প্রাপ্য সম্মান দেয়নি সরকার, পেটের জ্বালায় খাবার ডেলিভারির কাজে বাংলার জাতীয় ফুটবলার পৌলমী
Poulami Adhikary Footballer Zomato : গায়ে জাতীয় দলের জার্সি নয়; বরং জোম্যাটোর লোগো দেওয়া লাল জামা। পৌলমী এখন ডেলিভারি গার্ল।

একটা সময় তাঁর পায়ে ঘুরে বেড়াত ফুটবলের জাদুকাঠি। ড্রিবল করতে করতে মেয়েটি স্বপ্ন দেখত, এভাবেই সমস্ত বাধা কাটিয়ে শিখরে পৌঁছবেন। ফুটবলই হবে তাঁর জিয়নকাঠি। ভারতের জাতীয় দলের হয়ে ফুটবলও খেলেছেন বেহালার এই মেয়ে। সেই বেহালা, যে ভারতকে একটা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় দিয়েছে। সেইসঙ্গে দিয়েছে পৌলমী অধিকারীকেও। কিন্তু অচিরেই দুর্দশা নেমে আসে। সেদিনের প্রতিভাময়ী এই ফুটবলার পৌলমী এখন সাইকেল নিয়ে রাস্তাঘাটে ছুটে বেড়ান। গায়ে জাতীয় দলের জার্সি নয়; বরং জোম্যাটোর লোগো দেওয়া লাল জামা। পৌলমী এখন ডেলিভারি গার্ল। মাত্র ২৪ বছর বয়স তাঁর, ফুটবলকে সরিয়ে রাখতে প্রাণ চায় না। কিন্তু ওই যে, পকেট শূন্য…
ছোটবেলাতেই মা-কে হারিয়েছেন পৌলমী। দিনমজুরি করে কোনওরকমে দুটো পয়সা উপার্জন করেন বাবা। মামাবাড়িতে থাকতে থাকতে সেখানেই ফুটবল খেলা শুরু। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেলতেন পৌলমী। উইং ধরে তাঁর দৌড় কাঁপুনি ধরাত প্রতিপক্ষের রক্ষণে। সেভাবেই ফুটবলকে ভালোবাসা, খেলার প্রেমে পড়া। প্রতিভা ছিল শুরু থেকেই, সেইসঙ্গে ছিল পরিশ্রম। কলকাতার একটি ক্লাবে সুযোগও পেয়ে যান। ব্যস, সেখানে ঢুকে নিজেকে আরও ঘষামাজা করতে শুরু করেন পৌলমী। উইং ধরে আক্রমণে নেমে খেলতে পছন্দ করতেন তিনি।
What a shame!! Poulami Adhikari, who has represented Under 16 Indian Football Team at the national level is now earning livelihood as delivery person.
— Aparna (@chhuti_is)
তাঁর প্রতিভা খুব তাড়াতাড়ি নজরে পড়ে যায় ভারতের জাতীয় মহিলা দলের সদস্যাদের। শেষমেশ সেখানেই ডাক পান পৌলমী অধিকারী। অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন তিনি। যুব দলের হয়েও খেলেছেন। জার্মানি, ইংল্যান্ড সহ বিদেশের বিভিন্ন দেশে গিয়ে নজর কেড়েছেন। এমনকী জার্মানি থেকে উয়েফা বি লাইসেন্সও পেয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ যেন সামনেই অপেক্ষা করছিল।
কিন্তু, জীবন যে এত সহজ নয়, সেটা ছোট থেকেই বুঝে গিয়েছিলেন পৌলমী। ফুটবল খেললেও সংসারের দিক থেকে চোখ সরাননি তিনি। বাড়িতে টাকার অভাব, দু’বেলা দু’মুঠো জোটে কিনা ঠিক নেই। দারিদ্র্য কষিয়ে থাপ্পড় মারছে তাঁর গালে। না, এভাবে হবে না। যে কোনও একটা রাস্তা বাছতেই হবে। প্রশাসনের কাছে আবেদন নিবেদনই সার। সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে আসে না, প্রশাসনও নয়। অথচ পৌলমী তো জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন! একেবারে খারাপ তো খেলেননি! তাহলে কেন বঞ্চনার শিকার?
She is Poulami Adhikari. Represented the Indian National football team. Now works as a zomato delivery girl. Didn't get any recognition. Is this how we should treat our talents?
— Sagnik Roy Chowdhury (@SagnikRoyC)
শেষমেশ ফুটবল তুলে রাখলেন পৌলমী অধিকারী। জোম্যাটোর ডেলিভারি গার্ল হিসেবে শুরু হয় যাত্রা। জার্সি তুলে পরে নেন সংস্থার বিশেষ জামা। রাতদিন কেবল ছুট আর ছুট। যাই হোক, কিছু তো টাকা আসছে! কিন্তু মাঝ রাস্তায় কেউ তাঁকে চিনে ফেলবেন, সেটা ভাবতেও পারেননি পৌলমী। সেই ব্যক্তির দৌলতেই তাঁর এই দুর্দশা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। কয়েকদিন আগেও তাঁর নাম কারও মনেই ছিল না। ২৪ বছরের পৌলমী আবার আশা দেখতে শুরু করেছেন। আইএফএ-র তরফ থেকে ফোন করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে চাকরির কথা বলা হচ্ছে। সেইসঙ্গে বলা হচ্ছে ফুটবলের কথা। খেলতে খেলতেই যদি একটু উপার্জন করা যায়, তাহলে সংসার ও স্বপ্ন দুটোই বাঁচে।
কিন্তু সেইসঙ্গে সামনে আসে আমাদের, সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের নির্দিষ্ট কিছু দৈন্য ভাবনাও। সচরাচর শোনা যায়, কাজই হল আসল। কোনও কাজই ছোট নয়। কাজের মধ্যে দিয়ে মানুষ নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কোনও ফুটবলার কিংবা খেলোয়াড় তাঁর ক্রীড়া জীবনের পর যদি অন্য কাজে যুক্ত হন, তখনই সমস্যা শুরু হয়। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ডেলিভারি গার্ল বা বয়ের কাজ - কোনও কাজই তো ছোট নয়। আর খেলোয়াড়রা তো সারাজীবন খেলতে পারেন না। পৌলমী অধিকারীর গল্পটি আলাদা; সেখানে জড়িয়ে আছে বঞ্চনা, দারিদ্র্যের সঙ্গে স্বপ্নভঙ্গ। তাছাড়াও, পৌলমী এখনও অনেকগুলি বছরই সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফুটবল খেলতে পারবেন। কিন্তু, তারপর? রাজ্য হোক বা কেন্দ্র, কোনও প্রশাসনই যে পৌলমীর মতো প্রতিভাময়ী অথচ দরিদ্র খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ায় না তার প্রমাণ মেলে ভুরিভুরি। আর প্রশাসন বা ফুটবল সংস্থা পাশে না দাঁড়ালে? তখন তো নিজের খোরাক নিজেকেই জোগাড় করতে হবে! তখন কি কেউ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পাশে দাঁড়াবেন?















