ডিএ ঘোষণা বনাম সপ্তম বেতন কমিশনের প্রতিশ্রুতি, মধ্যবিত্ত ভোটেই নজর শাসক-বিরোধীর?

ভোট ঘোষণার ঠিক আগে ডিএ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।

Sangita Ghorai
৫ মিনিট
ডিএ ঘোষণা বনাম সপ্তম বেতন কমিশনের প্রতিশ্রুতি, মধ্যবিত্ত ভোটেই নজর শাসক-বিরোধীর?

রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণার ঠিক আগেই বড় ঘোষণা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে পুরনো বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। রবিবার বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে সমাজমাধ্যমে করা এক পোস্টে তিনি জানান, রোপা-২০০৯ অনুযায়ী বকেয়া ডিএ চলতি বছরের মার্চ মাস থেকেই দেওয়া শুরু হবে।

মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পোস্টে লেখেন, রাজ্য সরকারের কর্মচারী, পেনশনভোগী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অশিক্ষক কর্মী এবং পঞ্চায়েত ও পুরসভার কর্মীদের প্রতিশ্রুতি রাখা হচ্ছে। রাজ্যের অর্থ দফতর ইতোমধ্যেই বকেয়া অর্থপ্রদানের পদ্ধতি ও সময়সূচি নির্দিষ্ট করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বলেও জানান তিনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত, ৬০ লক্ষ বিচারাধীন ভোটারের কী হবে?

নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে গেলেও বিচারাধীন লক্ষ লক্ষ ভোটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতিতে এই প্রশ্নই এখন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই ঘোষণার সময় নিয়েই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, কয়েক মিনিট পরেই দিল্লির বিজ্ঞান ভবন থেকে বিকেল ৪টেয় সাংবাদিক বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করার কথা ছিল নির্বাচন কমিশনের। ডিএ নিয়ে আইনি লড়াইও দীর্ঘদিনের। রাজ্যকে বকেয়া ডিএ মেটাতে নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত প্রথম ধাপে ২৫ শতাংশ বকেয়া অবিলম্বে দেওয়ার নির্দেশ দেয় এবং বাকি অর্থ কীভাবে মেটানো হবে তা নির্ধারণ করতে প্রাক্তন বিচারপতিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে। যদিও বিষয়টি এখনও শীর্ষ আদালতে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে কলকাতা হাই কোর্টও ডিএ-কে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার বলে উল্লেখ করে রাজ্য সরকারকে তা মেটানোর নির্দেশ দিয়েছিল।

কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিলেও বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে দেখা যায়নি রাজ্য সরকারকে। ভোট ঘোষণার আগেই হঠাৎ ডিএ (DA) মিটিয়ে দেওয়ার ঘোষনা কি তবে নির্বাচনী কৌশল! সেই প্রশ্নই উঠছে রাজনৈতিক মহলে। মহিলা ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ভাতা বৃদ্ধির যে কৌশল, একই চালে মধ্যবিত্তের ভোট পেতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পদক্ষেপ? অবশ্য, রাজ্যের প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারেই যে সরকারি চাকুরীজীবী রয়েছে, তা তো বলা যাবে না! তাহলে কেন হঠাৎ ডিএ মিটিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেল রাজ্য সরকার? এক্ষেত্রে উঠে আসছে বেশ কয়েকটি যুক্তি। এক, ভোট পরিচালনা করেন সরকারি কর্মচারীরা, সুতরাং তাঁদের সন্তুষ্ট রাখাটা প্রয়োজন। দুই, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ না মানলে আদালত অবমাননার ঝক্কি পোহাতে হবে সরকারকে। বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার ঠিক পূর্বমুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রীর সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে ২০০৯ রোপা (ROPA)-র বকেয়া ডিএ সমস্ত স্তরের কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের দেওয়ার ঘোষণা করায় সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের ভাস্কর ঘোষ বলেন, “গত তিন বছর ধরে তাঁরা যে লড়াই চালিয়েছেন এবং সম্প্রতি যে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়েছে, এই ঘোষণা তারই ফলশ্রুতি।” এই জয়কে তিনি 'মানুষের জয়' এবং 'সরকারি কর্মচারীদের নাছোড়বান্দা লড়াইয়ের জয়' হিসেবে অভিহিত করেছেন। ডিএ-র পাশাপাশি এখন শূন্যপদে নিয়োগ এবং অস্থায়ী কর্মচারীদের স্থায়ীকরণের দাবি আরও জোরালো হবে বলে তিনি জানান।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভরা ব্রিগেডে মরা সভা, কারণ নিস্প্রভ মোদি

নির্বাচনের মুখে কার্যত প্রথম নির্বাচনী জনসভায় কোন পথে মানুষের দিনানুদিনের সমস্যার সুরাহা, বোঝা গেল না মোদির ভাষণে।

যদিও সরকারি চাকরিজীবীদের একাংশ বলছেন, চাপে পড়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুপ্রিম কোর্টে ডিএ মামলায় মূল মামলাকারী সংগঠন কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ-এর তরফে শ্যামল কুমার মিত্র জানান, “চাপে পড়েই ডিএ দিতে বাধ্য হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।” রোপা ২০০৯ (ROPA 2009)-এ প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত ডিএ-কে অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ২০১৯-এর রোপা-তে যা উল্লেখ নেই। তাই তিনি প্রাক্তন অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান, কারণ ২০০৯-এর পে কমিশনের জন্যই তাঁরা এই আইনি লড়াই লড়তে পেরেছেন বলে জানান। “রাজ্য সরকার ডিএ দিতে অনিচ্ছুক এবং বারবার বিভিন্ন অজুহাতে আদালতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে”, বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাই মুখ্যমন্ত্রী সামাজিক মাধ্যমে করা পোস্টে এখনই ভরসা করা যাচ্ছে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত অর্থদফতর কোনো নোটিফিকেশন জারি করছে, বলেন শ্যামল কুমার মিত্র।

অন্যদিকে ২ মার্চ বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’র মঞ্চ থেকে রাজ্যের সরকারি কর্মী ও চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘির জনসভায় তিনি বলেন, রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করা হবে।

শাহের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি পদে নিয়োগ না হওয়ায় বহু শূন্যপদ তৈরি হয়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব শূন্য পদ পূরণ করা হবে এবং বাতিল হওয়া স্থায়ী পদও ফিরিয়ে আনা হবে। এছাড়া যেসব চাকরিপ্রার্থীর বয়সসীমা পেরিয়ে গিয়েছে, তাঁদের জন্য সরকারি চাকরির পরীক্ষায় পাঁচ বছর পর্যন্ত বয়সে ছাড় দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।

সব মিলিয়ে ভোট ঘোষণার ঠিক আগে ডিএ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, আদালতের নির্দেশ এবং সরকারি কর্মচারীদের অসন্তোষ— এই তিনের চাপের মধ্যেই এসেছে এই সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে বিজেপিও সপ্তম বেতন কমিশন ও চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে একই ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ফলে ডিএ ইস্যু যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে চলেছে, তা স্পষ্ট। এখন দেখার, সরকারি কর্মচারী ও মধ্যবিত্ত ভোটারমহল শেষ পর্যন্ত এই ঘোষণাকে কতটা বিশ্বাস করেন এবং ভোটের রাজনীতিতে তার প্রতিফলন কীভাবে দেখা যায়।

লিখেছেন
Sangita Ghorai
Sangita Ghorai
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।