লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে কেন ৫০০-র বেশি মানুষ গ্রেফতার?

UK Crackdown on Palestine Action Protest: লন্ডনে ফিলিস্তিন সমর্থনে বিক্ষোভ করতেই ৫০০-র বেশি মানুষ গ্রেফতার কেন? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি তবে আইনের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে?

inscript
৩ মিনিট
লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে কেন ৫০০-র বেশি মানুষ গ্রেফতার?

লন্ডনের রাস্তায় এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে প্রতিবাদের স্লোগান—কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই প্রতিবাদ পরিণত হলো গণগ্রেফতারে। যুক্তরাজ্যে 'Palestine Action' নামে একটি সংগঠনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবার নতুন মাত্রা পেল, শত শত মানুষকে গ্রেফতার করল পুলিশ। ঘটনাটি নাগরিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত মূলত একটি সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার 'Palestine Action' সংগঠনটিকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে এই সংগঠনের প্রতি সমর্থন জানানো, সদস্য হওয়া বা তাদের কার্যকলাপকে সমর্থন করা—সবই আইনের চোখে অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকী শুধু প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে সমর্থন জানানোও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যার শাস্তি দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। মানবাধিকার কর্মী এবং নাগরিক সমাজের একাংশ মনে করেন, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন ব্রিটেনের হাই কোর্ট এই নিষেধাজ্ঞাকে 'অসামঞ্জস্যপূর্ণ' এবং আইনের পরিপন্থী বলে রায় দেয়।

তবে এখানেই শেষ নয়। সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে, এবং আপিল চলাকালীন নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। ফলে আইনি দৃষ্টিতে সংগঠনটির প্রতি সমর্থন জানানো তখনও অপরাধ হিসেবেই গণ্য হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিই পরবর্তী সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইরান-আমেরিকার ২১ ঘণ্টার বৈঠক ব্যর্থ: আগেই ছিল সেই ইঙ্গিত?

Iran-US Peace Talks: ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার বৈঠকেও কেন ভেঙে গেল ইরান-আমেরিকা শান্তি আলোচনা? ইউরেনিয়াম ইস্যু, নিষেধাজ্ঞা নাকি আঞ্চলিক প্রভাব—কোন মতভেদ সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল?

এই প্রেক্ষাপটেই লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে একটি বড় প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। 'Defend Our Juries' নামে একটি সংগঠন এই কর্মসূচির ডাক দেয়। তাদের দাবি ছিল, Palestine Action-এর উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তা প্রত্যাহার করতে হবে।

প্রতিবাদে অংশ নিতে শত শত মানুষ জড়ো হন। কেউ প্ল্যাকার্ডে লিখেছেন, “I oppose genocide. I support Palestine Action”—আবার কেউ শান্তিপূর্ণভাবে বসে বা দাঁড়িয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করেন। এটি ছিল একটি অহিংস গণপ্রতিবাদ, যেখানে মানুষ কেবল তাদের মতামত প্রকাশ করছিলেন। কিন্তু পুলিশ এই প্রতিবাদকে ভিন্নভাবে দেখেছিল। ব্রিটিশ আইনের বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী, Palestine Action-এর প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানানো বেআইনি। সেই কারণেই মেট্রোপলিটন পুলিশ ব্যাপক হারে গ্রেফতার অভিযান চালায়। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ঘটনায় ৫০০-রও বেশি মানুষকে আটক করা হয়।

গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন ১৮ বছর থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বেশি বয়সী মানুষও। অনেককে পুলিশ সরাসরি কাঁধে তুলে বা টেনে নিয়ে যায়। এমনকী লাঠি ভর দিয়ে হাঁটা এক বৃদ্ধাকেও গ্রেফতার করা হয়, এই নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলি বলছে, এটি গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত। তাদের মতে, একটি আদালত যখন নিষেধাজ্ঞাকে বেআইনি বলে ঘোষণা করেছে, তখন সেই নিষেধাজ্ঞার ভিত্তিতে মানুষকে গ্রেফতার করা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্যালেস্টাইন থেকে ভেনেজুয়েলা: হানাদার ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার চাই!

Donald Trump: ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও কখনও সফল হয়নি। তিনি ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন, যা প্যালেস্টাইনিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে পুলিশ এবং সরকারের যুক্তি ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, যতক্ষণ না আপিলের চূড়ান্ত রায় আসছে, ততক্ষণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। ফলে আইন ভাঙার অভিযোগে গ্রেফতার করাই তাদের কর্তব্য।

এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভাজন তৈরি করেছে। একদল মনে করেন, আইন ভাঙা হলে পুলিশ ব্যবস্থা নিতেই পারে। অন্যদিকে অনেকেই মনে করছেন, এটি আসলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করার একটি কৌশল।

প্রতিবাদে অংশ নেওয়া অনেকেই সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, যদি একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ানোও অপরাধ হয়ে যায়, তাহলে তা নাগরিক স্বাধীনতার জন্য বড় বিপদ।

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পুলিশের অবস্থান পরিবর্তন। হাই কোর্টের রায়ের পর প্রথমে পুলিশ জানিয়েছিল, তারা আর গ্রেফতার করবে না। কিন্তু পরে মার্চ মাসে তারা সেই অবস্থান থেকে সরে এসে আবার গ্রেফতার শুরু করে। এই ‘ইউ-টার্ন’ নিয়েও তীব্র সমালোচনা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি কেবল একটি সংগঠনকে কেন্দ্র করে নয়, এটি বৃহত্তর একটি প্রশ্নের প্রতিফলন। একটি রাষ্ট্র কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে? নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকার কোথায় শেষ হয়? এবং নিরাপত্তার নামে কতটা স্বাধীনতা সীমিত করা যায়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এটা নিশ্চিত, লন্ডনের এই গণগ্রেফতার ব্রিটেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

আগামী দিনে এই মামলার আপিল শুনানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আদালত যদি চূড়ান্তভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, তাহলে এই গ্রেফতারগুলির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার যদি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে, তাহলে আরও কঠোর আইন প্রয়োগের সম্ভাবনাও রয়েছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।