প্রকৃতির প্রতিশোধ! পুড়ছে লন্ডন, ইওরোপ জুড়ে আতঙ্ক, ধ্বংসের মুখোমুখি পশ্চিমী সভ্যতা?
এটা সবে শুরু। গোটা বিশ্বে আসতে আসতে তীব্র হতে থাকবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপ। ধ্বংস হয়ে যাবে কোটি কোটি অরিত্রাদের স্বপ্ন, ধ্বংস হয়ে যাবে আগামী প্রজন্ম।

অরিত্রার অনেক দিনের স্বপ্ন অবশেষে পূরণ হয়েছে। অবশেষে লন্ডনের ভারতীয় বিদ্যাভবন ওকে ডেকে পাঠিয়েছে। এর আগে তিন সপ্তাহ ইংল্যান্ডে কাটালেও এই বার সে সুযোগ পেয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কাজের। অরিত্রা শুধুমাত্র সভ্যতার এই পীঠস্থানে অসাধারণ কেরিয়ার করতে চায় তা নয়, ছোট থেকেই কলকাতার গরম সহ্য করতে পারত না ও। খুব কষ্ট হত। তখন থেকেই সে ভেবে রেখেছিল, থিতু হবে ইউরোপে।
কিন্তু স্বপ্নপূরণের মাত্র সাতদিন পরেই জীবন এইরকম বিভীষিকা হয়ে উঠবে সেটা সে দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। ইংল্যান্ডে যা আগে কখনও হয়নি আজ তা হচ্ছে। সব থেকে চিন্তার বিষয় হলো, এই বিপর্যয়ের জন্যে দেশে বিশেষ পরিকাঠামো প্রস্তুত নয়। কারণ কেউ কখনো ভাবেইনি এমন কিছু হতে পারে।
অরিত্রা কাল্পনিক চরিত্র, কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপর্যয়ের কাহিনি একেবারেই কাল্পনিক নয়। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে এতক্ষণে নিশ্চয়ই আপনারা জেনেও গিয়েছেন। বিমানবন্দরে রানওয়ে গলে যাচ্ছে, একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ঘটছে, মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, ট্র্যাফিক সিগন্যাল গলে যাচ্ছে, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা নিজে থেকে চালু হয়ে যাচ্ছে। কারণ? গত কয়েকদিন ধরে চলা তাপপ্রবাহ। এমন তপ্ত আগে কখনও হয়নি ইংল্যান্ডের মাটি। ইংল্যান্ড একদা যে সব দেশে রাজত্ব করেছে, তাদের কাছে গ্রীষ্মকালে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস জলভাত। কিন্তু নিজেদের দেশে? নাহ, আগে কখনো হয়নি। লন্ডন কলকাতা হয়ে যায়নি। কলকাতায় আজ নিম্ন মধ্যবিত্তের বাড়িতেও এসি আছে, কিন্তু লন্ডনে চিত্রটা একদম উল্টো। সত্যিই এসি, পাখা কিছু নেই বেশিরভাগ মানুষের বাড়িতে। রাস্তাঘাট, রেল লাইন ও তৈরি করার সময়ে তারা ভাবেননি যে, যে বিশ্ব উষ্ণায়নে তাদের এত অবদান, সেই বিশ্ব উষ্ণায়নের রোষে এত তাড়াতাড়ি তারা জ্বলে পুড়ে যাবেন।
'এত তাড়াতাড়ি'- এই শব্দবন্ধ লিখলাম, কারণ মাত্র দু'বছর আগে ইংল্যান্ডের হাওয়া অফিস একটি পূর্বাভাস দিয়েছিল। বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং তার ফলে ঘটা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালে ইংল্যান্ড তথা গ্রেট ব্রিটেনের তাপমাত্রা কোথায় পৌঁছাতে পারে। সেই পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের গ্রীষ্মে লন্ডনের তাপমাত্রা হবে ৪০°, ইংল্যান্ডের অন্য শহর ম্যাঞ্চেস্টারের তাপমাত্রা গিয়ে দাঁড়াবে ৩৯°, সাউদাম্পটনে হবে ৪৩°, স্কটল্যান্ডের রাজধানী গ্লাসগোতে হবে ৩৮°, নর্দান আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্টে ৩২°।
এই পূর্বাভাস নিয়ে বিজ্ঞানী, আবহাওয়াবিদ এবং পরিবেশবিদদের মধ্যে হইচই পড়ে যায়, যদিও সাধারণ মানুষ খুব একটা পাত্তা দেননি। তিরিশ বছর পরের বিপর্যয় নিয়ে ভাবার সময় কারই বা আছে? তবুও অনেক কথা হয়, ব্রিটিশ সরকার তাদের নেট জিরোর লক্ষ্য নিয়ে আর একটু বেশি তৎপরতা দেখান, খাতায় কলমে, কিন্তু দেখান।
তারপর মাত্র দুই বছর কেটেছে। ২০৫০ সালে তাপমাত্রা যে জায়গায় পৌঁছানোর দাবি করেছিলেন আবহাওয়াবিদরা, ২০২২ সালেই সেই স্থানে উঠে গেছে পারদের মাত্রা। ২৪ বছর আগে। বিভিন্ন স্থান থেকে খবর আসছে অগ্নিকাণ্ডের, দাবানলের। প্রশাসন আশঙ্কা করছে বহু মৃত্যুর।
এত গেল শুধু মাত্র ইংল্যান্ডের খবর। ইউরোপের অন্যান্য প্রান্তের অবস্থা আরও ভয়াবহ এই মুহূর্তে। দাবানলে পুড়ছে ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস, পর্তুগালের মত দেশ। ফ্রান্সে গ্রাম, শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অধিবাসীরা। তাপপ্রবাহ এবং তার শুস্ক হাওয়ার ফলে ঘটতে থাকা এই দাবানলে নাভিশ্বাস উঠেছে এই দেশগুলির মানুষের।
গত কয়েক দিনে ফ্রান্সের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের একটি এলাকা থেকে প্রায় দশ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে। ফ্রান্সের কিছু অংশ বিপর্যয়মূলক উষ্ণতার মুখোমুখি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, দেশের কিছু স্থান ইতিমধ্যেই তাদের সবচেয়ে উষ্ণতম দিনগুলি পার করেছে এবং নতুন রেকর্ড গড়েছে। স্পেন, পর্তুগালে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে। তাপপ্রবাহে এখনও পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় তিনশো জন। স্পেনের পশ্চিমাঞ্চল থেকেও এই কারণে অনেক মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে।
পর্তুগালের পাঁচ জায়গায় জারি হয়েছিল রেড অ্যালার্ট। তীব্র গরম এবং তার সাথে যোগ হয়েছে দাবানল। প্রায় ১৭ টি দাবানল একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়েছে তাদের গত কয়েকদিনে। এই দেশের কোনো এক স্থানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছুঁয়েছে ৪৭°।
একই বিপদের সম্মুখীন ইতালি, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া। তাপপ্রবাহের কারণে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে সেই সব দেশে। হেক্টরের পর হেক্টর জমি, জঙ্গল, বাড়িঘর সব ভষ্মীভূত।
তবে এই বিপর্যয়ের কারণ আর কোনো রহস্যের চাদরে ঢাকা পড়ে নেই। লা-নিনা বা নিম্নচাপের উত্তর আফ্রিকার উষ্ণ হাওয়া টেনে আনা গ্রীষ্মকালে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এই ভাবে রেকর্ড ভাঙতে থাকা? এটা গত তিন-চার বছর হল শুরু হয়েছে এবং প্রত্যেক বছরই একটু একটু করে তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২২-এই একশো, দুশো বছরের রেকর্ড ভেঙে গেছে বহু জায়গায়। বিজ্ঞানীরা বলেই দিচ্ছেন, যে জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়। বিপদ আর দরজায় কড়াও নাড়ছে না। বিপদ ঘরে ঢুকে পড়েছে। যদিও কিছু মানুষ বলছেন, বিপদ অনেক আগেই ঘরে ঢুকে পড়েছিল, প্রথম বিশ্বে এই রকম হানা দেওয়ায় এখন তা মানুষের এত চোখে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে কোথায় যাবে মানুষ? একটা বিষয় খুব স্পষ্ট। এটা সবে শুরু। গোটা বিশ্বে আসতে আসতে তীব্র হতে থাকবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপ। ধ্বংস হয়ে যাবে কোটি কোটি অরিত্রাদের স্বপ্ন, ধ্বংস হয়ে যাবে আগামী প্রজন্ম। প্রত্যেক বছর একটু একটু করে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়বে, বাতাস আরও শুষ্ক হবে, আরও দাবানল হবে। শেষ হয়ে যাবে হাজার হাজার জঙ্গল। সেই সঙ্গে পৃথিবীর শক্তিশালী দেশ গুলি যুদ্ধ করবে, শক্তির উৎসের ঘাটতি দেখা দেবে, দেখা দেবে খাদ্যশস্যের ঘাটতি।
এর থেকে পরিত্রাণ কি নেই? আছে। এখনও সময় আছে ঘুরে দাঁড়ানোর। হ্যাঁ, তাপপ্রবাহ হলে গৃহ ছেড়ে বেরোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়, কিন্তু নিজের কন্ঠ এবার সব সাধারণ মানুষকে নিজের প্রয়োজনেই ছাড়তে হবে। এটাই শ্রেষ্ঠ সময়, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে একটু একটু করে নির্ভরতা কমানোর।
পৃথিবীর সমস্ত দেশের সরকার একজোট হয়ে এই মুহূর্তে কোনো ব্যবস্থা যদি না নেয়, তাহলে শেষের দিন হয়েতো আসন্ন। যে সভ্যতার এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে পড়ার কথা, Interplanetary Specie হওয়ার কথা, তারা নিজেদের দোষে, প্রকৃতির সর্বনাশ করে তার পর প্রকৃতিরই প্রত্যাঘাতে শেষ হয়ে যাবে।
















