করোনা থেকে মাঙ্কি পক্স, দায়ী আসলে কারা? কেন দিনদিন এত বাড়ছে পশুবাহিত রোগের প্রভাব?

Zoonosis : পশুপাখি থেকে ছড়ানো রোগ খুঁজতে গা উজোর, কেন মাত্রা ছড়াচ্ছে পরিস্থিতি?

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
করোনা থেকে মাঙ্কি পক্স, দায়ী আসলে কারা? কেন দিনদিন এত বাড়ছে পশুবাহিত রোগের প্রভাব?

একটা রোগের প্রাদুর্ভাব সামাল দিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন রোগের ভ্রুকুটি। বিগত কয়েক বছর ধরে টালমাটাল পরিস্থিতির শিকার গোটা দুনিয়া। মহামারী এর আগেও ছড়িয়েছে ঠিকই তবে করোনার মতো ফলশ্রুতির শিকার হতে হয়নি কখনোই। এক কথা বলতে গেলে, গোটা বিশ্বের জনজীবনকে মুহূর্তের মধ্যে থমকে দিয়েছিল এই একটা রোগ। কী এই রোগ, কীভাবেই বা ছড়ালো ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা আজও চলছে। তবে উত্তর খুঁজতে গিয়ে বারবারই উঠে এসেছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুধু করোনা পাশাপাশি আরও অনেক রোগেরই মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে পশু পাখিরা।

হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, নিরীহ জীবরাই আসলে বড় বর রোগের কারণ। কোভিড-১৯ থেকে শুরু করে মাঙ্কি পক্স, মার্স, ইবোলা, এভিয়ান ফ্লু, জিকা এবং এইচআইভির মতো প্রাণঘাতী রোগের পিচরে রয়েছে পশুরাই। শুধু তাই নয় সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বহুগুণ বেড়েছে এই পশু প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে রোগ সংক্রমণের প্রভাব, এমনকী তা নতুন করে মহামারীর আশঙ্কাও বাড়িয়েছে।

জুনোসিস কি?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০ দিনে আক্রান্ত ২৪ কোটিরও বেশি মানুষ! করোনার নয়া রূপ কেন এত আতঙ্ক ছড়াচ্ছে চিনে?

Corona outbreak in China : বাড়ির পাশেই চিনের পরিস্থিতি কারও নজর এড়ায়নি। এখন সেখানে ফের করোনা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কও চরমে।

ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমাল হেলথের মতে, মানুষের সংক্রামক রোগের ৬০ শতাংশই জুনোটিক। অর্থাৎ পশু প্রাণী থেকে ছড়িয়ে পরা রোগ। Zoonosis হল একটি রোগ বা সংক্রমণ যা মেরুদণ্ডী প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রামিত হয়। এর সঙ্গে জড়িত প্যাথোজেনগুলি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা পরজীবী হতে পারে। এই রোগগুলি সরাসরি একটি প্রাণী এবং একটি মানুষের মধ্যে যোগাযোগের সময় বা পরোক্ষভাবে খাদ্যের মাধ্যমে বা পোকামাকড়, মাকড়সা বা মাইটের মতো ভেক্টরের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু তাই নয় এই সংক্রমণগুলির মধ্যে কিছু কিছু আবার ছড়িয়ে পড়ার পর কেবল মানুষের মধ্যেই তার ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, যেমন - কোভিড-১৯।

কী ধরনের রোগ জড়িত?

জুনোসিস এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রোগের তালিকাটাও বর্তমানে নেহাত কম কিছু নয়। তবে প্রতিটি রোগের ক্ষেত্রেই কিছু আলাদা হয় সংক্রমণের ধরন। কেউ কেউ পরিপাকতন্ত্রকে প্রভাবিত করে, যেমন সালমোনেলোসিস। আবার এভিয়ান এবং সোয়াইন ফ্লুর মতো রোগগুলির ক্ষেত্রে আক্রান্ত হয় শ্বসনতন্ত্র, এছাড়া কোভিড বা জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে ভাইরাস। মানুষের মধ্যে এই রোগগুলির তীব্রতা বেশি হয় সাধারণত। এবং সংক্রামিত ব্যক্তির প্যাথোজেনের ভাইরাসের উপর নির্ভর করে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ফের কাঠগড়ায় চিন! চেনা পশুটিই করোনার আসল কালপ্রিট! যে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এল গবেষণায়

Corona virus : ঠিক কীভাবে ছড়িয়েছিল অতিমারী করোনা? সাম্প্রতিক গবেষণা কীভাবে আবার কোণঠাসা করে দিল চিনকে?

আসুন জেনে নেওয়া যাক বিশ্ব জুড়ে ছিটিয়ে পড়া সাম্প্রতিক মহমারীগুলির সঙ্গে কোন কোন প্রাণী জড়িত?

মানুষকে প্রভাবিত করে এমন অনেক ভাইরাসের আধার হিসেবে দীর্ঘকাল ধরেই পরিচিত ছিল বাদুড়।জ্বর একটা বিশেষ উদাহরণ হল - রেবিস ভাইরাস। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে এর পাশাপাশি আরও অনেকের আবির্ভাব ঘটেছে, যেমন ইবোলা, সার্স করোনাভাইরাস, সার্স-কোভি-২ (যা কোভিড-১৯ ঘটায়) বা নিপাহ ভাইরাস প্রভৃতি। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী, যেমন গবাদি পশু, শূকর, কুকুর, শিয়াল, উট এবং ইঁদুরও প্রায়ই ভাইরাস জনিত রোগ সংক্রমণের ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী হোস্টের ভূমিকা পালন করে। প্রধান ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর জন্য দায়ী সমস্ত ভাইরাসের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উৎস ছিল একটি এভিয়ান। এমনকী টিক্সের মতো পোকামাকড়ও অনেক ভাইরাল রোগের ভেক্টর হিসেবে মানুষকে প্রভাবিত করে।

কেন Zoonoses ক্রমেই এই হারে বৃদ্ধি পেয়েছে?

হাজার হাজার বছর আগে আবির্ভূত হলেও গত ২০ থেকে ৩০ বছর ধরেই বহুগুণ বেড়েছে এই জুনোসগুলির প্রভাব। এর একটা বড় কারণ অবশ্য আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, যার প্রভাবে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বেশি করে। এই ছড়িয়ে পড়া রোগ ক্রমেই বিশাল এলাকা দখল করে, এবং ভাইরাসের সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় তা মানুষের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রকে ব্যাহত করে। মূলত শিল্প খামার, পশুদের মধ্যে রোগজীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়াও বন্য প্রাণীদের বাণিজ্যও এই রোগ ছিটিয়ে পড়ার একটা বড়ো কারণ। এতে পশুদের মধ্যে থাকা জীবাণুর সঙ্গে মানুষের এক্সপোজার বাড়ে। আরও একটা বড় দিক হল আধুনিক সময়ে বন উজাড়। এর ফলে বন্যপ্রাণী, গৃহপালিত প্রাণী এবং মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ফলত ভাইরাস সংক্রমণের সুযোগও বাড়ে।

২০২২ সালে বৈজ্ঞানিক জার্নাল নেচার দ্বারা প্রকাশিত একটি গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, জলবায়ুর পরিবর্তন আগামীদিনে আরও অনেক প্রাণীকে বাসযোগ্য জমির জন্য তাদের বাস্তুতন্ত্র থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করবে, ফলে তারা লোকালয়ে চলে আসতে পারে, এবং সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারে প্রাণঘাতী ভাইরাসও। মানুষের সংস্পর্শে এসে সেই ভাইরাসগুলি নতুন রোগের উত্থান ঘটাতে পারে বলেও গবেষণার দাবি।জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ গ্রুপ ২০২০ সালের অক্টোবরেই সতর্ক করেছিল এই বিষয়ে। তারা জানিয়েছিল, “প্রতিরোধমূলক কৌশল ছাড়াই, মহামারীগুলি আরও ঘন ঘন আবির্ভূত হবে, আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, আরও বেশি লোককে হত্যা করবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আগের চেয়ে আরও বিধ্বংসী প্রভাব ফেলবে”।

অন্যদিকে, ২০১৮ সালে একটি সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত অনুমান অনুসারে, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিদের মধ্যে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন অজানা ভাইরাস রয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই ভাইরাসগুলির মধ্যে ৫৪০,০০০ থেকে ৮৫০,০০০ মানুষকে সংক্রামিত করার ক্ষমতাও রয়েছে। তবে সবথেকে বেশি করে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী অবশ্য মানুষ নিজেই। মানুষের ক্রিয়াকলাপের বিস্তার এবং বন্যপ্রাণীর সঙ্গে বর্ধিত মিথস্ক্রিয়াই মানুষকে সংক্রামিত করতে সক্ষম ভাইরাসগুলির প্রকোপে যে ফেলছে, তা বলাই বাহুল্য।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।