আইআরসিটিসি কেলেঙ্কারি! লালুর পরিবারের বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ?
IRCTC Scam: বর্তমানে বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, তেজস্বী যাদব মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে এগিয়ে আছেন। এই অবস্থায় তাঁর ও পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলায় চার্জগঠন নিঃসন্দেহে আরজেডির জন্য বড় ধাক্কা।

দিল্লির রাউস অ্যাভেনিউ আদালতের রায় যেন বিহারের রাজনীতিতে নতুন ঝড় তুলল। বহু প্রতীক্ষিত আইআরসিটিসি দুর্নীতি মামলায় আদালত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, রাষ্ট্রের সাবেক রেলমন্ত্রী ও আরজেডি সুপ্রিমো লালুপ্রসাদ যাদব, তাঁর স্ত্রী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রাবড়ি দেবী এবং বর্তমান উপমুখ্যমন্ত্রী তেজস্বী যাদবের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রতারণা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষে চার্জগঠন করা হলো। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, “লালুপ্রসাদ যাদব এই ষড়যন্ত্রের মূল কাণ্ডারী ছিলেন।” সরকারি পদে থেকে ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে মনে করছে আদালত।
কী এই আইআরসিটিসি কেলেঙ্কারি?
২০০৪ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে লালু প্রসাদ যাদব ছিলেন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী। ২০০৫ সালে রেল মন্ত্রক সিদ্ধান্ত নেয়, আইআরসিটিসির রাঁচি ও পুরীর দুটি হোটেল বেসরকারি সংস্থার হাতে লিজে দেওয়া হবে। এজন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এই হোটেলগুলির দায়িত্ব দেওয়া হয় সুজাতা হোটেল প্রাইভেট লিমিটেড নামের বিহারের একটি সংস্থাকে। সংস্থাটির মালিক ছিলেন বিজয় কোচর ও বিনয় কোচর। কিন্তু অভিযোগ, সেই সময়ে ‘সুজাতা গ্রুপ’-এর লিজ নেওয়ার মতো ক্ষমতা ছিল না। অথচ রেলের শর্ত এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, শেষ পর্যন্ত ওই সংস্থার হাতেই হোটেলগুলি তুলে দেওয়া হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Voter Adhikar Yatra: এই যাত্রায় ভোট জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে, মানুষের ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এক কংগ্রেস নেতা বলেন, "বছরের পর বছর কংগ্রেস বিহারে নিষ্ক্রিয় ছিল। রাহুল গান্ধীর যাত্রা এটিকে জাগিয়েছে।"
এই সময়েই পটনায় তিন একর জমি বিক্রি করে ‘সুজাতা হোটেল’। জমিটি কেনে ‘ডিলাইট মার্কেটিং প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের একটি সংস্থা, যারা ওই জমির জন্য দেয় ১.৪৭ কোটি টাকা। আশ্চর্যের বিষয়, জমি বিক্রির কিছুদিন পরেই ‘সুজাতা হোটেল’ লিজে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে এবং ২০০৬ সালে তারা পেয়ে যায় ১৫ বছরের জন্য আইআরসিটিসির বিএনআর রাঁচি এবং বিএনআর পুরী দুটি হোটেল চালানোর দায়িত্ব। পরে তদন্তে জানা যায়, ‘ডিলাইট মার্কেটিং’-এর মালিক ছিলেন আরজেডি সাংসদ প্রেমচন্দ্র গুপ্ত, যিনি লালুপ্রসাদ যাদবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। ২০১৪ সালে প্রেমচন্দ্র তাঁর সংস্থাকে দেউলিয়া ঘোষণা করেন এবং সেই জমিটি বিক্রি করে দেন ‘লারা প্রজেক্ট এলএলপি’ নামের একটি সংস্থাকে মাত্র ৬৪ লক্ষ টাকায়।
সিবিআই জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে ওই সংস্থাকে হোটেলগুলির দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিনিময়ে লালু যাদবের পরিবারকে পটনার প্রাইম লোকেশনে একাধিক জমি ‘উপহার’ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। সংস্থাটির পক্ষ থেকে এই জমি হস্তান্তরের বিনিময়ে সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ। তদন্তে উঠে এসেছে, লালুর স্ত্রী রাবড়ি দেবী এবং ছেলে তেজস্বী যাদবও ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন, কারণ তাঁদের নামে বা তাঁদের ঘনিষ্ঠদের নামে এই জমিগুলি রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল। আদালত জানিয়েছে, তাঁরা 'ষড়যন্ত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী'।
আদালতের এই সিদ্ধান্তের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ৬ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে বিহার বিধানসভা নির্বাচন, এবং দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালত এই মামলার চার্জগঠন করল সেই নির্বাচনের ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এর রাজনৈতিক অভিঘাত গভীর। নীতীশ কুমারের বিজেপি জোট এই সুযোগে আরজেডি-কে কোণঠাসা করতে চাইবে, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যেই বিজেপি নেতারা অভিযোগ তুলেছেন, যাদের হাতে বিহারের ভবিষ্যৎ, তারা দুর্নীতির জালে জড়িয়ে আছে। অন্যদিকে, আরজেডি শিবিরেও ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সুর স্পষ্ট।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bihar: এই জরিপে উঠে এসেছে, বিহারের ৭১% এরও বেশি দলিত ভোটার, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR)-এ ভোটাধিকার হারানোর ভয় পাচ্ছেন।
আরজেডি নেতাদের বক্তব্য, এটা নিছকই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, ভোটের আগে তাঁদের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। লালুপ্রসাদ যাদব সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা নির্দোষ। আদালতের উপর আমাদের আস্থা আছে। বিজেপি ভোটের মুখে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে।” তেজস্বী যাদব এক্স-এ লিখেছিলেন, “কয়েক দিন আগে প্রচারে এসে অমিত শাহ বলেছিলেন, আমাকে নির্বাচনে লড়তে দেবেন না। এখন কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে সেই হুমকি কার্যকর করছেন।”
এই আইআরসিটিসি হোটেল দুর্নীতি মামলা প্রথম উঠে আসে ২০১৭ সালে, যখন সিবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করে। ২০১৮ সালে লালু, রাবড়ি ও তেজস্বীর নামে চার্জশিট দাখিল করা হয়। তবে এতদিন আদালতের প্রাথমিক শুনানি চলছিল। এবার আদালত চার্জগঠন করে জানিয়ে দিল তাঁদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ আছে, তাই পূর্ণাঙ্গ বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এই মামলা শুধু দুর্নীতির অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিহারের রাজনীতিতে লালুর পরিবারের ভাবমূর্তির পুনর্মূল্যায়নের সূচনা হতে পারে। লালুপ্রসাদ একসময় দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিক ছিলেন, রেলমন্ত্রী থাকাকালীন ‘সস্তা টিকিট’ নীতিতে তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। অন্যদিকে ১৯৯০-এর দশকের ‘চারা কেলেঙ্কারি’ মামলা, পরে ‘চাকরির বিনিময়ে জমি’ মামলাতেও তাঁর নাম জড়ায়। সেই সময় আরজেডি বিহারে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তেজস্বীর নেতৃত্বে দল আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যুব ভোটারদের মধ্যে নতুন করে সমর্থনও জুটেছে। বর্তমানে বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, তেজস্বী যাদব মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে এগিয়ে আছেন। এই অবস্থায় তাঁর ও পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলায় চার্জগঠন নিঃসন্দেহে আরজেডির জন্য বড় ধাক্কা।
আদালতের রায় অনুযায়ী, এখন মামলার পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। দোষ প্রমাণিত হলে লালুপ্রসাদ যাদব এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা যাবজ্জীবন জেল হতে পারে। পাশাপাশি, মোটা অঙ্কের জরিমানাও দিতে হতে পারে। তবে এর আগে তাঁরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মামলার প্রভাব শুধু আদালতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বিহারের ভোটবাক্সেও প্রতিফলিত হতে পারে। একদিকে দুর্নীতির অভিযোগে আরজেডি চাপে, অন্যদিকে সহানুভূতির ঢেউও উঠতে পারে বিশেষ করে গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে, যারা লালু প্রসাদ যাদবকে এখনও ‘গরিবের নেতা’ হিসেবে মনে রেখেছেন।
এখন বিহার বিধানসভা ভোটের দিনগণনা শুরু। ভোট হবে দু’দফায়, আর ফল প্রকাশ ১৪ নভেম্বর।তারই মধ্যে আইআরসিটিসি কেলেঙ্কারি মামলার এই নতুন মোড় বিহারের রাজনীতিকে আবারও সরগরম করে তুলেছে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত ভোটের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলবে সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। ভোটের আগে এই আইনি ধাক্কা রাজনীতির অঙ্ককে কতটা পাল্টাবে, তা জানতেই এখন তাকিয়ে আছে গোটা দেশ।






