উত্তর থেকে দক্ষিণ, আজও মেলে জলের দরে, কলকাতার কচুরি মানচিত্রটা চিনতেই হবে

সে আপনি যতই বাঙালির টিফিন তালিকায় পিৎজা, বার্গার, স্যান্ডুইচ এর মতো বিদেশি খাবার আনুন কচুরির প্রতি বাঙালির দুর্বলতা কিন্তু অতি পুরোনো। তার কদর আজও কমেনি। বাঙালির সকালের আড্ডা থেকে অতিথি অ্যাপায়ন-- কচুরির ভূমিকা একই।

Ravhali Biswas
৪ মিনিট
উত্তর থেকে দক্ষিণ, আজও মেলে জলের দরে, কলকাতার কচুরি মানচিত্রটা চিনতেই হবে

কলকাতার খাবার নিয়ে কথা বলব আর কচুরির কথা উঠে আসবে না, এটা কেমন কথা হল? এমন তো হতেই পারে না। কলকাতায় ঘোরাঘুরি করে, স্মৃতি গুলো নাড়াঘাটা করে পেটে যখন ছুঁচো হাডুডু খেলছে তখন কিন্তু কম দামে হাতের সামনে কচুরি আপনার লাইফ সেভার। তাই তাকে একদম হেলাফেলা করা যায় না। সে আপনি যতই বাঙালির টিফিন তালিকায় পিৎজা, বার্গার, স্যান্ডুইচ এর মতো বিদেশি খাবার আনুন কচুরির প্রতি বাঙালির দুর্বলতা কিন্তু অতি পুরোনো। তার কদর আজও কমেনি। বাঙালির সকালের আড্ডা থেকে অতিথি অ্যাপায়ন-- কচুরির ভূমিকা একই।

তাই বলে কচুরিতে শুধু কলকাতার না সমগ্র ভারতের এক আলাদা দুর্বলতা আছে। ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন নামে এর পরিচিতি। কচুরির পূর্বপুরুষ হিসেবে পুরিকে ধরা হয়। দ্রাবিড়ীয় ভাষায় কচ্ছপুরি নাম থেকে কচুরি শব্দ এসেছে। কচুরির দুটি মূল উপাদান হল ময়দা আর ঘি। এবার কচুরিতে তো পুর থাকবেই। পুর হিসেবে অনেকে ডালবাটা, কেউ পেঁয়াজের, কেউ বা কড়াইশুঁটির পেস্ট দিয়ে তারপর তার সঙ্গে পছন্দসই মশলা দিয়ে কিছুটা কষিয়ে এক অসাধারণ পুর তৈরি করা হয়।

বাঙালিদের খাদ্যে বৈচিত্র থাকবে না তা কী করে হয়। প্রতিটি খাবার নিয়ে পরীক্ষানীরিক্ষা তাঁর ধাত। নিজদের পছন্দের পুর ভরতে ভালোবাসেন। যেমন এই ধরুন মাছের পুর। তারপর আরেকটি কচুরি যেটা খুব প্রচলিত তা হল ডালপুরি। এক্ষেত্রে মাসকলাই বা ছোলার ডাল বেটে একটু ভেজে নিয়ে পুর ভরে কচুরি আকারে ভেজে নিলে তার সাথে একটু মিষ্টি ছোলার ডাল। আহা! যেন অমৃত।

আরেকটি কচুরি যেটা বিকেলের দিকে মিষ্টির দোকানে পাওয়া যায়, তা হল খাস্তা কচুরি। খাস্তা কচুরিতে আবার ময়দার ময়ান বেশি দেওয়া হয় কারণ এই কচুরি ঢিমে আঁচে অনেকক্ষণ ধরে ভাজতে হয়। এই কচুরির অন্য আরেক ভাই হলেন রাজস্থানের পেঁয়াজ কি কচৌরি। সেখানে এই কচুরি ধনে পাতার চাটনি দিয়ে পরিবেশন করা হয়। কচুরি কাহন। এবার আসা যাক কোথায় গেলে এইসব লা জবাব কচুরি খাওয়া যাবে -

উত্তর কলকাতার কচুরিতে যেন আলাদা কিছু আছে। বাগবাজারের পটলার দোকানের কচুরির কথা কান পাতলেই শোনা যায়। প্রায় ১০০ বছর ধরে কচুরি বিক্রি করছে তারা। সেই একই স্বাদ আজও বজায় আছে। কোথাও একটু এদিক ওদিক নেই। সকাল হলেই দোকানের সামনে ভিড় হয়ে যায়। বাগবাজার স্ট্রিটের ওপর ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের ঠিক বিপরীতে এই দোকান। কাঁচের শোকেসের ওপারে বসে থাকে দিবেন্দু সেন, আর পটলা হল এর কাকা। কচুরি আর ছোট আলুর তরকারি শালপাতায় করে হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ে। দামও খুব বেশি নয় আট টাকা মাত্র, দুটো খেলেই পেট ভরে যাবে।

এরপরে সোজা চলে যান শ্যামবাজার মোড়ে, সেখানে রয়েছে হরিদাস মোদকের দোকান। কিন্তু সেখানে কচুরি না স্রেফ সাদা লুচি পাওয়া যায়। ২৫০ বছর ধরে আছে এই দোকান। এরপর চলে আসুন হাতিবাগানের দিকে ‘গদার কচুরি’ তে। এদের কচুরি আর সঙ্গে যে তরকারি দেয় তার মধ্যে যে কী অমৃত লুকিয়ে আছে ভগবান জানেন। কুমড়ো, আলু, সব সব্জির খোসা পাবেন আরও অনেক কিছু পাবেন কিন্তু মুখে দিলে মনে হবে যেন অমৃত খাচ্ছি।

নেক্সট গন্তব্য মানিকতলার সুখিয়া স্ট্রিট। সুখিয়া স্ট্রীটে ঢুকে বাঁ হাতে রয়েছে ‘গীতিকা’। গীতিকার কচুরি একটু ছোট ছোট এবং ভেতরে ঝুরঝুরে ডালের পুর ভরা থাকে। একটা ঠোঙায় করে কচুরি আর তার সাথে ঝোল আলুর তরকারি। দেখবেন আবার নিজে না খেয়ে জামাকে খাইয়ে দেবেন না যেন। এরপর গীতিকার ঠিক উল্টো দিকেই আছে ‘নন্দলাল সুইটস’। বিগত বহু বছর ধরে এর কচুরি কলকাতা বাসীকে এক আলাদা আনন্দ দিয়ে আসছে। এখানে কচুরির সাথে যে তরকারি দেওয়া হয় তাতে কড়া হিং এর গন্ধ পাবেন আর তার সাথে আপনার ভাগ্য ভালো থাকলে দু-একটা পনির পেলেও পেতে পারেন।

উত্তর তো অনেক হল চলুন একটু দক্ষিণে যাওয়া যাক। দক্ষিণ কলকাতার প্রথম দোকান ভবানীপুরের থানার উল্টোদিকে ‘শ্রীহরি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। এখানে ২ রকমের কচুরি হয় সকালে যেটা বিক্রি হয় তা হল ‘গুটকে কচুরি’, পাঁচটি ছোট কচুরি তার ভেতরে ডালের পুর এবং কড়া তেলে ভাজা আর সঙ্গে হালুয়া। এই গুটকে কচুরি সকাল সকাল গেলেই পাবেন কারণ ৮ টার পরে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এরপর এরা পরিবেশন করে মিষ্টি কচুরি আর ছোলার ডাল। আর তারও কী স্বাদ !

তারপর দেশপ্রিয় পার্ক থেকে সার্দার্ন অ্যাভিনিউয়ের দিকে গেলে দেখতে পাবেন ‘মহারাণী’। আর মহারাণীর খাবার খেতে গেলে লাইনে দাঁড়াতে হবেই সে আপনি রাজা হন কী সেপাই। তিল ধারণের জায়গা নেই। বহু বুভুক্ষু মানুষ দাঁড়িয়ে কচুরি খাচ্ছেন, জিলিপি খাচ্ছেন।

এরপর চলে আসুন নাখোদা মসজিদের পাশে। সেখানে কচুরির সঙ্গে বিখ্যাত নিহারি দেওয়া হয়। ভোর চারটে থেকে সেই কচুরি আর নিহারি বিক্রি শুরু হয় আর যতক্ষণ স্টক থাকে ততক্ষণই বিক্রি। সেখানে আবার কচুরির মধ্যে আদা, লঙ্কা কুচি দিয়ে কচুরিকে একটু ঝাল ঝাল করে দেওয়া হয়।

এই হল কলকাতার কচুরি ইতিহাস। অবশ্য এসব ছাড়াও পাড়ার মিষ্টির দোকানে গেলেই হরেক স্বাদের কচুরির দেখা পেয়ে যাবেন। কলকাতার কচুরির শত রূপ, কোথাও রাধাবল্লভি, কোথাও স্রেফ কচুরি আবার কোথাও ডালপুরি রূপে তার আবির্ভাব। স্বাদ কাছাকাছি, নাম আর পুরের রকমফেরে এ এক স্বর্গঅভিযান।

লিখেছেন
Ravhali Biswas
Ravhali Biswas
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।