রাজার মূর্তি ঘিরে খান খান বিজেপি! কেন দলে দলে বিজেপি ছাড়ছেন নেতারা?
Mihir Bhoj Statue Controversy: মূর্তি উন্মোচন থেকে শুরু করে রাজ্যে প্রায় ৪০ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন।

মূর্তি এই দেশের রাজনীতির স্তম্ভ। গণতন্ত্র বটে, অস্বীকার করা যায় না তবে নায়কতন্ত্র ততোধিক! কৃতি মানুষরা অথবা বিতর্কিত চরিত্ররা মৃত্যুর পর পাথর হয়ে যান। চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন রোদে জলে। সুযোগ বুঝে রাজনৈতিক দলগুলি মূর্তির সওদা করে। কাকে কখন তুলে আনতে হবে, কোথায় বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু স্ট্যাচু ঠিক কখন বানাতে হবে, এসব নেতারাই ঠিক করেন। তারপর কালের নিয়মে তারাও কেউ কেউ একসময় মূর্তি হয়ে চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে যান। মোদ্দা কথা হচ্ছে, মূর্তি ভারতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, দল গড়ার, দেশ ভাঙার। দল ভাঙারও! হরিয়ানায় ভারতীয় জনতা পার্টি ভাঙছে মূর্তিকে ঘিরেই। দলে এখন আছড়ে পড়ছে ভিন্নমতের ঢেউ। একটি মূর্তি উন্মোচনকে ঘিরে দলের বিরাট অংশের নেতারা গণপদত্যাগ করছেন। নবম শতাব্দীর শাসক সম্রাট মিহির ভোজের মূর্তির উন্মোচন অনুষ্ঠানে রাজ্যের প্রায় ৪০ জন নেতারা পদত্যাগ করেছেন।
হরিয়ানার বেশ কয়েকটি গ্রামে বিজেপি নেতাদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ব্যাপারটার শুরু দিন কতক আগে। কাইথলের বিজেপি বিধায়ক লীলা রাম গুর্জর এবং গুর্জর সম্প্রদায়ের অন্যান্য নেতারা গত ২০ জুলাই ওই মূর্তিটি উন্মোচন করেন। মূর্তি উন্মোচন ঘিরে কড়া নিরাপত্তার ঘের! সেই মূর্তি উন্মোচন থেকে শুরু করে রাজ্যে প্রায় ৪০ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন।
এই মূর্তি উন্মোচনের পর থেকেই বিতর্ক বাঁধে। রাজপুত সম্প্রদায়ের নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি, রাজপুত সম্প্রদায় অধ্যুষিত হরিয়ানার অনেক গ্রামই এই বিতর্কের কারণে বিজেপি নেতাদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mohenjodaro Dancing Girl Mascot: ৪০০০ বছর আগেকার নগ্ন মূর্তিতে এখন, এই ২০২৩ সালে এসে অশ্লীলতা খুঁজে পাচ্ছেন প্রশাসনের আধিকারিকরা।
মিহির ভোজ কে?
মিহির ভোজ ছিলেন নবম শতাব্দীর (আনুমানিক ৮৩৬-৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ) ভারতের একজন শাসক। সেই কালে গুর্জর-প্রতিহাররা কাশ্মীর থেকে গুজরাত পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। মিহির ভোজ দাক্ষিণাত্য ও মালওয়া অঞ্চলও জয় করেছিলেন। নবম শতাব্দীতে, প্রধান রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল কনৌজের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে। মনে করা হতো, যিনি কনৌজ জয় করবেন তিনিই দেশের সম্রাট হবেন। তাই সেকালের তিনটি বড় শক্তি- গুর্জর-প্রতিহার, দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট এবং বাংলার পালদের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক লড়াই ছিল প্রবল। সেই লড়াইয়ে মিহির ভোজই সবচেয়ে সফল। তিনিই রাষ্ট্রকূটদের কাছ থেকে গুজরাত ও মালওয়া অঞ্চল জয় করেন। বাংলার দিকেও অভিযান শুরু করেন এবং পালদের কাছ থেকেও গোরখপুরের অঞ্চল জয় করেন। ঐতিহাসিকরা বলছেন, গুর্জর প্রতিহার, মানে মিহির ভোজ যে গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তাদের প্রায়ই রাজপুত এবং গুর্জর দুই বলেই বিবেচনা করা হয়। তাই দু'টি পরিচয়ের মধ্যে সত্যিই কোনও বিরোধ নেই।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নতুন অশোক স্তম্ভ, যা জাতীয় প্রতীক হিসেবে পরিচিত, তার নকশা, ভাস্কর্য এবং ইনস্টলেশনের দায়িত্বে ছিলেন লক্ষ্মণ এবং তাঁর দল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংসদ ভবনে জাতীয় প্রতীক উন্মোচনের সময় শিল্পী লক্ষ্মণকে অভিনন্দন জানান।
গুর্জররা প্রাচীন ভারতের একটি যাযাবর উপজাতি ছিল। প্রাথমিকভাবে রাজস্থান এবং গুজরাত অঞ্চলেই ছিল তাদের আবাস। মিহির ভোজ এই গোত্রেরই মানুষ ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে ইতিহাস বলে, তিনি নিজের জন্য ক্ষত্রিয় মর্যাদা দাবি করেছিলেন। রাজবংশের প্রতিহার শাখা রাজপুতদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। মনে করা হতো, শুধুমাত্র একজন ক্ষত্রিয়ই অর্থাৎ যোদ্ধাই রাজা হতে পারে। তাই প্রাচীন ভারতে সব রাজাই ক্ষত্রিয় মর্যাদা দাবি করতেন।
মিহির ভোজের মূর্তি নিয়ে এত কীসের বিতর্ক?
২০ জুলাই নবম শতাব্দীর শাসক সম্রাট মিহির ভোজের একটি মূর্তি উন্মোচন করে বিজেপি। মূর্তি উন্মোচন অনুষ্ঠান ঘিরে এই অঞ্চলের দু'টি ভিন্ন সম্প্রদায়, অর্থাৎ গুর্জর এবং রাজপুতদের মধ্যে বিরোধ চরমে ওঠে। মূর্তি উন্মোচন অনুষ্ঠানের আগে, রাজপুত সম্প্রদায়ের সদস্যরা মূর্তির উপর খোদাই করা গুর্জর শব্দটি অপসারণের দাবি তুলতে শুরু করে। রাজপুত নেতারা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন এবং তারা মূর্তির উপর ‘হিন্দু সম্রাট’ বিশেষণটি জুড়ে দেওয়ার দাবি জানান। এরপরই বিক্ষোভের জন্য তাদের উপর লাঠিচার্জ করা হয়।
বিজেপির কিষাণ মোর্চার জেলা প্রধান সঞ্জীব রানার দাবি, তাঁদের নেতা মিহির ভোজের মূর্তিটিতে 'হিন্দু সম্রাট' শব্দটি খোদাই করার দাবি ছিল তাঁদের কিন্তু তাতে 'রাজপুত' বা 'গুর্জর' লিখতে বলা হয়নি। তাঁদের দাবি, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করলেও পুলিশ তাঁদের উপর তাদের লাঠি চালায়। মূর্তি উন্মোচন অনুষ্ঠান ও লাঠিচার্জের ঘটনার পরপরই প্রশাসন মূর্তিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের আয়োজন করে। এই ঘটনায় আরও রেগে যান রাজপুত সম্প্রদায়ের বিজেপি নেতারা। তাঁদের দাবি, প্রশাসনই প্রমাণ করে দিতে চাইছে বিজেপির রাজপুতদের কোনও দরকার নেই। সার্বিকভাবে ঘটনার বিরোধিতা করে বিজেপির সমস্ত রাজপুত নেতারা হরিয়ানার রাজ্য সভাপতি ওম প্রকাশ ধানারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
বিজেপি গণপদত্যাগকারী নেতাদের মধ্যে আছেন কালায়াতের বিভাগীয় সভাপতি মহিপাল রানা, কিষাণ মোর্চার জেলা প্রধান সঞ্জীব রানা; কাথাইলের কিষাণ মোর্চার সহ-সভাপতি জয়দীপ রানা, জেলা আহ্বায়ক সন্দীপ রানা, কালায়তের বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক রাহুল রানা, এবং মণ্ডল সভাপতি অমিত রানা প্রমুখ। এই নেতারা বিষয়টি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খট্টরের ব্যাখ্যা এবং পুলিশি পদক্ষেপের দাবি করছেন। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে আলোচনা না করা পর্যন্ত বিজেপি থেকে দূরে থাকবেন বলেই জানান তারা।






