রূপার দলবদল ঘিরে দিনভর জল্পনা! মিডিয়ার হইচইয়ের আড়ালে আসল ঘটনা কী?
রূপার দলবদলের জল্পনা হাইপ দিয়ে তুলে ধরে মিডিয়ার একাংশ। সেই জল্পনায় জল ঢালেন কুণাল এবং রূপা স্বয়ং। আগে মুখ খোলেন কুণাল। তিনি জানিয়েছিলেন, এক অনুষ্ঠানে রূপার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও যোগ নেই। সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে মাত্র।

হঠাৎ শোরগোল। রূপা গঙ্গোপাধ্যায় প্রায় ফুল বদল করেই ফেললেন। কুণাল ঘোষের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়ার ঘটনা লুফে নিয়েছে মিডিয়া। কারণ হাজারও ইস্যুকে পেছনে ফেলে হট কেকের মতো বিকোচ্ছে রূপার শিবির বদলের খবর। ৬ জুলাই এই খবর নিয়ে বঙ্গরাজনীতির হাওয়া গরম করল মিডিয়ার একাংশ।
কী কী বলল মিডিয়া?
১. কুণাল-রূপার সাক্ষাতের ছবি প্রকাশ্যে আসতেই জল্পনা তুঙ্গে। সিঁদুরে মেঘ দেখল কি গেরুয়া শিবির? চাপানউতোর রাজনৈতিক মহলে।
২. কুণাল ঘোষের সঙ্গে বৈঠকে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। উত্তাল বঙ্গরাজনীতি। তীব্র হচ্ছে গুঞ্জন।
৩. তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষের সঙ্গে বৈঠক রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের। এই খবর সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা।
৪. তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন বিজেপি নেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর সাক্ষাৎ ঘিরে তুমুল হইচই পড়ে গিয়েছে।
মিডিয়া যেভাবে হইহই রব শুরু করেছে, তাতে রূপা দলবদল করেই ফেললেন, একথা মনে হতেই পারে। আসলে ঘটেছে কী?
আসল ঘটনা
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দলমত-নির্বিশেষে সকলেই মানবেন, মহুয়ার রাজনৈতিক কেরিয়ার অত্যন্ত স্বচ্ছ। তৃণমূলের নামী অন্য বহু নেতার মতো তাঁর বিরুদ্ধে ইডি, সিবিআই দিয়ে চাপ তৈরি করা যায়নি। তাই দলের এই হাত ধুয়ে নেওয়া তাঁর প্রাপ্য ছিল না বলেই মনে করে একাংশ।
ঘটনাস্থল দক্ষিণ কলকাতার এক ঘরোয়া অনুষ্ঠান। রথের দিন সেখানে বড় করে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন জগতের লোকেরা সেদিন সেখানে যান। যেমন গিয়েছিলেন, তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। এবং বিজেপি নেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বর দেখা হলে যে সৌজন্য বিনিময় হবে, তাই তো স্বাভাবিক। না কি রাজনীতিতে সৌজন্য এখন বিরল, তাই দুই নেতা-নেত্রীর ছবি সামনে আসতেই শুরু জল্পনা?
কী বললেন কুণাল ও রূপা
রূপার দলবদলের জল্পনা হাইপ দিয়ে তুলে ধরে মিডিয়ার একাংশ। সেই জল্পনায় জল ঢালেন কুণাল এবং রূপা স্বয়ং। আগে মুখ খোলেন কুণাল। তিনি জানিয়েছিলেন, এক অনুষ্ঠানে রূপার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও যোগ নেই। সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে মাত্র।
এরপর এই নিয়ে মুখ খোলেন রূপা। তিনি বলেন, "আমি নরেন্দ্র মোদির অন্ধ ভক্ত। অন্য কোনও দলে যাওয়ার প্রশ্ন নেই।‘’ অর্থাৎ কুণাল ঘোষের সঙ্গে দেখা হলেও দল পরিবর্তনের কোনও প্রশ্ন নেই, দাবি রূপার। একাধিকবার নিজের মন্তব্যর জন্য চর্চায় থেকেছেন রূপা। এক এক সময় তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন দিলীপ ঘোষের বিরুদ্ধে। কিন্তু তা দলের অন্দরের ব্যাপার। অতীতে যাঁরা বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসেছেন, তাঁদের সঙ্গে রূপার ঘটনার কোনও সম্পর্ক নেই। প্রশ্ন হল, সামনে কোনও ভোট নেই। তাহলে তাঁকে দলে নিতে যাবে কেন তৃণমূল?
দায় নেই তৃণমূলের
কালীঘাটের রাজনীতি বারবার আবর্তিত হয়েছে তারুণ্য এবং পাকা মাথার চাণক্যের ওপর ভরসা রেখে। ২০২১-এর প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গ্ল্যামার দুনিয়ার পাশাপাশি সামনে নিয়ে আসেন তারুণ্যকে। আগেই দেবকে সামনে এনেছেন। '২১-এ সদ্য রাজনীতিতে পা দেওয়া রাজ চক্রবর্তী, কৌশানী মুখোপাধ্যায়, সায়নী ঘোষ, কাঞ্চন মল্লিক, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, অদিতি মুনসিকে প্রার্থী করেন।
এদিকে মুকুলের ঘরে ফেরার সঙ্গে রূপার তৃণমূলে আসার যে কোনও তুলনাই চলে না, তা বলাই বাহুল্য। কারণ মুকুল পাকা মাথার চাণক্য। মুকুল চলে যাওয়ায় মমতা হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলেন তাঁর অবদান। কারণ তিনি শুধু সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই ভোট ম্যানেজার। প্রায় ২০টা বছর ধরে নিজের হাতে তৃণমূলের সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। ফলে তাঁর অভাব বুঝতে সময় লাগেনি মমতার। তারুণ্য এবং পাকা মাথার চাণক্য- কোনও ক্যাটেগরিতেই তো পড়েন না রূপা। তাঁর গায়ে গ্ল্যামারের কিঞ্চিৎ ছটা থাকলেও, তা এখন খুব একটা কার্যকরও নয়। তার ওপর সামনে কোনও ভোট নেই। তাহলে দলে কী বরাদ্দ হবে রূপার জন্য?
বাবুলকে তৃণমূলে এনে মমতা যে ভুল করেননি, তার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। সেই একই ইকুয়েশন রূপার ক্ষেত্রে খাটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বালিগঞ্জে জিতলেন বাবুল সুপ্রিয়। একুশের ভোটে ৭৫,০০০-এর বেশি ভোটে এই আসনে বিজেপিকে হারিয়েছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। তাঁর মৃত্যুর পর আসনটি খালি হয়ে যায়। তাই সেখান থেকে বাবুলকে দাঁড় করান দিদি। বাবুল তৃণমূলকে তাদের দলে ফেরানোর উপহার উসুল করে দেন।
রূপার তৃণমূলে যাওয়ার কারণ আছে?
মিডিয়া হাওয়া গরম করেছে এই বলে যে, রাজ্যসভায় রূপার মেয়াদ উত্তীর্ণ। অসুস্থতা কাটিয়ে রাজনীতির ময়দানে ফের কামব্যাক মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তীর। সূত্রের খবর, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের মেয়াদ উত্তীর্ণ, রাজ্যসভার আসনে এবার বিজেপির ন্যাচারাল চয়েস মিঠুন। এই নিয়ে সরগরম মুরলীধর লেন। এখন প্রশ্ন হলো, রূপা রাজ্যসভার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার জন্যই দল ত্যাগ করবেন? এটা দলত্যাগের কোনও জোরালো কারণ হতে পারে? বোধহয় না। এ-প্রসঙ্গে বলা দরকার, রূপা বরাবর কট্টর তৃণমূল-বিরোধীর ভূমিকা নিয়েছেন। বিজেপি রাজ্য নেতারা মনে করেন, দলের মূল স্রোত থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন। কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খারাপের কোনও ইঙ্গিত ইতিমধ্যে পাওয়া যায়নি।
কিছুদিন আগে অবশ্য রূপা ফেসবুক পোস্টে বলেছিলেন, জীবনকে নতুন করে চেনাল রাজনীতি। এরপরে তাঁর দলত্যাগের জল্পনা নিয়ে আলোচনা প্রাসঙ্গিক হলেও প্রশ্ন, রাজ্যসভায় চোখের জল ফেলে কেন বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারির পক্ষে সওয়াল করলেন? যে শাসক দলের বিরুদ্ধে বারবার সুর চড়িয়েছেন, তার সঙ্গেই এবার গাটছড়া বাঁধবেন? যদি এটা নিছক মিডিয়ার হাইপ তোলা না হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে, রাজনীতির নীতি এতটাই তলানিতে এসে দাঁড়াল?
শিবসেনার পুনরাবৃত্তির কারণ নেই
এটা মহারাষ্ট্র নয়। এখানে শিবসেনার পুনরাবৃত্তির কোনও কারণ নেই। শিবসেনার অন্দরে অনেক দিন ধরে রাগ পুষে রেখেছিলেন একনাথ শিন্ডে। আর তাকেই কাজে লাগিয়েছে বিজেপি। এখানে রূপার মধ্যে জমে থাকা তেমন কোনও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এখনও দেখা যায়নি। তাহলে হঠাৎ করে বঙ্গ বিজেপির অন্দরে ভাঙনের চোরা স্রোত বইতে যাবে কেন? সেই সম্ভাবনা বাংলায় নেই বললেই চলে।
মিডিয়ার হাওয়া গরম
মিডিয়ার চরিত্র বদলেছে। মিডিয়া মানেই বলা হয়- গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। তবে মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সেদিন কি আর নেই? এখন প্যারালাল এবং ডিজিটাল মিডিয়ার যুগ। তাহলে প্রশ্ন হলো, মিডিয়ার দায়িত্ব কি এসে দাঁড়িয়েছে প্রচারে? অর্থাৎ, তার ভূমিকা বায়বীয়। কিছু খবরের হাইপ তুলে বাজারে ছড়িয়ে দিলেই তা বিক্রি হবে হট কেকের মতো? আর এই খবর গিলবেন পাঠকরা? এখানেই দায় শেষ মিডিয়ার? আজকের খবর তো এটাও যে, দেশে বেকারত্বের হার বাড়ল জুনে। টাকার দাম আরও নিচে। দেশের অর্থনীতি, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব সাধারণের পিঠে বল্লমের আঘাত। রূপা কোথায় গেলেন, কী করলেন, এর চেয়ে টাকার দামের পতন কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়?







