ভুলেও এর জল ছুঁয়ে দেখেন না কেউ, ভারতের অভিশপ্ত এই নদীর পেছনে রয়েছে কোন রহস্য?
Cursed River of India : একে ছুঁলেই নাকি পণ্ড হবে সমস্ত কাজ। শুধু লোককথা নয়, পুরাণেও রয়েছে ভারতের ‘অপবিত্র’ এই নদীর আখ্যান।

ছোট থেকে ভূগোল বইয়ে একটা কথা বারবার পড়েছি আমরা সবাই। ভারত হল নদীমাতৃক দেশ। এই দেশের বুক চিরে অজস্র নদী বয়ে গিয়েছে। আর তাদের তীরেই গড়ে উঠেছে একের পর এক নগর, পরগনা। ভারতের মতো দেশে নদীর গুরুত্ব যে কতখানি, তা বলে বোঝাতে হবে না। সেচ, খাল, চাষ থেকে আরম্ভ করে যাবতীয় কাজে সেই আদিমকাল থেকে নদীই আমাদের একমাত্র ভরসা। সেইসঙ্গে রয়েছে গঙ্গা নদী। ভারতের পবিত্রতম নদীর তীরে একের পর এক প্রধান শহর, গ্রাম, মহল্লা তৈরি হয়েছে। উপনদী, শাখানদী সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে গাঙ্গেয় উপত্যকার এক বিরাট সাম্রাজ্য।
বিচিত্র দেশ এই ভারত। পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, প্রাচীন শাস্ত্র, পুরাণের গল্প। লুকিয়ে রয়েছে অনেক মিথ, রহস্য। এই যেমন গঙ্গা। ভভিত্র এই নদীকে আগলে জন্ম-মৃত্যু অতিবাহিত হয় আমাদের। কিন্তু এই পবিত্রতম নদীর কাছেই বইছে আরও একটি নদী। স্থানীয়দের মতামত, এই নদীর স্রোত নাকি অভিশপ্ত! একে ছুঁলেই নাকি পণ্ড হবে সমস্ত কাজ। শুধু লোককথা নয়, পুরাণেও রয়েছে ভারতের ‘অপবিত্র’ এই নদীর আখ্যান।
উত্তরপ্রদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এই নদী। নাম কর্মনাশা নদী। বলা হয়ে, নামেই অনেকসময় পরিচয় সামনে আসে। এখানে সেই কথাটি সম্পূর্ণভাবে ফলে গিয়েছে। কর্ম এবং নাশা – এই শব্দদুটি এই নদীর সঙ্গে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছে। বিহারের কাইমুর থেকে নদীটির উৎপত্তি হয়েছে। পরে উত্তরপ্রদেশ হয়ে গঙ্গার সঙ্গে এসে মিশেছে। এক কথায়, গঙ্গার অসংখ্য উপনদীর মধ্যে অন্যতম হল এটি। কিন্তু ভারত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য নদীর মতো ব্যবহার পায় না এটি। এখানকার জল কোনও মানুষ ব্যবহার করেন না। এমনকী, কেউ স্পর্শ পর্যন্ত করেন না! আজ থেকে নয়, কয়েকশো বছর ধরে এমনই প্রথা চলে আসছে এখানে। কিন্তু এরকমভাবে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে কেন এই নদীকে? কোনও খারাপ দ্রব্য মিশে আছে এখানে?
সেরকম কিছু জানা যায়নি। তবে কর্মনাশা নদীর এমন দশার পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু মিথ, কিছু পৌরাণিক আখ্যান। সেই আখ্যান অনুযায়ী, এই নদী আদতে অভিশপ্ত। তাই এই নদীর জল ছুঁলেই নেমে আসবে ঘোর বিপদ। কিন্তু কী রয়েছে এমন মিথের পেছনে? সেই গল্প জানতে হলে ফিরে যেতে হবে রাজা হরিশ্চন্দ্রের সময়। হরিশ্চন্দ্রের বাবা সত্যব্রত ছিলেন ঋষি বশিষ্ঠের শিষ্য। সেইসঙ্গে শৌর্যে বীর্যেও ছিলেন অদ্বিতীয়। তিনি একবার গুরু বশিষ্ঠের কাছে গিয়ে বলেন, তাঁর দেহ যেন স্বর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। এরকম প্রস্তাবে বশিষ্ঠ মুনি রাজি হননি। ব্যস, রাজাও গেলেন ক্ষেপে। তাঁর ইচ্ছে হয়েছে, তিনি যাবেনই। সোজা চলে গেলেন আরেক ঋষি বিশ্বামিত্রের কাছে। এঁর সঙ্গে বশিষ্ঠের সম্পর্ক ছিল সাপে নেউলে। দুজনেই দুজনকে দেখতে পেতেন না। বিশ্বামিত্রের কাছে গিয়ে একই প্রার্থনা করলেন রাজা সত্যব্রত। এখানে তিনি রাজি হলেন।
বিশ্বামিত্রের শক্তিতে রাজা সত্যব্রত তো স্বর্গে চলে গেলেন; কিন্তু এই গোটা ব্যাপারটি দেবরাজ ইন্দ্রের পছন্দ হল না। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে রাজা সত্যব্রতের মাথা ফের পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিলেন। তখন সামনে চলে আসেন ঋষি বিশ্বামিত্র। স্বর্গ আর মর্ত্যের মাঝে তিনি সত্যব্রতের মুণ্ড ঝুলিয়ে রেখে যুদ্ধ শুরু করেন। পুরাণ মতে, রাজা সত্যব্রতের ঝুলে থাকা সেই মুণ্ড থেকে নাগাড়ে লালা ঝরতে থাকে। সেই লালাই নাকি নদী হয়ে বইছে ভারতে। আর তার নামই নাকি কর্মনাশা। অর্থাৎ, এই নদীর জল স্পর্শ করলে বা ব্যবহার করলে মানুষের কাজ পণ্ড হবে, অভিশপ্ত হয়ে যাবে সব। সেজন্য আজও শুভকাজে বা অন্যান্য প্রয়োজনে এই নদীর জল ব্যবহার করা হয় না।















