সমস্ত লেনদেন করতে অভ্যস্ত ছিল। সারা দুনিয়ায় যখন ইউপিআই, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডিজিটাল মানিট্রান্সফার জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করেছে সেই যুগেও ভারতবাসী শুধু মাত্র নোটের উপর বেশি ভরসা করত। কিন্তু তারপরে ভারতবর্ষে একটি ডিজিটাল বিপ্লব এসে হাজির হলো। আর তাকে ইন্ধন যোগানোর কাজে এগিয়ে এলো সারাদেশব্যাপী লকডাউন। লকডাউনে তো আর বাজার যাওয়া যাচ্ছে না, তাই অগত্যা ভারতবাসী ব্যবহার করতে শুরু করলো বিভিন্ন ডিজিটাল অ্যাপ্লিকেশনগুলিকে। জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলো গুগল পে, ফোন পে, অ্যামাজন পে এর মত তামাম অ্যাপ্লিকেশন, যেগুলি এককালে রীতিমতো ধুকছিল।

শুধু কি ইউপিআই অ্যাপ্লিকেশন, একই সাথে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছিল ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডিজিটাল মানিট্রান্সফার থেকে শুরু করে এটিএম কার্ডের ব্যবহার, সব কিছুই জনপ্রিয়তা পেয়েছে বিগত দেড় বছরের মধ্যে। কিন্তু তার সাথে সাথেই আরো একটি ধরনের মুদ্রা, বলতে গেলে ডিজিটাল কারেন্সি ভারতে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে মূলত যুব সমাজের কাছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি, বর্তমানে ভারতের বহু মানুষ এই ক্রিপ্টোকারেন্সি এর মাধ্যমে রোজগার করার চেষ্টা করে চলেছেন। ইথেরিয়াম, মনেরো, স্টেলার কিংবা ডজকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি পৃথিবীতে তথা ভারতে প্রচলিত থাকলেও সবথেকে বেশি যেটা জনপ্রিয় সেটা হল বিটকয়েন। কিছুদিন আগেও দেশবাসী এই ক্রিপ্টোকারেন্সি জিনিসটির সঙ্গে খুব একটা পরিচিত ছিল না।

কিন্তু সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সবকিছুই পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। লেনদেনের রকমসকম, কেনাকাটার পরিধি, টাকা-পয়সার ট্রানস্ফার যেরকমভাবে আরম্ভ হয়েছে, সেই তালে তাল মিলিয়েই ভারতে প্রবেশ করেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। এই ভার্চুয়াল কারেন্সি বিশ্বের মার্কেটে অনেকদিন আগেই প্রবেশ করে গেলেও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ভারতীয় মার্কেট খুব একটা তাল মিলিয়ে চলে না কোনদিন। তাই ভারতে এই ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রবেশ করতে কিছুটা সময় নিয়েছে। তবে এখন আর ভারত পিছিয়ে নেই। ধীরে ধীরে এখানেও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন শুরু হয়ে গিয়েছে।

তরুণদের একটা বড় অংশ এই ক্রিপ্টোকারেন্সি দিকে ঝুঁকেছে। আদতে এই ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো বড় একটি ধরনের উপার্জনের রাস্তা। কিন্তু উপার্জন হলেও, সরকার এই ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে এতদিন তেমন একটা মাথা ঘামাইনি। তবে এবারে সময় এসেছে, ভার্চুয়াল কারেন্সি নিয়ে এবারে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চলেছে ভারত সরকার। সংসদের চলতি শীতকালীন অধিবেশনে এই ডিজিটাল কারেন্সি নিয়ে একটি বিল পেশ হওয়ার কথা। তবে, সূত্রের খবর বর্তমানে ভারত সরকার এই বিলের মধ্যে আরও বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। তাই হয়তো এই অধিবেশনে না হলেও সংসদের আগামী অধিবেশনে পাস হয়ে যাবে ডিজিটাল কারেন্সি বিল। 

তবে তার আগেই জানিয়ে রাখা ভাল, বিশেষ সতর্কবার্তায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ডিজিটাল কারেন্সি ওরফে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। এতদিন পর্যন্ত ভারত সরকারের তরফ থেকে এই ক্রিপ্টোকারেন্সির গুরুত্ব খুব একটা ভেবে দেখা হয়নি। তবে ডিজিটাল কারেন্সি গুরুত্ব অবশেষে স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তবে তার সাথে সাথেই ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে কিছু সতর্কবার্তাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নিজের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, যদি সঠিকভাবে এই ডিজিটাল কারেন্সি ব্যবহার না হয়, তাহলে তার ফল বিপদজনক হতে পারে। ডিজিটাল কারেন্সি যেন কোন ভুল হাতে না পড়ে, কিংবা এর যেন অপব্যবহার না হয়। 

প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণের পর এটা স্পষ্ট যে, ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে নতুন নির্দেশিকা জারি করার পথে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে ভারত সরকার। সম্ভাবনা রয়েছে আগামী অধিবেশনে ভারতে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন এবং ডিজিটাল কারেন্সির উপরে সরকারি আইন লাগু করে এই লেনদেনকে একটা নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেলবে ভারত সরকার। সেই লক্ষ্যেই সংসদের আগামী অধিবেশনে পাস হতে চলেছে একটি বিশেষ বিল, যার নাম দেওয়া হয়েছে, 'ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যান্ড রেগুলেশন অফ অফিশিয়াল ডিজিটাল কারেন্সি বিল'। এই বিল পেশ হলে, বেসরকারি সংস্থার ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। 

শুধু তাই নয়, ক্রিপ্টোকারেন্সির উপরে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। সেবি বা এধরনের সংস্থার মাধ্যমে যাতে ভারতবাসীর কাছে ডিজিটাল কারেন্সি নিয়ে কোনো সমস্যা না হয়, তার দিকে অবশ্যই লক্ষ্য থাকবে ভারত সরকারের। কিন্তু ডিজিটাল কারেন্সি নিয়ে কখনোই খুব একটা সহজ রাস্তা তৈরি করে দেবে না ভারত সরকার। সম্ভাবনা রয়েছে, ভারত সরকারের তরফে সারা দেশের জন্য অফিশিয়াল কোন একটি ডিজিটাল কারেন্সি চালু করতে পারে আর বি আই। যদি সাধারন কারেন্সির মত ডিজিটাল কারেন্সিও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া নিয়ে আসে, তাহলে প্রাইভেট সংস্থার ক্ষেত্রে ভারতে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন করা বেশ কঠিন হয়ে যাবে। ভারতে এমনিতেও এমনিতেও ভারত সরকারের বিটকয়েনের সঙ্গে সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। এর আগেও এই বিটকয়েন নামক ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে সারাদেশে।

বর্তমানে যেহেতু ভারতে এই ক্রিপ্টোকারেন্সি জিনিসটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তাই দুনিয়ার সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য ভারত সরকার এটিকে অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ভারতবাসীর সুরক্ষার কথা বিচার করে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের উপরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা, কিংবা কোনো একটি অফিশিয়াল ডিজিটাল কারেন্সি চালু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার, এমনটাই মত অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। তবে, যদি ভারতে প্রাইভেট সংস্থার ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার বন্ধ করে দিয়ে যদি অফিশিয়াল ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু করা হয় তাহলে যারা এই ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে উপার্জনের রাস্তা খুঁজে নিয়েছিলেন তাদের পক্ষে সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে হয়তো তাদের ক্রিপ্টোকারেন্সি ছেড়ে আবারো শেয়ার মার্কেটের দিকে ঢুকতে হবে। তবে এই সমস্তই পরের কথা। সবার আগে, সংসদে পাস হতে হবে এই ক্রিপ্টোকারেন্সি বিলটিকে, যার উপর নির্ভর করবে ভারতের ক্রিপ্টোকারেন্সির ভবিষ্যৎ।

More Articles

;