যুদ্ধের আঁচ স্কুলের রান্নাঘরে, গ্যাস সংকটে টালমাটাল মিড-ডে মিল
LPG Shortage Hits West Bengal Schools: কলকাতা শহরের কিছু স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, হঠাৎ করেই এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হরনাথ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানান, তাঁদের হোস্টেলে ১০০-র বেশি ছাত্র থাকে, যাদের চারবেলা খাবারের দায়িত্ব স্কুলের। হঠাৎ গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং বাজারে সিলিন্ডার না পাওয়ায় পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলগুলির রান্নাঘরে। রান্নার গ্যাস বা এলপিজি (LPG) সরবরাহে অনিশ্চয়তার জেরে রাজ্যের বহু স্কুলে মিডডে মিল চালানো নিয়ে তৈরি হয়েছে বড়সড় সংকট। কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, হাতে থাকা গ্যাস আর মাত্র এক-দু’দিন চলবে, তারপর নতুন সিলিন্ডার না পেলে রান্না বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কলকাতা শহরের কিছু স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, হঠাৎ করেই এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হরনাথ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানান, তাঁদের হোস্টেলে ১০০-র বেশি ছাত্র থাকে, যাদের চারবেলা খাবারের দায়িত্ব স্কুলের। হঠাৎ গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং বাজারে সিলিন্ডার না পাওয়ায় পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে। তিনি বলেন,
গ্যাস না থাকলে ছাত্রদের খাবার কী ভাবে হবে, সেই চিন্তাই সবচেয়ে বড়। আপাতত বিকল্প হিসেবে ডিজেল স্টোভ কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষক ও কর্মীদের আশঙ্কা, যদি দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হয়, তবে মিডডে মিল প্রকল্প চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কলকাতা পুরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিম ১১ মার্চ জানান, মিডডে মিল নিয়ে ক্রাইসিসে রয়েছেন। বড় সিলিন্ডার দেওয়া হচ্ছে না। মিডডে মিল এবং মা কিচেন-এ প্রভাব পড়ছে। মেয়র জানান, ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য।
শহরের বহু স্কুলে মিডডে মিল রান্না করে সরবরাহ করে বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও। শ্যামবাজার এলাকার একটি এনজিও, যারা প্রায় ৩৮টি স্কুলে খাবার সরবরাহ করে; তারা জানিয়েছে যে, বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। তাদের বক্তব্য, আগে একসঙ্গে দু’টি সিলিন্ডার চাইলে দু’টিই পাওয়া যেত, এখন অনেক ক্ষেত্রে একটি সিলিন্ডার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে রান্না ও সরবরাহের পুরো ব্যবস্থাই চাপের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্কুল কর্তৃপক্ষদের দাবি, সংকটের সুযোগ নিয়ে যাতে কেউ গ্যাসের কালোবাজারি করতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। হরনাথ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Hormuz Strait Crisis: ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর সরকার তেল আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল। তখন ভারতের তেল আমদানির নির্ভরতা ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। লক্ষ্য ছিল তা কমিয়ে দুই-তৃতীয়াংশে নামানো। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো।
সরকারি হাসপাতাল ও স্কুলে যাতে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে, তার জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য— দু’পক্ষকেই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
যদিও কিছু স্কুল তরফে জানানো হয়েছে, এনজিও থেকে মিডডে মিল আসার কারণে গ্যাসের সংকটের বিষয়টি এখনই কোনো চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে না তাদের কাছে। মিডডে মিলে আপাতত কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে জানান বাগবাজার মালটিপারপাজ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা এবং বিদ্যবীথি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা।
তবে, গ্যাসের সংকট শুধু স্কুলেই সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও তার প্রভাব স্পষ্ট। বহু অভিভাবক জানিয়েছেন, বাড়ির রান্নার জন্য সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কাঠ বা উনুনে রান্না করছেন। তাঁদের অভিযোগ, গ্যাস বুকিং করার পরও বারবার অর্ডার বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এমনকী ডেলিভারি ম্যানরা ফোন ধরছেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির মধ্যে।
প্রসঙ্গত, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ওড়িশার জাজপুর জেলার চণ্ডিখোলের কাছে দানকারি পাহাড়ে প্রস্তাবিত ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছিল ২০১৮ সালে।
ভারত তার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা তেলের উপর নির্ভর করে। বর্তমানে দেশের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রয়োজনের প্রায় ৮৫ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। এই আমদানির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি; বিশেষ করে ইরাক, সৌদি আরব, UAE এবং কুয়েত ভারতের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী।
ভারতে আসা এই আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের মোট তেল আমদানির ৪০ শতাংশেরও বেশি এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রণালী দিয়ে আসে। এই কারণেই হরমুজ প্রণালীকে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ, কূটনৈতিক সংঘাত বা সামুদ্রিক পরিবহণে বিঘ্ন ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। এমন পরিস্থিতিতে দেশের তেল ও গ্যাসের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
ভারতে এই অনিশ্চয়তার প্রভাব ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা Indian Oil Corporation ৭ মার্চ রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা এবং বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম ১১৪ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ানোর ঘোষণা করেছে।
এদিকে ৯ মার্চ Ministry of Petroleum and Natural Gas এক বিবৃতি জারি করে জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি সরবরাহের উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে,
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং এলপিজি সরবরাহের উপর চাপ বাড়ায় দেশের তেল শোধনাগারগুলিকে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই অতিরিক্ত উৎপাদন মূলত গৃহস্থালির ব্যবহারের জন্য এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে গৃহস্থ বাড়িতে রান্নার গ্যাস সরবরাহকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মজুতদারি ও কালোবাজারি রোধ করতে নতুন নিয়মও চালু করা হয়েছে—একবার গ্যাস বুকিং করার পর ২৫ দিনের আগে দ্বিতীয়বার সিলিন্ডার বুক করা যাবে না। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, আমদানি করা এলপিজি থেকে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবাগুলিতে সরবরাহকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে রেস্তোরাঁ ও হোটেলের মতো বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে রান্নার গ্যাসের চাহিদা পর্যালোচনা করতে তেল বিপণন সংস্থাগুলোর তিনজন নির্বাহী পরিচালকের সমন্বয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
যুদ্ধের অভিঘাত যে কত দ্রুত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এসে পড়তে পারে, পশ্চিমবঙ্গের স্কুলের রান্নাঘরের এই সংকট তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এখন দেখার, পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কবে সুরক্ষিত জায়গায় আসে।






