বাচ্চাদের সামলানোর জন্য, চুপ করানোর জন্য, তাদের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া ওদের ভবিষ্যতের জন্য কতটা ক্ষতিকারক?

Amit Pratihar
৩ মিনিট
বাচ্চাদের সামলানোর জন্য, চুপ করানোর জন্য, তাদের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া ওদের ভবিষ্যতের জন্য কতটা ক্ষতিকারক?

আমাদের ছোটবেলা কেটেছে দাদু ঠাকুমার আদরে, জ্যেঠু জেঠিমার কোলে কোলে, মায়ের বুকের ওমে, পাড়া পড়শীদের সাহচর্যে। আমাদের খেলার সাথী ছিল, খোলা উঠোন-সবুজ মাঠ ছিলো, গল্প শোনানোর ঠাকুমা ছিল, খেতে না চাইলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খাওয়ানোর মতো মা ছিল, ঘুম না এলে পিঠে আলতো চাপ্পড় মারতে মারতে গান শোনানোর লোক মাসি পিসি ছিলো। কিন্তু আজকালকার শিশুদের কাছে নেই সেসব স্বর্ণযুগের সিকিকড়ি। আধুনিক যুগের কর্মরত মা বাবার ব্যস্ততায়, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির বহুল প্রচলনে এখনকার দিনের বাচ্চারা ছোট্ট থেকেই একলা। ছোট্ট দু'কামড়ার ফ্ল্যাটেই তাদের ইহজগত, বিশ্বসংসার। তার মধ্যে বাইরে কোরোনার চোখরাঙানি।

এমতাবস্থায় না তারা পায় বাইরের মানুষের সহচর্য্য, না খোলা আকাশ, না খেলার সাথী, না সবুজ মাঠ। অতঃপর মা বাবার ব্যস্ততার অছিলায় ছোট্ট ছোট্ট শিশুদেরকে ভুলিয়ে রাখতে হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্ট ফোন। ফুলের মতো শিশুরা সব কিছু ভুলে দিনভর মেতে থাকছে নানানরকম গেমস, ভিডিও, ইউটিউব, ইত্যাদিতে। কিন্তু আপনি কী জানেন মোবাইল নামক যন্ত্রটিতে মেতে থেকে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা ভুলে থাকলেও, এই ক্ষতিকারক যন্ত্র কীভাবে সর্বনাশ করছে আপনার সন্তান সন্ততির? জানেন না তো, তবে আসুন জেনে নেওয়া যাক।

১. মস্তিষ্কের বিকাশ : একদম ছোট্ট থেকেই মোবাইল ঘাঁটার অভ্যাসের জন্য বাচ্চাদের অত্যন্ত ক্রিয়েটিভ মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটছে না স্বাভাবিক ভাবে। মস্তিষ্কের মধ্যে যত ধরণের ভাবনা থাকে, প্রশ্ন থাকে তত বিকাশ ঘটে মস্তিষ্কের, যা কিনা শিশু বয়সে সব থেকে বেশি হয়। কিন্তু এখনকার শিশুরা মোবাইলের ছক বাঁধা জিনিস দেখতে দেখতে হারিয়ে ফেলছে বিস্ময়, মনে জাগছে না কোনও প্রশ্ন, ভাবনা শক্তি, চিন্তা শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

২. ক্ষতিকারক আসক্তি : মোবাইল ছোট ছোট শিশুদের মধ্যে সৃষ্টি করে এক মারাত্মক ক্ষতিকারক আসক্তির। যার ফলে তারা মোবাইল হাতে না পেলেই কান্নাকাটি করে, অশান্তি করে। মোবাইলের ভিতরে থাকা নানানরকম মোবাইল গেমস হলো এর অন্যতম কারণ। এই আসক্তির থেকে পড়াশোনায় ক্ষতি হয় বাচ্চাদের। ক্যারিয়ারের একদম শুরুর দিকেই এই ক্ষতি চিন্তার কারণ।

৩. স্থূলতা : সারাদিন মোবাইল হাতে বসে থাকার কারণে, কোনওরকম শারীরিক কসরত না হওয়ার কারণে বাচ্চারা একদম ছোট্ট থেকেই স্থূল হয়ে পড়ছে। এই স্থূলতা থেকেই শরীরে বাসা বাঁধছে বিভিন্ন ধরণের রোগ। যা ভবিষ্যতে মারাত্মক ক্ষতিকারক হতে পারে।

৪. সামাজিক অবস্থান : মোবাইলের আসক্তিতে বুঁদ হয়ে থাকলে মানুষ মোবাইলের ভিতরেই তৈরি করে নেয় নিজস্ব জগৎ। বাচ্চাদের বোধশক্তি সৃষ্টি হওয়ার আগেই মোবাইলের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি হলে তারা মোবাইলের ভিতরেই বানিয়ে নেয় নিজস্ব জগৎ। ফলত বাইরের দুনিয়ার মানুষের সাথে তার কোনও সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হয় না। সে মানুষের সাথে মিশতে পারে না, কারোর সাথে কথা বলতে চায় না, একলা একলা থাকে। যা ভবিষ্যতে তাকে ফাকে দিতে পারে গভীর অবসাদে।

৫. চরিত্রায়ন : মোবাইলের প্রতি আসক্তির ছাপ পড়ে শিশুদের চরিত্রে। তারা ছোট থেকেই ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহারের ফলে দেখতে পায় সেই সবকিছু যা তাদের হয়তো সেই বয়সে দেখা উচিত নয়। ফলত তারা এমন এমন কাজ করে যা তাদের সেই বয়সে করাই উচিত নয়। ফলত শিশুদের চরিত্রায়ন সেই ভাবে ঘটে না যেভাবে ঘটা উচিত। অল্প বয়সেই পেকে যাওয়া, খুব পাকা পাকা কথা বলো, অশ্রাব্য ভাষার ব্যাবহার করা, বড়দের জিনিসপত্র দেখা এবং জানা এসবের লক্ষ্মণ।

সমাধান :

বাড়ির ছোটদের সাথে একটু বেশি বেশি সময় কাটান। ওদের সাথে গল্প করুন, ওদের নিয়ে ঘুরতে বেরোন, ঘুম না এলে গান শোনান, বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিন, ওদের সাথে খেলুন, ওরা কাঁদলে ভোলান, খেলনা কিনে দিন, লজেন্স কিনে দিন। কিন্তু দোহাই সমস্ত বাবা-মা দের, ওদের হাতে মোবাইল তুলে দেবেন না। সময়ের অভাব থাকলে, সামলাতে না পারলে, ক্লান্ত থাকলে ওদের হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তি খুঁজবেন না। অন্য যে কোনও উপায়ের সন্ধান করুন, বাবা-মা হয়ে ওঠার আগে দশ বার ভাবুন আদেও বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করার যোগ্যতা অর্জন করেছেন কিনা! একটা প্রাণকে জগতের আলো দেখাতে চাইলে তার সঠিক দেখভাল, পরিচর্যা করার সিদ্ধান্ত নিন আগে।

লিখেছেন
Amit Pratihar
Amit Pratihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।