ভালোবাসা বলতে সোনা রুপোর গয়নার আর ডুয়ার্স, এক অজানা বাপ্পি লাহিড়ির খোঁজে…

একটা ঘোরের মধ্যে কেটে যেত সমস্ত সন্ধ্যা। পুজোর প্যাণ্ডেল থেকে সেই অবিস্মরণীয় ডাক। স্মৃতিযাপন অথবা প্রতিটি ব্যক্তিগত ভ্রমণে গাড়ির রেডিও বা অডিও প্লেয়ার থেকে ভেসে আসা ‘কভি আলভিদা না কহেনা’। কখনও কিশোর, কখনও শৈলেন্দ্র, কখনও একদম নিজস্ব গলা নিয়ে খোদ বাপ্পি লাহিড়ি। ধীরে ধীরে যুগের সঙ্গে বিনোদনের মাধ্যম ক্রমে বদলে গিয়ে টিভিতে এসে দাঁড়াল। শুধু অডিও তখন যথেষ্ট নয়। গানের সঙ্গে গায়কীর ভঙ্গীর যে স্বাদ বহুজনের ভিড়ে কোলাহলে ঢেকে যত তা এসে দাঁড়াল নিবিড়তম ঘরের কোনটিতে। শহরকেন্দ্রিক সংস্কৃতির চোটে অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক অঞ্চলেরা এইসব লাইভ অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ পেত হয়তো কয়েক বছরে একবার। টেলিভিশন তাদেরকেও উপভোগের সুযোগ করে দিল। ধীরে ধীরে এই পথেই উঠে এল রিয়েলিটি শো। সেখানেও গত দেড়-দু দশকে বিচারকের ভূমিকায় দেখা গেছে বাপ্পি লাহিড়িকে। কখনও কখনও আবার আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবেও। এই খুশিতে ‘ওয়াহ্‌ ওয়াহ্‌’ করছেন, তো এই গানে মুগ্ধ, দিয়ে ফেলছেন নিজের সোনার চেন উপহার। সোনা উপহারের ব্যাপারটা বাপ্পিদার নামের সঙ্গে বেশ জড়িয়ে গিয়েছিল।

বাপ্পি লাহিড়ির আইকনিক ইমেজ গঠনে এই সোনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সোনার গহনা তাঁর নিত্য-পরিধেয় ছিল। এবং এই উজ্জ্বল গহনার পাশাপাশি উজ্জ্বল জ্যাকেট। নিজস্ব এক ফ্যাশন স্টেটমেন্ট নির্মাণে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে এই জ্যাকেটও খুব জনপ্রিয় হয়। ব্যক্তিগত ভাবেও সোনা রুপো কিনতে ও পরতে খুব পছন্দ করতেন। গয়না জমাবারও শখ ছিল তাঁর। ২০১৪ সালে বিজেপির হয়ে শ্রীরামপুর লোকসভায় দাঁড়ান তিনি। সে সময় নির্বাচনী হলফনামায় তিনি জানিয়েছিলেন যে তাঁর কাছে ৭৫৪ গ্রাম সোনা এবং ৪ কেজি ৬২০ গ্রাম রুপোর গয়না রয়েছে। সে সময়কার বাজারদর হিসাবে সেই সোনার গয়নাগুলির মোট মূল্য ছিল প্রায় ৪০ লাখ টাকার। রূপোর গয়নাগুলির মূল্য ছিল প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকার। যদিও এ সাত আট বছর আগের কথা। এর পরেও সোনা সংগ্রহ করেছেন তিনি এবং তাঁর সোনার ও রুপোর গয়না সংগ্রহ যে বেড়েছিল অনেকটাই, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

অবশ্য বাপ্পিদার পরিবারেও সোনা এবং রূপোর গয়নার কেনা ও জমানোর নজির রয়েছে আরো। স্বয়ং বাপ্পিদার স্ত্রী চিত্রাণীরও সংগ্রহে রয়েছে বেশ কিছু গহনা। প্রসঙ্গত,  বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘লাল দরজা’র প্রযোজক ছিলেন চিত্রাণী। সিনেমাটি জাতীয় পুরস্কার পায়। বাপ্পি লাহিড়ির পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। ছোটবেলার বন্ধুত্ব দুজনের। প্রেম করে বিয়ে করেন একসময়। ‘প্যায়ার মাঙ্গা হ্যায় তুমহি সে’ গানটির মিউজ ছিলেন চিত্রাণীই। বাপ্পিদা অন্তত তেমনটিই জানিয়েছিলেন। চিত্রাণীর সোনার গয়নার পরিমাণ বাপ্পি লাহিড়ির থেকেও বেশি। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে ৯৬৭ গ্রাম সোনা। যার বর্তমান মূল্য ৪৯ লাখ টাকা প্রায়। রুপোর গয়না রয়েছে ৮ কিলো ৯০০ গ্রাম। এছাড়াও হিরের গয়নার শখ রয়েছে চিত্রাণীর। সে গয়নার মূল্যও প্রায় চার লাখ টাকা।

সোনার সঙ্গে বাপ্পিদার নাম ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। তবে সচরাসচর তাঁর সোনার গয়নার কথা যতটা জানে মানুষ, জানে না তাঁর গাড়ির শখের কথা ততটা। ভালো দামী গাড়ির শখও ছিল বাপ্পি লাহিড়ির। ২০১৪ সালের সেই নির্বাচনী হলফনামা থেকেই জানা যায়, সে সময় পাঁচটি গাড়ি ছিল তাঁর। সেগুলি যথাক্রমে একটি বি এম ডব্লিউ, যার মূল্য ৪২ লাখ টাকা; একটি অডি গাড়ি, যার মূল্য ৩২ লাখ টাকা; এছাড়াও একটি ফিয়াট গাড়ি, কুড়ি লাখ টাকা মূল্য সেটির। ছিল ষোল লাখের একটি সনেট গাড়ি, আট লাখের একটি স্করপিওও। তবে এই হিসেবের বাইরেও তাঁর নামে একটি স্বয়ংচালিত টেসলা এক্স গাড়িও ছিল বলে জানা যায়। সব মিলিয়ে বিলাসবহুল সুন্দর মডেলের গাড়ির ক্ষেত্রে বাপ্পিদার টেস্ট ছিল অত্যন্ত ভাল।

১৯৫২ সালের ২৭ নভেম্বর তৎকালীন বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ, অধুনা জলপাইগুড়ি অঞ্চলে জন্ম বাপ্পি লাহিড়ির। তবে কাজের সূত্রে কলকাতা থেকে মুম্বই—সারা জীবন তাঁকে থাকতে হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। তবে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগসূত্র বজায় ছিল তাঁর। শিল্পসমিতি পাড়ার বাগচি পরিবারের কাছে মাঝেসাঝে আসতেন বাপ্পিদা। উত্তরবঙ্গে থাকেন তাঁর ভাইপো ময়ূখও। ময়ুখের বয়ান অনুযায়ী একসঙ্গে বহুবার লাটাগুড়ি, মূর্তি নদী, জলদাপাড়া, গরুমারার জঙ্গল, কার্শিয়াং থেকে দার্জিলিং ঘুরতে গিয়েছেন তাঁরা। বাপ্পি লাহিড়ি শিকড়ের কাছে এলেই জল্পাইগুড়ির মানুষের অত্যন্ত পরিচিত সেইসব ভ্রমণে শামিল হতেন। উত্তরবঙ্গের তিস্তার মাছ খেতে পছন্দ করতেন খুব। বোম্বেতে এই সব মাছ খুব একটা পাওয়া যেত না। তাই ময়ূখ আগে থেকি মাছ আনতেন। ময়ূখের মা শঙ্করী চৌধুরী রাঁধতেন সেইসব মাছ। জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি অঞ্চলের নস্টালজিয়ার স্বাদ নিতেন বাপ্পি। কিন্তু এই অঞ্চলে তাঁর কোনও বাড়ি ছিল কিনা জানা যায় না। অবশ্য সমগ্র ভারতে বেসঞ্চলে তাঁর আদি বাসস্থান নিয়ে তেমন কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। বাড়ি ছিল কিনা, আদৌ সে বাড়ি এখন রয়েছে কিনা–উত্তর নেই। তবে বিভিন্ন স্থানে থাকার সূত্রে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কয়েকটি বাড়ি রয়েছে তাঁর। এর মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য হল বোম্বের বাড়িটি। ২০০১ সালে সাড়ে তিন কোটি টাকা দিয়ে বাড়িটি কেনেন বাপ্পি লাহিড়ি। শেষজীবনে থাকতেন এই বাড়িতেই।

More Articles

;