ডিএ ঘোষণা বনাম সপ্তম বেতন কমিশনের প্রতিশ্রুতি, মধ্যবিত্ত ভোটেই নজর শাসক-বিরোধীর?
ভোট ঘোষণার ঠিক আগে ডিএ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণার ঠিক আগেই বড় ঘোষণা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে পুরনো বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। রবিবার বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে সমাজমাধ্যমে করা এক পোস্টে তিনি জানান, রোপা-২০০৯ অনুযায়ী বকেয়া ডিএ চলতি বছরের মার্চ মাস থেকেই দেওয়া শুরু হবে।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পোস্টে লেখেন, রাজ্য সরকারের কর্মচারী, পেনশনভোগী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অশিক্ষক কর্মী এবং পঞ্চায়েত ও পুরসভার কর্মীদের প্রতিশ্রুতি রাখা হচ্ছে। রাজ্যের অর্থ দফতর ইতোমধ্যেই বকেয়া অর্থপ্রদানের পদ্ধতি ও সময়সূচি নির্দিষ্ট করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বলেও জানান তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে গেলেও বিচারাধীন লক্ষ লক্ষ ভোটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতিতে এই প্রশ্নই এখন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই ঘোষণার সময় নিয়েই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, কয়েক মিনিট পরেই দিল্লির বিজ্ঞান ভবন থেকে বিকেল ৪টেয় সাংবাদিক বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করার কথা ছিল নির্বাচন কমিশনের। ডিএ নিয়ে আইনি লড়াইও দীর্ঘদিনের। রাজ্যকে বকেয়া ডিএ মেটাতে নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত প্রথম ধাপে ২৫ শতাংশ বকেয়া অবিলম্বে দেওয়ার নির্দেশ দেয় এবং বাকি অর্থ কীভাবে মেটানো হবে তা নির্ধারণ করতে প্রাক্তন বিচারপতিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে। যদিও বিষয়টি এখনও শীর্ষ আদালতে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে কলকাতা হাই কোর্টও ডিএ-কে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার বলে উল্লেখ করে রাজ্য সরকারকে তা মেটানোর নির্দেশ দিয়েছিল।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিলেও বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে দেখা যায়নি রাজ্য সরকারকে। ভোট ঘোষণার আগেই হঠাৎ ডিএ (DA) মিটিয়ে দেওয়ার ঘোষনা কি তবে নির্বাচনী কৌশল! সেই প্রশ্নই উঠছে রাজনৈতিক মহলে। মহিলা ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ভাতা বৃদ্ধির যে কৌশল, একই চালে মধ্যবিত্তের ভোট পেতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পদক্ষেপ? অবশ্য, রাজ্যের প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারেই যে সরকারি চাকুরীজীবী রয়েছে, তা তো বলা যাবে না! তাহলে কেন হঠাৎ ডিএ মিটিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেল রাজ্য সরকার? এক্ষেত্রে উঠে আসছে বেশ কয়েকটি যুক্তি। এক, ভোট পরিচালনা করেন সরকারি কর্মচারীরা, সুতরাং তাঁদের সন্তুষ্ট রাখাটা প্রয়োজন। দুই, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ না মানলে আদালত অবমাননার ঝক্কি পোহাতে হবে সরকারকে। বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার ঠিক পূর্বমুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রীর সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে ২০০৯ রোপা (ROPA)-র বকেয়া ডিএ সমস্ত স্তরের কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের দেওয়ার ঘোষণা করায় সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের ভাস্কর ঘোষ বলেন, “গত তিন বছর ধরে তাঁরা যে লড়াই চালিয়েছেন এবং সম্প্রতি যে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়েছে, এই ঘোষণা তারই ফলশ্রুতি।” এই জয়কে তিনি 'মানুষের জয়' এবং 'সরকারি কর্মচারীদের নাছোড়বান্দা লড়াইয়ের জয়' হিসেবে অভিহিত করেছেন। ডিএ-র পাশাপাশি এখন শূন্যপদে নিয়োগ এবং অস্থায়ী কর্মচারীদের স্থায়ীকরণের দাবি আরও জোরালো হবে বলে তিনি জানান।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নির্বাচনের মুখে কার্যত প্রথম নির্বাচনী জনসভায় কোন পথে মানুষের দিনানুদিনের সমস্যার সুরাহা, বোঝা গেল না মোদির ভাষণে।
যদিও সরকারি চাকরিজীবীদের একাংশ বলছেন, চাপে পড়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুপ্রিম কোর্টে ডিএ মামলায় মূল মামলাকারী সংগঠন কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ-এর তরফে শ্যামল কুমার মিত্র জানান, “চাপে পড়েই ডিএ দিতে বাধ্য হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।” রোপা ২০০৯ (ROPA 2009)-এ প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত ডিএ-কে অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ২০১৯-এর রোপা-তে যা উল্লেখ নেই। তাই তিনি প্রাক্তন অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান, কারণ ২০০৯-এর পে কমিশনের জন্যই তাঁরা এই আইনি লড়াই লড়তে পেরেছেন বলে জানান। “রাজ্য সরকার ডিএ দিতে অনিচ্ছুক এবং বারবার বিভিন্ন অজুহাতে আদালতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে”, বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাই মুখ্যমন্ত্রী সামাজিক মাধ্যমে করা পোস্টে এখনই ভরসা করা যাচ্ছে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত অর্থদফতর কোনো নোটিফিকেশন জারি করছে, বলেন শ্যামল কুমার মিত্র।
অন্যদিকে ২ মার্চ বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’র মঞ্চ থেকে রাজ্যের সরকারি কর্মী ও চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘির জনসভায় তিনি বলেন, রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করা হবে।
শাহের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি পদে নিয়োগ না হওয়ায় বহু শূন্যপদ তৈরি হয়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব শূন্য পদ পূরণ করা হবে এবং বাতিল হওয়া স্থায়ী পদও ফিরিয়ে আনা হবে। এছাড়া যেসব চাকরিপ্রার্থীর বয়সসীমা পেরিয়ে গিয়েছে, তাঁদের জন্য সরকারি চাকরির পরীক্ষায় পাঁচ বছর পর্যন্ত বয়সে ছাড় দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
সব মিলিয়ে ভোট ঘোষণার ঠিক আগে ডিএ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, আদালতের নির্দেশ এবং সরকারি কর্মচারীদের অসন্তোষ— এই তিনের চাপের মধ্যেই এসেছে এই সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে বিজেপিও সপ্তম বেতন কমিশন ও চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে একই ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ফলে ডিএ ইস্যু যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে চলেছে, তা স্পষ্ট। এখন দেখার, সরকারি কর্মচারী ও মধ্যবিত্ত ভোটারমহল শেষ পর্যন্ত এই ঘোষণাকে কতটা বিশ্বাস করেন এবং ভোটের রাজনীতিতে তার প্রতিফলন কীভাবে দেখা যায়।







