'কায়স্থ,আমিষাশী'— স্বামীজিকে অপমান করতে কখনও পিছপা হয়নি বাঙালি

Sindhu Som
৭ মিনিট
'কায়স্থ,আমিষাশী'— স্বামীজিকে অপমান করতে কখনও পিছপা হয়নি বাঙালি

জন্ম আর মৃত্যু। একই সিক্কার দুটি পিঠ। মধ্যিখানে যেটুকু পড়ে থাকে তাই নিজের, তাই অর্জন। তবু বারেবারে দেখি জন্মদিনের গুরুত্ব যতখানি মৃত্যুদিনকে ততখানি গুরুত্ব দেয় না বাঙালি। অথচ কেউ কি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে জন্মায়? তার অর্জন, তার পরিচয় ‘মৃত্যুহীন প্রাণ’ হয়ে রয়ে যায় আমাদের ভাবনার অলিতে গলিতে। শিলং-এ স্বামীজি তখন প্রচণ্ড অসুস্থ। ডায়াবেটিসের সঙ্গে বেড়ে গিয়েছে হাঁপানি। টান উঠলে ভরসা কতগুলো বালিশ মাত্র। বুকে ঠেসে ধরে সেই প্রবল যন্ত্রণা সহ্য করতেন। অথচ তখনও স্বগতোক্তি করছেন, “যাক, যদি মৃত্যুই হয় তাতেই বা কী এসে যায়? যা দিয়ে গেলুম দেড় হাজার বছরের খোরাক।” বিবেকানন্দ ভুল বলেননি, বাঙালি কতটা তাঁকে আত্মস্থ করেছে, কতটা সম্মান দিতে পেরেছে, সেই প্রশ্নটা অবশ্য থেকেই যায়।

৩৯ বছর ৫ মাস ২৪ দিন। সাকুল্যে এই জীবন। এর মধ্যে স্বামীজিকে ঘিরে ধরেছে প্রায় বত্রিশটি রোগ। তোয়াক্কা করেননি। দিনের পর দিন অনাহারে, অর্ধাহারে কাটাবার মাশুল তো কিছু হয়। এই দেশ কর গুনে মানুষটার কাছে সেই মাশুল আদায় করেছে কড়ায় গণ্ডায়। বাবারও ডায়াবেটিস হয় অল্প বয়সেই। দুই ভাই মহেন্দ্র ও ভূপেন্দ্ররও এই রোগ ছিল। বিশ্বনাথ দত্ত বাহান্নও পেরোতে পারেননি, স্ট্রোক হয়েছিল। রাত নটা নাগাদ খাবার পরে তামাক খাচ্ছিলেন আয়েশ করে। হঠাৎ বমি। তারপরেই হৃদযন্ত্র বন্ধ। কাজেই রোগের খানিকটা পারিবারিক তো বটেই। তার উপরে যোগ হয়েছিল হাড়ভাঙ্গা অক্লান্ত খাটনি। তিলে তিলে মঠের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। নিজের শরীরকে অবহেলা করতে করতে একসময় পেটের অসুখ হয়ে গিয়েছিল নিত্যসঙ্গী। এই জ্বালায় ট্রেনে 'নীচু' ক্লাসে যাতায়াত অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। কেউ ট্রেনের টিকিট দয়া করে কেটে দিতে চাইলে, তাকে অনুরোধ করতেন সেকেণ্ড ক্লাসের টিকিট কেটে দেবার। ততদিনে শরীরে ক্ষয় ধরেছে।

সারদানন্দ লন্ডনে গেলে স্বামীজি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হ্যাঁরে, দেশের লোকগুলো এত শীঘ্র মরে যায় কেন? যার কথা জিগ্যেস করি, খবর নেই, সে মারা গেছে। জাতটা কি মরে বিলোপ পেয়ে যাবে নাকি?...ওরা যে দুখচেটে খায়, তাতে এত শীঘ্র মরে যায়। ওদের খাওয়াটা বদলে দেওয়া দরকার। আমেরিকাতে যখন ছিলুম, তখন কয়েক বৎসরের ভিতর কোনো ব্যামো হয় নাই। কয়েকদিন সামান্য সর্দিকাশি হয়েছিল। ভূতের মতো পরিশ্রম করেছি, তাতে কিন্তু শরীর খারাপ হয় নাই।” এই পর্যায়ে নিজের চিন্তার সঙ্গে এক হয়ে মিশে যাচ্ছে দেশের চিন্তা। শরীর ঈষৎ দুর্বলই। কিন্তু কী ভাবে দেশের অভাবী লোকেদের বাঁচানো যায়, ভেবে চলেছেন সেই কথা। স্বামীজি কি বুঝে গিয়েছিলেন তিনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না?

১৮৯৬-তে আমেরিকা থেকে তখন দ্বিতীয় বার লন্ডনে এসেছেন। ভাই মহেন্দ্রনাথ ও অনুরাগী পিয়ার ফক্সকে নিয়ে বসেছেন দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে। এমন সময় সুতীব্র যন্ত্রণায় মুখ বেঁকে গেল। ওই অবস্থাতেই অসে থাকলেন কিছুক্ষণ। পরে খানিকটা সামলে নিয়ে ফক্সকে বললেন, “দেখ ফক্স, আমার প্রায় হার্ট ফেল করেছিল। আমার বাবা এই রোগে মারা গেছেন, বুকটায় বড় যন্ত্রণা হচ্ছিল, এইটা আমাদের বংশের রোগ।” সম্ভবত এইটেই প্রথম অ্যাটাক। বড়সড় অসুখের ইঙ্গিত। তখন বয়েস মাত্র ৩৩ বছর।

১৮৯৮ সালে অমরনাথ তীর্থ দর্শনে গিয়ে পাহাড় ভাঙার প্রচণ্ড ধকলে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এই সময় ডাক্তার সাবধান করছেন, ওঁর হার্ট বন্ধ হয়ে যেতে পারত। হার্টের আকার নাকি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গিয়েছে। বেলুড়ে ফিরলেন। শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী যখন দেখা করতে গেলেন, তখন বাঁ চোখটায় রক্ত জমে লাল হয়ে রয়েছে। পরের দিকে ডান চোখটা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

এরপরে যে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার আবছা আভাস ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তা মিশরে। বিখ্যাত ফরাসি গায়িকা মাদাম আমা কালভ একবার সুইসাইড করার চেষ্টা করেছিলেন। বিবেকানন্দ একরকম তাঁকে নতুন জীবনে উদ্বুদ্ধ করেন। তাই গায়িকা স্বামীজিকে তাঁর অতিথি হয়ে ওরিয়েণ্ট এক্সপ্রেসে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান। যাত্রা শুরু হচ্ছে ১৯০০ সালের ২৪শে অক্টোবর। এই সময় খুব সম্ভবত কায়রোতে কিছু একটা বিপদ ঘটেছিল। ছোটভাই ভূপেন্দ্রনাথের খুব কাছের বন্ধু রঞ্জিত সাহা, যিনি পরবর্তীতে তাঁর প্রকাশকও হবেন, এমন কথা শুনেছিলেন যে স্বামীজিকে কায়রোতে সামান্য সময়ের জন্য বোধহয় হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছিল। কিন্তু রঞ্জিতবাবুর আকস্মিক মৃত্যুতে বিষয়টি ঘোলাটেই রয়ে গিয়েছে। কিন্তু বান্ধবী সারা বুলকে এই সময় মিস ম্যাকলাউড একটা চিঠির ফুটনোটে লিখছেন, “স্বামীজির খবর ভালো নয়। তাঁর আর একটা হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল।” সেক্ষেত্রে মহাসমাধির দিন স্বামীজির তৃতীয়বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল।

সেই বছরই আচমকা বেলুড়ে ফিরলেন। দিনটা ৯ই ডিসেম্বর, রবিবার। একটা গাড়ি ভাড়া করে মঠে যখন পৌঁছলেন তখন সন্ন্যাসীদের সান্ধ্য আহার শুরু হয় হয়। কেউ জানেই না স্বামীজি আসছেন। মঠের গেটে পৌঁছে ডিনারের ঘণ্টা শুনে বিবেকানন্দ আর হাঁকডাক করে গেট খোলার অপেক্ষা করেননি। মালপত্তর নিয়ে সে সাহেবী পোষাক সমেত দেওয়াল টপকে সোজা চলে এলেন ভোজনের আসরে। সবাই হতবাক। সবাইকে অমন থমকে যেতে দেখে হো হো করে হেসে উঠলেন স্বামীজি, “তোদের খাবার ঘণ্টা শুনেই ভাবলুম, এই যাঃ, এখনই না গেলে হয়তো সব সাবাড় হয়ে যাবে, তাই দেরি করলাম না।” খুশিতে হই হই করে খিচুড়ি খাওয়া শুরু হল। মন প্রাণ ভরে যখন খিচুড়ি খেলেন তখনও কেউ জানেন না কেন এইভাবে তড়িঘড়ি পর আত্মীয়দের কাছে ফিরে আসা। সেই দিনই রাতের বেলা চিঠিতে খেতড়ির নরেশকে লিখছেন, “আমার হার্ট খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে।…আমার মনে হচ্ছে, এজীবনে যা করার ছিল তা শেষ হয়েছে।”

বছর দু'তিনেক আগেও যে আশা স্বামীজির ছিল, এই সময় ধীরে ধীরে তাও অস্তগামী। বাহ্যিক আচরণে তখনও কেউ বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারছেন না। এমনই সহ্য ক্ষমতা সে মানুষের। কিন্তু চিঠির নিভৃততম কোণটিতে অথবা খুব কাছের মানুষদের সঙ্গে কথা বলার সময় সেই আক্ষেপ ফুটে বেরোচ্ছে। কখনও আক্ষেপ, কখনও অর্জনের তৃপ্তি। এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব চলছে অহর্নিশ। একদিকে অপূর্ণতা, অপর দিকে পূর্ণতার বুনন তখন তুঙ্গে। অগাস্ট মাসে স্বামী তুরীয়ানন্দকে লিখছেন, “আমার কাজ আমি করে দিয়েছি বস্‌। গুরু মহারাজের কাছে আমি ঋণী ছিলাম–প্রাণ বার করে আমি শোধ দিয়েছি। সে কথা তোমায় কি বলব?” আবার এই মাসেই ফক্সকে জানাচ্ছেন, “আমার শরীর দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে। মহিমকে, মাকে এবং সংসারকে দেখার ভার নেবার জন্য তৈরি হতে হবে। আমি যে কোনও সময়ে চলে যেতে পারি।” সেই বছরই ডিসেম্বরে মায়াবতীতে বসে বিরজানন্দকে বলছেন, “শরীরটাকে বেজায় কষ্ট দিয়েছি, তার ফল হয়েছে কি? না জীবনের যেটি সবচেয়ে ভালো সময় সেখানটায় শরীর গেল ভেঙে।”

পরের মাসে পাচ্ছি, “মঠে যে-মুহূর্তে পদার্পণ করি, তখনি আমার হাঁপানির কষ্টটা ফিরে আসে, এ স্থান ছাড়লেই আবার সুস্থ।” কী চরম কষ্টের মধ্যে দিয়ে মানুষটা যাচ্ছেন তখন তা লেখায় কথায় সর্বত্র ফুটে উঠছে। ধীরে ধীরে পরিবর্তন অনুভব করছেন মঠের লোকজন। মার্চ মাসে যাচ্ছেন ঢাকায়। এক বারাঙ্গনা প্রবল অসুস্থ। থেকেই হাঁপানির টান উঠছে। নির্জীব হয়েছিলেন। স্বামীজি আসার কথা শুনে গেলেন তাঁর কাছে। রোগ নিরাময়ের দাওয়া মাধুকরী চাইলেন। স্বামীজির চোখে জল। সস্নেহে বলছেন, “এই দেখ মা! আমি নিজেই হাঁপানির যন্ত্রনায় অস্থির। যদি আরোগ্য করার ক্ষমতা থাকত তাহলে কি আর এই দশা হয়!” বারাঙ্গনা, যে সমাজের অচ্ছুত, তাঁকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করছেন একজন সন্ন্যাসী। নিজের হাঁপানির থেকে অপরের ব্যথা নিবারণে অপারগতার যন্ত্রণা তাঁর বেশি হয়ে উঠছে।

অ্যালবুমিন ইউরিয়া সমানে ভুগিয়ে চলেছে। এমন সর্দিকাশি হচ্ছে যে বিছানা ছেড়ে উঠতে পর্যন্ত পারছেন না। ডান চোখ তখন সম্পূর্ণ অকেজো। সেই চোখ দেখাতে কলকাতাও যাওয়া হচ্ছে না তাঁর। আরেকটি রোগে তখন পা আঁকড়ে ধরেছে। ড্রপসি। তার প্রকোপ যখন বাড়ে তখন হাঁটা চলাও করতে পারেন না। কম থাকলে মঠের মধ্যে ঘুরে বেড়ান। কখনও পরনে থাকে শুধুমাত্র কৌপিন, কখনও দীর্ঘ আলখাল্লায় শরীর ঢেকে পাড়ার অলিতে গলিতে ভ্রমণ করেন। কাছের লোকেদের যন্ত্রণা দিয়ে ফেলছেন, বকে ফেলছেন খুব রূঢ়ভাবে যখন তখন—সেই গ্লানি তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে। মানুষের সংস্রব থেকে একটু দূরে সরে আসছেন এ সময়। চিনেহাঁস, রাজহাঁস, পাতিহাঁস, ছাগল, ভেড়া, পায়রা আর গরু পুষছেন মঠে এই সময়। হরিণ, বেড়াল, সারস ও কুকুরও জুটছে ধীরে ধীরে। একে একে নাম দিচ্ছেন সবার। এদের নিয়েই কেটে যাচ্ছে সময়। মটরু নামের ছাগলছানার গলায় স্বামীজি ঘণ্টা বেঁধে দিয়েছিলেন। সে ঘুরত পায়ে পায়ে। বলতেন, “মটরু নিশ্চয় আর জন্মে আমার কেউ হত!” মহাসমাধির মাসখানেক মাত্র আগে সেও মাছের চৌবাচ্চায় ডুবে মারা যাচ্ছে। অত্যন্ত একা তখন স্বামীজি। “কী আশ্চর্য, আমি যেটাকে একটু আদর করতে যাই, সেটাই যায় মরে।” বৈরাগ্যের উদাসীনতার মাঝেও পশুপালনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে চাষবাষ এবং বাগান। প্রিয় কুকুর বাঘা এই সময়টায় সঙ্গে সঙ্গে থাকত।

১৯০২-এর ৭ই এপ্রিল কবিরাজ রোগী দেখে মাছ, তেল ও নুন খেতে অনুমতি দিলেন। এই সময়েই জোসেফিন ম্যাকলাউডকে জানাচ্ছেন তাঁর নিজের বলতে এক কানাকড়িও নেই। যে যখন যাইই দিয়েছেন স্বামীজি সব বিলিয়ে দিয়েছেন। ৩শরা জুলাই নিবেদিতার বাগবাজারের বাড়িতে নিজের তৈরি ব্রাউন ব্রেড পাঠাচ্ছেন লোক দিয়ে। পরের দিন শুক্রবার। অসুস্থতার বিন্দুমাত্রও লক্ষণ নেই। ঘুম থেকে উঠেই উপাসনায় বসলেন মন্দিরে। সকলের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করছেন। গরম দুধ, ফল খাচ্ছেন রোজের মতোই। পুব দেশের এক শিষ্যের সঙ্গে রসিকতা করে বললেন, “তোরা নতুন ইলিশ পেলে নাকি পুজো করিস? কী দিয়ে পুজো করতে হয় কর।” গঙ্গার একটি ইলিশ সে বছরে সেই দিনই প্রথম কিনে আনা হয়েছিল। তার দাম নিয়েও সামী প্রেমানন্দের সঙ্গে কিঞ্চিৎ ঠাট্টা তামাশাও হয়েছে। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ ধ্যানে বসলেন ঠাকুরের শয়নঘরে। ধ্যান শেষ করে ঠাকুরের বিছানা নিজের হাতে ঝেড়ে দিলেন। গুনগুন করে তখন গাইছেন ‘মা কি আমার কালো, কালোরূপা এলোকেশী, হৃদিপদ্ম করে আলো’। সাড়ে এগারটা নাগাদ সকলের সঙ্গে ইলিশ দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজন করলেন। শুধু জানা যাচ্ছে ধ্যান করে মাথা ধরেছিল বেশ। আর কিচ্ছুটি না। সুস্থ সবল ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বেলুড়ের বাজার অবধি গেলেন প্রেমানন্দকে সঙ্গে নিয়ে। প্রায় দু'মাইল মঠ থেকে। ইদানিং এতদূরে যেতেন না কোথাও। সন্ধে সাতটা নাগাদ সুস্থ মানুষটা ব্রজেন্দ্রর কাছ থেকে দুটছড়া মালা চেয়ে নিয়ে নিজের ঘরে দক্ষিনেশ্বরের দিকে মুখ করে জপে বসলেন। পৌনে একঘণ্টা জপের পর বললেন গরম লাগছে, জানলা খুলে দেওয়া হল। ব্রজেন্দ্র বাতাস করছিল।

খানিক পরে বললেন, “আর বাতাস করতে হবে না, একটু পা টিপে দে।” ঘণ্টা খানিক এমন চলল। চিত হয়ে শুয়েছিলেন, হঠাৎ বাঁ পাশে ফিরলেন। ডান হাত তখন কাঁপছে। মাথায় ঘামের ফোঁটা। সঙ্গে শিশুর মতন কান্না। ধীরে ধীরে শ্বাস উঠল। মিনিট দশেকের মাথায় বালিশ থেকে মাথা পড়ে গেল। বোধানন কিছুক্ষণ নাড়ি দেখে কেঁদে ফেললেন। মহেন্দ্র ডাক্তারকে ডাকা হল। ডাক্তার মজুমদার তখন বরানগরে নদীর ওপারে থাকেন। ব্রহ্মানন্দ, সারদানন্দ এবং ডাক্তার মজুমদারের মঠে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গেল। বেশ কিছুক্ষণ হার্ট সচল করার চেষ্টা করার পর রাত বারোটা নাগাদ ডাক্তার স্বামীজিকে মৃত ঘোষণা করল।

একে কায়স্থ। তায় আমিষ খাওয়া সন্ন্যাসী। সমগ্র জীবনের চরাচর জুড়ে অপমানিত কম হতে হয়নি বিবেকানন্দকে। মৃত্যুর পরেও এই দেশ তাঁকে অবহেলা অপমান ছাঁদা বেঁধে দিয়েছে। চিঠির পর চিঠি লিখে মিউনিসিপ্যালটির অনুমতি পাওয়া যায়নি। অনেমতি মেলে বেশ দেরিতে। কোনও ডেথ সার্টিফিকেট মেলে না। কলকাতার কোনও সংবাদপত্রে পাঁচ তারিখ সেই মৃত্যুর খবর বেরলো না। স্মরণসভায় বক্তব্য রাখার অনুরোধ খুব বাজেভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সেকালের হাইকোর্টের দুজন জজ। একজন তো মন্তব্যই করেছিলেন, “হিন্দু রাজা দেশ শাসন করলে বিবেকানন্দকে ফাঁসি দেওয়া হত”। এমন বহু রয়েছে। দিনের পর দিন নিজের শরীরটুকুও যিনি যে দেশের সাধারণ মানুষের কাজে শেষ করে ফেললেন, সেই দেশ পরিবর্তে তাঁর মনে দিয়েছে শুধুই হতাশা। বিদ্যাসাগর, রামমোহন, বিবেকানন্দ-বাঙালি বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। আজ আমাদের লজ্জায় অবনত হওয়ার দিনও বটে।

তথ্যঋণ-

অচেনা অজান বিবেকানন্দ–শংকর

অবিশ্বাস্য বিবেকানন্দ–শংকর

শ্রীমৎ বিবেকানন্দ স্বামীজির জীবনের ঘটনাবলী, তিন খণ্ড, শ্রীমহেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত, শ্রীবসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।