লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে কেন ৫০০-র বেশি মানুষ গ্রেফতার?
UK Crackdown on Palestine Action Protest: লন্ডনে ফিলিস্তিন সমর্থনে বিক্ষোভ করতেই ৫০০-র বেশি মানুষ গ্রেফতার কেন? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি তবে আইনের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে?
লন্ডনের রাস্তায় এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে প্রতিবাদের স্লোগান—কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই প্রতিবাদ পরিণত হলো গণগ্রেফতারে। যুক্তরাজ্যে 'Palestine Action' নামে একটি সংগঠনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবার নতুন মাত্রা পেল, শত শত মানুষকে গ্রেফতার করল পুলিশ। ঘটনাটি নাগরিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত মূলত একটি সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার 'Palestine Action' সংগঠনটিকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে এই সংগঠনের প্রতি সমর্থন জানানো, সদস্য হওয়া বা তাদের কার্যকলাপকে সমর্থন করা—সবই আইনের চোখে অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকী শুধু প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে সমর্থন জানানোও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যার শাস্তি দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। মানবাধিকার কর্মী এবং নাগরিক সমাজের একাংশ মনে করেন, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন ব্রিটেনের হাই কোর্ট এই নিষেধাজ্ঞাকে 'অসামঞ্জস্যপূর্ণ' এবং আইনের পরিপন্থী বলে রায় দেয়।
তবে এখানেই শেষ নয়। সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে, এবং আপিল চলাকালীন নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। ফলে আইনি দৃষ্টিতে সংগঠনটির প্রতি সমর্থন জানানো তখনও অপরাধ হিসেবেই গণ্য হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিই পরবর্তী সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Iran-US Peace Talks: ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার বৈঠকেও কেন ভেঙে গেল ইরান-আমেরিকা শান্তি আলোচনা? ইউরেনিয়াম ইস্যু, নিষেধাজ্ঞা নাকি আঞ্চলিক প্রভাব—কোন মতভেদ সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল?
এই প্রেক্ষাপটেই লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে একটি বড় প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। 'Defend Our Juries' নামে একটি সংগঠন এই কর্মসূচির ডাক দেয়। তাদের দাবি ছিল, Palestine Action-এর উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তা প্রত্যাহার করতে হবে।
প্রতিবাদে অংশ নিতে শত শত মানুষ জড়ো হন। কেউ প্ল্যাকার্ডে লিখেছেন, “I oppose genocide. I support Palestine Action”—আবার কেউ শান্তিপূর্ণভাবে বসে বা দাঁড়িয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করেন। এটি ছিল একটি অহিংস গণপ্রতিবাদ, যেখানে মানুষ কেবল তাদের মতামত প্রকাশ করছিলেন। কিন্তু পুলিশ এই প্রতিবাদকে ভিন্নভাবে দেখেছিল। ব্রিটিশ আইনের বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী, Palestine Action-এর প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানানো বেআইনি। সেই কারণেই মেট্রোপলিটন পুলিশ ব্যাপক হারে গ্রেফতার অভিযান চালায়। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ঘটনায় ৫০০-রও বেশি মানুষকে আটক করা হয়।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন ১৮ বছর থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বেশি বয়সী মানুষও। অনেককে পুলিশ সরাসরি কাঁধে তুলে বা টেনে নিয়ে যায়। এমনকী লাঠি ভর দিয়ে হাঁটা এক বৃদ্ধাকেও গ্রেফতার করা হয়, এই নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলি বলছে, এটি গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত। তাদের মতে, একটি আদালত যখন নিষেধাজ্ঞাকে বেআইনি বলে ঘোষণা করেছে, তখন সেই নিষেধাজ্ঞার ভিত্তিতে মানুষকে গ্রেফতার করা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Donald Trump: ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও কখনও সফল হয়নি। তিনি ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন, যা প্যালেস্টাইনিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে পুলিশ এবং সরকারের যুক্তি ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, যতক্ষণ না আপিলের চূড়ান্ত রায় আসছে, ততক্ষণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। ফলে আইন ভাঙার অভিযোগে গ্রেফতার করাই তাদের কর্তব্য।
এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভাজন তৈরি করেছে। একদল মনে করেন, আইন ভাঙা হলে পুলিশ ব্যবস্থা নিতেই পারে। অন্যদিকে অনেকেই মনে করছেন, এটি আসলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করার একটি কৌশল।
প্রতিবাদে অংশ নেওয়া অনেকেই সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, যদি একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ানোও অপরাধ হয়ে যায়, তাহলে তা নাগরিক স্বাধীনতার জন্য বড় বিপদ।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পুলিশের অবস্থান পরিবর্তন। হাই কোর্টের রায়ের পর প্রথমে পুলিশ জানিয়েছিল, তারা আর গ্রেফতার করবে না। কিন্তু পরে মার্চ মাসে তারা সেই অবস্থান থেকে সরে এসে আবার গ্রেফতার শুরু করে। এই ‘ইউ-টার্ন’ নিয়েও তীব্র সমালোচনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি কেবল একটি সংগঠনকে কেন্দ্র করে নয়, এটি বৃহত্তর একটি প্রশ্নের প্রতিফলন। একটি রাষ্ট্র কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে? নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকার কোথায় শেষ হয়? এবং নিরাপত্তার নামে কতটা স্বাধীনতা সীমিত করা যায়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এটা নিশ্চিত, লন্ডনের এই গণগ্রেফতার ব্রিটেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
আগামী দিনে এই মামলার আপিল শুনানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আদালত যদি চূড়ান্তভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, তাহলে এই গ্রেফতারগুলির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার যদি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে, তাহলে আরও কঠোর আইন প্রয়োগের সম্ভাবনাও রয়েছে।






