হিরে না প্রকৃতি?

Satyaki Tat
৪ মিনিট
হিরে না প্রকৃতি?

হিরে, কি বিচিত্র এক জিনিস! কার্বনের কঠিনতম দশা, যা এই পৃথিবীতে বিরল, খুঁজে পেতে খোদাই করতে হয় টন টন পাথর, মাটি, করতে হয় বিস্তর সাধনা। তার পর ধরিত্রির গভীরে লুকিয়ে থাকা রত্ন ধরা দেয় মানুষকে। তার এমনই চমক, যে অন্ধকারেও বিশেষ বেগ পেতে হয়না তাকে খুঁজে পেতে। তার পর কারিগরের পরিশ্রম, তার হাতের জাদুতে সে পরিণত হয় এক মহা মূল্যবান রত্নে। পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান রত্ন! যে রত্নের দখল পেতে কত রক্তক্ষয় হয়েছে ইতিহাসে তার কোনো হিসাব নেই।

আচ্ছা, এবার আপনাকে একটা প্রশ্ন করি। বলুন তো, এই মহাবিশ্বে কে বেশি মূল্যবান হবে? হিরে না কাঠ? আচ্ছা মহাবিশ্ব ছাড়ুন, শুধু আকাশ গঙ্গা ছায়াপথের কথাই যদি বলি?

অদ্ভূত প্রশ্ন না? উত্তর টা বলে দিচ্ছি, কাঠ। আমাদের সৌরজগতের চারটি বৃহৎ গ্রহ, যাদের বিজ্ঞানের পরিভাষায় "Gas Giants" বলে, সেখানে হিরের বৃষ্টি হয়, এবং কাঠ? নাহ, এখনো তো খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবাক হলেন? গুগল বাবা কে জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন।

এবার আপনি আমায় বলতেই পারেন, অন্য গ্রহ নিয়ে আমার কি? এই পৃথিবীতে তো কেউ চাইলেই হিরে কিনতে পারেনা। কাঠ তো বাড়ির বাইরে গেলেই গাছ কেটে পেয়ে যাব। ঠিক। আচ্ছা এবার একটা কথা বলুন, আপনি কি হিরের খনি পেতে দুই আড়াই লক্ষ গাছ কেটে ফেলবেন? একটা গোটা জঙ্গল, তার হাজার হাজার জীবজন্তু, তার পর নির্ভরশীল শয় শয় মানুষের জীবন ধ্বংস করে ফেলবেন?

চলুন আপনাকে নিয়ে যাই মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর জেলায়। সেখানে গেলে আপনি পাবেন দেশের অন্যতম ঘন জঙ্গল, বক্সওয়াহা। 2002 সালে অস্ট্রেলিয়ার রিও টিনটো নামক এক সংস্থা সেই জঙ্গলে হিরে খুঁজে পাওয়ার কাজের বরাত পায়, যে প্রজেক্টের নাম দেওয়া হয় বান্ডর ডায়মন্ড প্রজেক্ট। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা বুঝতে পারে যে এই জঙ্গলের নীচে 55 হাজার কোটি টাকার বা তার ও বেশি মূল্যের হিরে থাকতে পারে। 950 হেক্টর জঙ্গল জুড়ে শুরু হয় হিরে খননের কাজ। কিন্তু অধিবাসীদের তীব্র প্রতিরোধের ফলে 2016 সালে রিও টিনটো এই প্রজেক্ট ছেড়ে চলে যায়।

2019 সালে বন্ডর ডায়মন্ড প্রজেক্টের দায়িত্ব চলে যায় আদিত্য বিড়লা গ্রুপের এসেল মাইনিং অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিস লিমিটেডের কাছে। জঙ্গলের নিচের এই "অতি মূল্যবান" রত্নকে খুঁজতে তাদের পরিকল্পনায় ঠিক হয় যে প্রায় আড়াই লক্ষ গাছ কেটে সাফ করে ফেলতে হবে। বলা যায়, অনেকটা জঙ্গল ধ্বংস করে ফেলতে হবে।

শুধু তো আড়াই লক্ষ গাছ নয়, সেই সাথে হাজার হাজার জীবজন্তু, আট হাজার আদিবাসী মানুষ, তাদের জীবিকা, বাস্তু তন্ত্র, জলের অভাবে ধুঁকতে থাকা বুন্দেলখন্ডের একমাত্র নদী গেল, সব ধ্বংস হতে বসেছে। তবে তাতে ধনতন্ত্রের কি? তার তো শুধু মুনাফা চাই।

এক সংবাদমাধ্যম কিছু দিন আগে সেখানে যায়, অধিবাসীদের সাথে কথা বলে এই বিষয়ে, এবং তাদের স্পষ্ট দাবি, এই অনাচার রুখতে হবে, কারণ জঙ্গল চলে গেলে তাদের জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের জীবিকা, তাদের বাসস্থান, সব ধ্বংস হবে, এবং তাঁরা এটাও খুব ভালো করেই জানেন যে, এই প্রজেক্টে তাদের কোনো রকমের কর্মসংস্থানও হবেনা। তবে এটা বলাই বাহুল্য, হলেও তাঁরা এর বিরোধিতা করবেন।

শুধু তাই নয়, এই জঙ্গলে আছে অনেক প্রকারের বহু মূল্যবান গাছ, যার মুল্য অনেক। সেই সাথে আছে হাজার হাজার বন্য প্রাণী, যারা ইতিমধ্যেই দেশ এবং বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় বিপন্ন। ওই যে গেল নদীর কথা লিখলাম, সেই নদীতেও বাঁধ দিয়ে তার প্রাকৃতিক জলবহন ক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে, কারণ এই হিরে খোদাই করার কাজে প্রত্যেক দিন লক্ষ লক্ষ লিটার জলের প্রয়োজন। একই বুন্দেলখন্ডে ভয়ংকর জলের সমস্যা, দেশের অন্যতম শুষ্ক অঞ্চল এই জায়গাটি, তার ওপর নদী বাঁধ দিয়ে রোজ লক্ষাধিক লিটার জল হীরা খননে চলে গেলে অনুমান করাই যায় কি দুর্দিন আসতে চলেছে।

যদিও মধ্যপ্রদেশ সরকারের এতে বিশেষ হেলদোল নেই। তারা মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা এতে খুশি হবেন এবং এই অঞ্চলের অনেক উন্নতি হবে। সেই সাথে তাদের দাবী, তাঁরা এই আড়াই লক্ষ গাছ কেটে ফেলার ক্ষতি পূরণ হিসেবে অন্যত্র দশ লক্ষ গাছ বসাবেন।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন যে, এটা ভাঁওতাবাজি ছাড়া কিছুই নয়। প্রথমত, প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে ওঠা জঙ্গলের বিকল্প কোনোভাবেই কৃত্রিম ভাবে গাছ বসিয়ে সম্ভব নয়, দ্বিতীয়ত, দশ লক্ষ গাছ রোপন করতেও প্রচুর পরিমাণে জল প্রয়োজন। বাঁধ দিয়ে গেল নদী তো ধ্বংসই হয়ে যাবে, জল আসবে কোথা থেকে?

প্রতিরোধ আছে, ভালো মতোই আছে। পরিবেশ কর্মী এবং অনেক নাগরিক এগিয়ে এসেছেন, রজু হয়েছে জনস্বার্থ মামলা। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল থেকে শুরু করে ইউনেসকো, সব জায়গাতেই এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, এবং লাগাতার আন্দোলন চলছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও লক্ষাধিক মানুষ এই প্রজেক্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

তবে আপাতত রক্ষাকর্তা হিসেবে দাঁড়িয়েছে পঁচিশ হাজার বছর পুরোনো গুহাচিত্র, যাকে রক্ষা করার জন্যে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের প্রিন্সিপাল বেঞ্চ এই মুহূর্তে এই প্রজেক্টের কাজে স্থগিতাদেশ দিয়েছে এবং যতদিন না পরবর্তী শুনানি হচ্ছে ততদিন এর কাজ শুরু না করার নির্দেশ দিয়েছে।

এই পরিবেশ দূষণ, বিশ্ব উষ্ণায়নের যুগে, যেখানে মানুষের জীবন, বর্তমান এবং ভবিষ্যত চূড়ান্ত ভাবে বিপন্ন, সেখানে যখন মানুষই প্রকৃতি ধ্বংস করার মত এই ধরণের আত্মঘাতী কাজ করে, তখন সত্যিই অনেক প্রশ্ন উঠে আসে। প্রশ্ন জাগে, যে আমাদের কাছে কোনটার প্রাধান্য বেশি? আমাদের জীবন? না অর্থের? অক্সিজেন, পানীয় জল না থাকলে কি হিরে খেয়ে বাঁচবো আমরা? প্রকৃতি এবং মানুষের নিরন্তন আদানপ্রদানের মাধ্যমেই তো তিন লক্ষ বছর ধরে মানবসভ্যতা গড়ে উঠেছে এই পৃথিবীতে। সেটা কয়েক শো বছরের "উন্নয়ন" এর আগুনে এভাবে জলান্জলি দেবো আমরা? এই অতিমারির থেকে কিছুই শিখলাম না আমরা? দেখলাম না নিরন্তন প্রকৃতি ধ্বংস করার ফল?

কবিগুরু আজ থেকে একশো বছর আগে এমনি এমনি লেখেননি, "দাও ফিরে সেই অরণ্য, লও এ নগর।"

তথ্যসূত্রঃ

  • https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=5023397457691789&id=237647452933504

  • https://www.google.com/amp/s/www.thequint.com/amp/story/news/environment/save-buxwaha-protest-to-save-2-lakh-trees-in-chhatarpur-buldelkhand-forest-bunder-diamond-block

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।