পেট চালাতে 'এমএ পাশ তন্ময়'-র ভরসা লটারির দোকান, বড় স্বপ্নটা এখনও অটুট

অতীতে একাধিক পরীক্ষায় পাশ করেও চাকরি না মেলায় অবশেষে লটারির দোকানটি প্রধান ভরসা তাঁর। কেন এই অবস্থার সম্মুখীন এই যুবক, চলুন দেখে নেওয়া যাক।

Sayan Das
৪ মিনিট
পেট চালাতে 'এমএ পাশ তন্ময়'-র ভরসা লটারির দোকান, বড় স্বপ্নটা এখনও অটুট

ভাগ্য কাউকে প্রাসাদ থেকে রাস্তায় নামিয়ে নিয়ে আসতে পারে, আবার কাউকে 'জিরো' থেকে 'হিরো' করে তুলতে পারে। আজ আমাদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে এমন এক যুবক, যার জীবনে সংগ্রামের ইতিহাস শুরু থেকেই চলে আসছে; জীবন একাধিক জোয়ার ভাঁটার সাক্ষী থাকলেও বর্তমানে নতুন আলোর সন্ধানে যাত্রা শুরু করেছে এই যুবক এবং সেই পথে সঙ্গী তাঁর নিজস্ব দোকান। দোকানের নাম- এমএ পাশ লটারিওয়ালা তন্ময়।

দোকানের নাম শুনলে আশ্চর্য লাগতে পারে, কিন্তু বর্তমানে ঠিক এহেন এক দোকানের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে মুর্শিদাবাদের নওদা নামক এলাকায়। সেই যুবক তন্ময়ের জীবন কাহিনিই আমরা তুলে ধরছি; কীভাবে জীবনের প্রতিটি পদে পদে সংগ্রামকে সঙ্গী করে একের পর এক জীবন যুদ্ধ জয় করে চলেছে সেটাই মূল বিষয়বস্তু। একটি লটারি টিকিটের দোকান খুলে জীবন চালাচ্ছেন মুর্শিদাবাদের যুবক তন্ময় চুনারি। অতীতে একাধিক পরীক্ষায় পাশ করেও চাকরি না মেলায় অবশেষে লটারির দোকানটি প্রধান ভরসা তাঁর। কেন এই অবস্থার সম্মুখীন এই যুবক, চলুন দেখে নেওয়া যাক।

ছোটবেলা থেকে একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে চলেছে নওদার এই যুবক। বাল্যকালে বাবা, মা, দাদা এবং বৌদি সহ সুখের সংসার হলেও সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় আচমকাই তাদের জীবনে নেমে আসে বিপত্তি! হঠাৎ একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তন্ময়ের বাবা। এরপরেই মা, দাদা এবং বৌদিকে নিয়ে একপ্রকার দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয় ছোট তন্ময়কে। সেই সময় সংসার চালানোর জন্য স্কুল ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো রকম উপায়ই ছিল না তার কাছে এবং অবশেষে স্কুলছুট তন্ময়কে একটি সাইকেলের দোকানের কাজ করতে হয় বলেও জানা গিয়েছে। সারাদিন দোকানে কাজ করার মাধ্যমে যে পয়সা অর্জন করত, তাতেই চলে যেত সকলের সংসার। তবে তার এই সংগ্রাম মাঝেই আবার তন্ময়ের দাদা মুর্শিদাবাদের আমতলা বাজারে খুলে ফেলে একটি লটারির দোকান এবং এরপরেই পুনরায় একবার স্কুলে ভর্তি হয় সে। যদিও পড়াশোনা করার পাশাপাশি দিনের অধিকাংশ সময় রাজমিস্ত্রি, রংয়ের কাজ এবং দিনমজুর হিসেবে কাজ করেই কোনোক্রমে পয়সা জোগাড় করতে হত তাকে। উদ্দেশ্য একটাই, "অভাব-অনটনের মাঝে কোনোমতে সংসার চালানো।" সারাদিন কাজের পরিশ্রম, সে সবের মধ্যেই স্কুল পাশ করে সে। পরবর্তীতে যতীন্দ্র রাজেন্দ্র মহাবিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলার ডিগ্রিও অর্জন করেন; শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে বাংলা নিয়ে এমএ পাশ করেন তন্ময়। তবে এত ডিগ্রি অর্জন করলেও তার কপালে জোটে কেবল অবহেলা।

ছোট বয়স থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এত পরিশ্রম করলেও ভাগ্যে কেবল বঞ্চনাই জোটে তন্ময়ের। পড়াশোনা শেষ করে তার স্বপ্ন ছিল পুলিশ কিংবা ইন্ডিয়ান আর্মিতে যোগ দেওয়ার। সেই স্বপ্ন সফল করতেই রাজ্য পুলিশের কনস্টেবল সহ অন্যান্য একাধিক পোস্ট এবং আর্মির পরীক্ষায় বসেন তিনি। তবে শুধু তাই নয়, ব্যাঙ্ক এবং রেলের পরীক্ষাগুলিতেও অংশগ্রহণ করে তন্ময়। এর মধ্যে বেশকিছু পরীক্ষায় written এবং শারীরিক পরীক্ষায় পাশ করলেও পরবর্তীতে চাকরি পাওয়া যায় না! কারণ অবশ্য এখনো পর্যন্ত জানা যায়নি , তবে চাকরি না মেলায় একপ্রকার বেকার হয়েই ঘুরতে থাকেন তন্ময়। এর মাঝেই আবার জীবনে নেমে আসে অপর এক অন্ধকার!

পরিবার সূত্রে খবর, কয়েকদিন পূর্বে তন্ময়ের দাদা হঠাৎ মারা যায় এবং পরবর্তীকালে তার মা-ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে অসুস্থ মা এবং সংসারে বাকি সদস্যদের পেট চালানোর জন্য বর্তমানে একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে এই যুবক। স্বভাবতই আর কোন উপায় না পেয়ে বর্তমানে লটারি টিকিট বিক্রি করাই একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে তার; যার পেশাদার নাম এমএ পাশ লটারিওয়ালা তন্ময়। স্বভাবতই, এক্ষেত্রে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করলেও শেষমেষ দোকান খুলে বসে পড়ার ব্যাপারটি বেশ অবাক করে তুলেছে সকলকে আর এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পরই তার দোকানে ভিড় জমাতে শুরু করেছে এলাকার মানুষ। তবে লটারির দোকান খুলে নতুন আলোর সন্ধানে পাড়ি দেওয়া সেই তন্ময়ের গলায় ধরা পড়েছে আক্ষেপের সুর। তিনি বলেনন, "অতীতে রেল থেকে শুরু করে ব্যাঙ্ক, পুলিশ এবং আর্মির একাধিক পরীক্ষা দিলেও সময় নষ্ট হওয়া ছাড়া আর কিছুই হয়নি। একাধিক পরীক্ষায় পাশ করলেও পাইনি চাকরির ডাক। পরবর্তীকালে আমি ছেলেমেয়েদের পড়ানো শুরু করি কিন্তু সেখানে যে পরিমাণ টাকা রোজগার হতো, তাতে সংসার চালানো এক প্রকার মুশকিল হয়ে পড়ে আর এই মুহূর্তে আমার ব্যবসা শুরু করার ইচ্ছা থাকলেও পয়সার অভাবে তা সম্ভব হয়নি। তাই পরিবারের দিকে তাকিয়ে আমার কাছে বর্তমানে একটাই রাস্তা খোলা রয়েছে এবং তা হলো লটারির দোকান চালানো। এই লটারি টিকিট বিক্রি করে আপাতত ৩০০ টাকার কাছাকাছি উপার্জন করতে পারছি, তাতেই চলে যাচ্ছে সংসার।"

তবে বর্তমানের লটারির দোকান খুলে বসলেও নিজের আসল স্বপ্নকে সত্যি করার উদ্দেশ্যে কোনো খামতি নেই এই যুবকের। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন পুলিশ কিংবা আর্মিতে যোগ দেওয়া। সেই কারণেই লটারির দোকানে সারাদিন পরিশ্রম করলেও প্রতিদিন দুটি বিষয় নিয়মমাফিক মেনে চলে তন্ময়। সকাল হলেই দৌড়ানো যেমন এক প্রকার অভ্যেসে পরিণত করেছে সে, ঠিক সেরকম ভাবেই দোকানের ভিতর সময় পেলেই বই পড়তে দেখা যায় তাঁকে। ফলে লটারির দোকানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশসেবার কাজে নিজেকে শামিল করার উদ্দেশ্যেই হেঁটে চলেছেন এমএ পাস তন্ময়।

লিখেছেন
Sayan Das
Sayan Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।