দেবী রজঃস্বলা হলে লাল হয় ব্রহ্মপুত্র নদের রং, কামরূপ-কামাখ্যা আজও রহস্যময়

ভারতে নারীদের ঋতুস্রাব নিয়ে আজও খোলাখুলিভাবে কথা বলা মানা, আর ভাবতে অবাক লাগে, সেখানেই, আসামে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দিরে সতীর ঋতুস্রাব নিয়ে বছরের পর বছর উদযাপন হয়। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, প্রতি বছর আষাঢ় মাসে (জুন) কামাখ্যার কাছে অবস্থিত ব্রহ্মপুত্র নদ লাল রঙে রাঙা হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই সময় দেবী ‘রজঃস্বলা’ হন। ভারতে যেখানে ঋতুস্রাব একটি লজ্জাজনক বিষয়, সেখানে কামাখ্যায় ‘ঋতুস্রাব’ মহিলার গর্ভধারণের ক্ষমতা হিসেবে সম্মানিত। এই মন্দিরের ইতিহাস মৌখিক এবং কিংবদন্তির সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। ৮-৮০- সকলের কাছেই এই কামাখ্যা মন্দির অনন্তকাল ধরে অনাবিল রহস্যের বেড়াজালে মোড়া। যার পরতে পরতে রহস্য। ছোটবেলা থেকে ঠাম্মা-দিদুনদের কাছে শোনা গল্প কামাখ্যা নাকি জাদুর শহর। সত্যিই কি তাই? আসুন, জেনে নেওয়া যাক।

 

কামাখ্যা মন্দির আসামের পশ্চিমাঞ্চলে নীলাচল পর্বতে (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮০০ ফুট উঁচুতে) অবস্থিত, কামাখ্যা থেকে ১০ কিমি. এবং গুয়াহাটি শহর থেকে ৮ কিমি. দূরে, আসামের রাজধানী দিসপুরের কাছে। ভূমিকম্প, বহির্শক্তির অতর্কিত আক্রমণ এবং বহু অজানা ঝড়ঝাপটায় এই মন্দিরের ক্ষতি হলেও আজও ম্লেচ্ছ রাজবংশের শাসনকালে নির্মিত এই মন্দির কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

 

মন্দিরের ইতিহাস
বিভিন্ন প্রাচীন সাহিত্যে কামাখ্যার উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, দেবী ভাগবত, দেবী পুরাণ, যোগিনী তন্ত্র, হেবজ্র তন্ত্র ইত্যাদি। কামাখ্যা মন্দিরের উৎপত্তি প্রাক্-আর্য বলে কথিত। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে করা হয়, মন্দিরটি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সর্বপ্রথম শাসক রাজা নারকের শাসনকালে প্রাধান্য পায়। কিন্তু নারকের উত্তরসূরিদের মধ্যে কারওর এই মন্দিরের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার কোনও স্পষ্ট উল্লেখ নেই। কালের অতলে একদিন বিলুপ্ত হয়ে যায় এই মন্দির, তখন নীলাচল পর্বতের চারদিক জঙ্গলে ঘেরা। শক্তিময়ী মায়ের কথা ভুলেই গেল সকলে। এরপর ১১৫০ সালে পালবংশের ধর্মপাল গৌহাটির পশ্চিমদিকে রাজত্ব করতে এলে তিনিই আবার মন্দিরটিকে খুঁজে বের করে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। পালবংশের শাসনের পর আবার হারিয়ে যায় মায়ের মন্দির। পরে, ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কোচ সাম্রাজ্যের উত্থানের আগে পর্যন্ত এর ইতিহাস অস্পষ্ট ছিল।

 

আরও পড়ুন: হিন্দুদের পবিত্র তীর্থে মারাত্মক দূষণ! আবার কি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে চারধামের এই ধাম?

 

মধ্যযুগীয় সময়ে মন্দিরের পুনর্নির্মাণ সম্পর্কে দু'টি ভিন্ন মত রয়েছে। কোচ রাজা বিশ্ব সিংহ ১৫৫৩-'৫৪ সালের দিকে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে কালাপাহাড়, গৌড়ের একজন মুসলিম আক্রমণকারী মন্দিরটি ধ্বংস করেছিল বলে অনুমান করা হয়। আবার অন্য মতানুসারে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে কোচ রাজা নরনারায়ণ এই মন্দির সংস্কার করেন ও তাকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেন। আসামের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টায় ১৭ শতকের গোড়ার দিকে, আহোমরা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন এবং মন্দিরের দায়িত্বভার নেন।

 

কামাখ্যা মন্দিরের উৎস
কামাখ্যা মন্দিরের উৎস নিয়ে নানা মুনির নানা মত। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, রাজা দক্ষর ইচ্ছার বিরুদ্ধে মহাদেবকে বিবাহ করেছিলেন দেবী সতী। মহাদেবের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তিনি এক যজ্ঞের আয়োজন করেন, কিন্তু তিনি সেই যজ্ঞে দেবী সতী বা মহাদেব কাউকেই আমন্ত্রণ জানাননি। মা সতী মহাদেবের ইচ্ছের বিরুদ্ধে সেই যজ্ঞে উপস্থিত হলে প্রজাপতি দক্ষ তাঁকে এবং তাঁর স্বামী মহাদেবকে অপমান করলে তিনি তা মেনে নিতে পারেননি। স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে তিনি যজ্ঞের আগুনে দেহত্যাগ করেন। শোকাহত মহাদেব এরপর দক্ষর যজ্ঞ ভণ্ডুল করেন ও মা সতীর দেহ নিয়ে বিশ্বব্যাপী তাণ্ডব শুরু করলে ব্রহ্মা ও অন্যান্য দেবতা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। এরপর বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে দেবীর দেহ টুকরো করলে তা ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে পড়ে এবং সেই পবিত্র স্থান সতীপীঠ বা শক্তিপীঠ নামে অভিহিত। কামরূপে যে স্থানে দেবীর যোনি পতিত হয়েছিল, তা হল তীর্থচূড়ামণি। এর অর্থ হল, সব তীর্থের মধ্যে সেরা তীর্থস্থান। কথিত আছে, কামাখ্যায় যোনিরূপ যেই প্রস্তরখণ্ডে মা বিরাজ করছেন, সেই শিলা স্পর্শ করলে মানুষ মুক্তিলাভ করে।

 

আবার ধর্মীয় সাহিত্য অনুযায়ী আদি মন্দিরটি কামদেব দ্বারা নির্মিত, যিনি এই মন্দিরে মায়ের আরাধনা করার পর শিবের বরপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর স্বকীয় সৌন্দর্য ফিরে পেয়েছিলেন। বিশ্বকর্মার সাহায্যে নির্মিত এই মন্দিরটি স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যের বিস্ময়ে পরিপূর্ণ। আবার কিছু লোকের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই মন্দির এমন একটি স্থান, যেখানে মহাদেব আর সতীর মিলন-সম্পর্ক স্থাপিত হয়। সংস্কৃত শব্দ ‘কাম’ প্রেমের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে এই অঞ্চলটির নাম কামাখ্যা হয়েছে বলে অনেকের ধারণা।

 

মন্দিরের পূজা-আচার-অনুষ্ঠান
ধর্মপালের সময়কালে মায়ের মন্দিরে পূজার্চনা করার জন্য কনৌজ থেকে অনেক সদাব্রাহ্মণকে নিয়ে আসা হয়। এরা বাসত্তরীয় ব্রাহ্মণ নামে খ্যাত। এরাই কামাখ্যা দেবীর মন্দিরের আদি পূজারি। পুরোহিতের কথা অনুযায়ী সম্পন্ন হয় মন্দিরের পূজা। প্রধান মন্দিরের বাইরের সৌভাগ্যকুণ্ড থেকে মাথায় জলের ছিটে দিয়ে শুরু হয় পুজো। সেখানে অসমিয়া ভাষায় লেখা ‘যখনই মুখ খুলিবেন, মা কামাখ্যার নাম বলিবেন’। দেশের অন্যান্য বড় মন্দিরের মতো এখানেও নগদ মূল্যে পুজো দেওয়ার রীতি আছে। এই মন্দিরে শুধু যে ভারতের মানুষ আসেন তা নয়, দেশের বাইরে থেকেও বিভিন্ন মানুষ ছুটে আসেন মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ার আশায়। পূর্ণ হলে তাঁরা একটা করে ঘণ্টা বেঁধে রেখে যান। আষাঢ় মাসে অম্বুবাচী মেলা হয় এখানে এবং লক্ষ লক্ষ ভক্ত দেশ বিদেশ থেকে ছুটে আসেন। ভিড় হয়ে যায় মায়ের মন্দিরের সামনে।

 

মন্দিরের আকৃতি ও গর্ভগৃহ
কামাখ্যা মন্দিরে চারটি কক্ষ আছে। গর্ভগৃহ এবং তিনটি মণ্ডপ। মণ্ডপগুলোর নাম– চলন্ত, পঞ্চরত্ন ও নাটমন্দির। এই মন্দিরের প্রাঙ্গণে দশমহাবিদ্যার একটি মন্দিরও আছে। এই মন্দিরগুলোতে দশমহাবিদ্যা, যেমন, কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ধূমাবতী, ছিন্নমস্তা, বগলামুখী, মাতঙ্গী, এবং দেবী কমলার মন্দিরও আছে। এদের মধ্যে ত্রিপুরাসুন্দরী, মাতঙ্গী ও কমলা প্রধান মন্দিরে পূজিত হয়। গর্ভগৃহ পঞ্চরথ স্থাপত্যশৈলিতে নির্মিত। অন্যগুলোর স্থাপত্য তেজপুরের সূর্যমন্দিরের সমতুল। মন্দিরের চুড়োগুলো সপ্তরথ আকৃতির। সাতটি ডিম্বাকৃতি গম্বুজের ওপর তিনটি স্বর্ণকলস বসানো। গর্ভগৃহটি আসলে ভূগর্ভস্থ একটি গুহা। এখানে কোনও মূর্তি নেই। গর্ভগৃহটি ছোট ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। ভেতরে একটি ঢালু পাথর আছে, যার আকৃতি যোনির মতো। তার মধ্যে দশ ইঞ্চি গভীর একটি গর্ত। একটি ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল বেরিয়ে গর্তটিকে সবসময় ভর্তি রাখে। এই গর্তটিই দেবী কামাখ্যা নামে পূজিত। এই গর্তের উৎসমুখ সবসময় একটি লাল কাপড়ে ঢাকা থাকে।

 

কামাখ্যা মন্দির নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত কথা
সকলের কাছেই কামাখ্যা মন্দির এক রহস্যময়ী স্থান। না জানি কত হাজার বছরের পুরনো রহস্য তার গর্ভে লুকোনো। এই মন্দিরের খ্যাতি শুধু প্রাচীন স্থাপত্য, মায়ের ঋতুস্রাব উৎসব বা অম্বুবাচীর মেলার জন্য নয়, বলাই বাহুল্য, এই মন্দির নিয়ে মানুষের আকর্ষণের কারণ জাদু টোনা, কালা জাদু, বশীকরণ, তন্ত্রসাধনা ইত্যাদির আঁতুড় হিসেবে। পৌরাণিক এই মন্দিরকে ঘিরে রেখেছে শুধু রহস্য নয়, কিছু রোমাঞ্চকর কাহিনিও।

 
কথিত আছে, সেখানে ডাকিনী-যোগিনীরা গিজগিজ করছে, যারা জাদু বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী। সেই জাদুর নগরীতে কোনও পুরুষ গেলে সে আর ফিরে আসে না, সেখানকার পুরুষকে সারাজীবন সেইসব যোগিনীদের দাস হয়ে থাকতে হয়। কেউ কেউ বলে কামরূপে না কি কোনও পুরুষ নেই, সবাই নারী। এই ধরনের নানা কল্পকাহিনী চালু আছে কামরূপ-কামাখ্যা নিয়ে।

 

বলা হয়, একসময় এই জায়গা দিয়ে গেলে কেউ ফিরে আসত না। কথিত আছে, দেবী রজঃস্বলা হওয়ার সময়ে এক তরুণ ব্রাহ্মণ সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মন্দিরে প্রবেশ করলে দেবীর কোপে তিনি দৃষ্টিহীন হয়ে যান। আবার জনশ্রুতি আছে যে, কোচবিহারের যে রাজবংশ দেবীর ভক্ত ছিল, দেবীর আদেশেই তাঁদের সকলের ওই মন্দিরে পুজো দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। এখনও রাজবংশের কেউ নীলাচল পর্বতের পাশ দিয়ে গেলেও মন্দিরের দিকে তাকান না।

 

অনেকে মনে করেন, কামরূপ কামাখ্যার আশপাশের অরণ্যে নাকি ঘুরে বেড়ায় নানাবিধ আত্মারা। কামাখ্যার জাদুবিদ্যা আর সাধকদের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার গল্পই সকলের মুখে। বলা হয়, কামাখ্যার নারীরা নাকি ছলাকলা ও কামকলায় পারদর্শী। তন্ত্রসাধনার আঁতুড় এই মন্দিরে নাকি কালো জাদু থেকে মুুক্তির উপায় পাওয়া যায়।

 

কামরূপ জেলার সঙ্গে তন্ত্র বা জাদুর কোনও সম্পর্ক নেই । গুয়াহাটি শহরের নীলাচল পাহাড়চূড়ায় রয়েছে কামাখ্যা মন্দিরটি। একধারে পাহাড়ের দেয়াল। সেই দেয়ালের মাঝে মাঝে টেরাকোটার কাজ করা আছে, কামাখ্যা সত্যযুগের কিংবদন্তি ও আসামের ঐতিহ্য। আরেক ধারে অন্য পাহাড়ের গা ঘেঁষে রংবেরঙের সব ঘরবাড়ি। কাজেই সেখানে শুধু জাদুকর বা নারীরা নয়, সব ধরনের মানুষেরই বসতি আছে। কথিত আছে, এখানে অনেক আগে মহাশক্তিধর কিছু তান্ত্রিক ছিলেন, তাঁরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারতেন। হয়তো তার ওপর ভিত্তি করে রটনাটি হয়েছিল।

 

এইভাবেই বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এইসব লোকমুখে প্রচলিত কথা। এইসব লোককথা, নেতিবাচক-ইতিবাচক মন্তব্য গল্প না সত্যি তা বিচার করার শক্তি কারও নেই। কিন্তু তাতে মায়ের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে টলানো যাবে না। আজও হাজার হাজার মানুষ দূর দেশ থেকে পাড়ি দিয়ে তার কাছে ছুটে আসেন। তিনি যে নারীশক্তির প্রতীক।

 

সবশেষে বলতে হয়, যে দেশের মানুষ ঋতুস্রাবের প্রতি তার প্রাচীন মনোভাব পোষণ করেন এবং তাকে অপরিষ্কার, ঘৃণ্য ও জঘন্য হিসেবে উত্থাপন করেন সেখানে আমাদের প্রত্যেকের কাছে কামাখ্যা সতী মায়ের মন্দির এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে ধরা দেয়। নারীত্ব উদযাপনের যে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি তারা তুলে ধরে, তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নারীই শক্তির প্রতীক। এটিই শক্তিবাদের মূল কথা।

 

 

 

More Articles

;