২০ দিনে আক্রান্ত ২৪ কোটিরও বেশি মানুষ! করোনার নয়া রূপ কেন এত আতঙ্ক ছড়াচ্ছে চিনে?
Corona outbreak in China : বাড়ির পাশেই চিনের পরিস্থিতি কারও নজর এড়ায়নি। এখন সেখানে ফের করোনা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কও চরমে।

২৫ ডিসেম্বরে কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে কেবল মাথা আর মাথা। সোশ্যাল মিডিয়া, খবরের চ্যানেলে সেই অগুনতি ভিড়েরই একের পর এক ছবি, ফুটেজ। সকলে অবাক, এত মানুষ ক্রিসমাসের আনন্দে মেতে উঠেছেন! পার্ক স্ট্রিটে ভিড় করে কী এমন করছে সবাই, সেই প্রশ্নে ভ্রু ঈষৎ বেঁকেছেও। আবার বাংলার জনগণের একটা অংশ এই ছবি দেখে প্রমাদ গুনছে। ভয় পাচ্ছেন তাঁরা। ফের যদি করোনা বাড়ে?
দুর্গাপুজোর সময়ও তো মানুষজন ভিড় করে রাস্তায় বেরিয়েছিল। তাহলে এখন কেন হঠাৎ আতঙ্ক ফিরে আসছে? সৌজন্যে সম্প্রতি ঘটে চলা বেশকিছু খবর। অহরহ করোনা নিয়ে সতর্কবাণী, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, কেন্দ্রীয় সরকারের ঘনঘন বৈঠক… সব মিলিয়ে ফের বছর দুয়েক আগের শঙ্কায় ফিরে যাচ্ছে জনগণ। রাজ্যসভা, লোকসভায় মাস্ক মাস্ক পরে বসে আছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, উপ রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়, স্পিকার ওম বিড়লা। এই ছবি ফের সামনে এনেছে একটি প্রশ্নের। ফের করোনা বাড়ছে? তার মানে, ফের লকডাউন?
করোনা যে আবার বাড়তে শুরু করেছে, সেই খবর সত্যি। কিন্তু কেন্দ্র, রাজ্য দুই প্রশাসনই বারবার বলছে, লকডাউনের আশঙ্কার কোনও কারণ নেই। করোনা বাড়লেও, ভারতে পরিস্থিতি একেবারেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে যায়নি। কেবল বিপদ এড়াতে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। তবুও মুখ থেকে শঙ্কার রেখা যাচ্ছে না ভারতবাসীর। কারণ? বাড়ির পাশেই চিনের পরিস্থিতি কারও নজর এড়ায়নি। দু’বছর আগে এই চিনের উহান প্রদেশ থেকেই ছড়িয়ে পড়েছিল করোনা। তারপর কী হয়েছিল, সেই সংবাদ নতুন করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এখন ফের চিনে করোনা বেড়ে যাওয়ায় তাই আতঙ্কও চরমে।
চিনের পরিস্থিতি ঠিক কী?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Covid situation in India : ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট থেকেই এই ভ্যারিয়েন্টটি এসেছে। চিনের রিপোর্ট বলছে, প্রতিদিন ১০ লাখের বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন।
চিনের ন্যাশনাল হেলথ কমিশনের সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট যাবতীয় দুশ্চিন্তার মূলে। সেখানে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকে ২০ তারিখ অবধি সেখানে প্রায় ২৪৮ মিলিয়ন মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন! যা এখনও অবধি চিনের সর্বকালীন রেকর্ড। ২০২০, ২০২১-এর বীভৎসতার থেকেও বেশি মানুষ এবার আক্রান্ত হয়েছেন। এবং এই গ্রাফ হঠাৎ করেই বাড়তে শুরু করেছে। আর থামার নাম নিচ্ছে না। এও বলা হচ্ছে, আক্রান্তের সংখ্যাটা চিনের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৮ শতাংশ। বিপদ যে আরও বেশির দিকে যেতে পারে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও।
শুরু থেকেই চিনের শি জিনপিংয়ের প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট নিয়ম নিয়ে ময়দানে নেমেছিল। ‘জিরো কোভিড পলিসি’। করোনার বাড়বাড়ন্ত আটকাতে কড়া লকডাউনের পথে হেঁটেছিল তারা। তাতে গ্রাফ সামান্য কমলেও সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি যে হয়নি, তা বোঝাই যাচ্ছে। স্বাভাবিক জনজীবন ব্যহত হচ্ছে, এই দাবিতে আন্দোলনও শুরু হয়। সেই চাপা আগুনে ঘি দেয় নভেম্বরের একটি ঘটনা। চিনের একটি বিল্ডিংয়ে আগুন লেগে যাওয়ায় সেখানে আটকে পড়েন বেশকিছু মানুষ। বারবার সাহায্য চাওয়ার কথা বললেও কিছু হয়নি। জিরো কোভিড পলিসির জন্য দমকলও সময় মতো আসতে পারেনি। ফলে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান ১০ জন।
এরপরই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে চিন। বেজিং, সাংহাইয়ের রাস্তায় নামে শত শত মানুষ। একটাই দাবি ছিল, স্বাভাবিক জনজীবন ফেরত আনো। জিরো কোভিড পলিসি হটাও। বিক্ষোভের জেরে শেষমেশ খানিকটা পিছু হটে প্রশাসন। তারপরই ফের বাড়তে থাকে করোনা। ভাইরাসের নতুন স্ট্রেইন বিএফ.৭ (BF.7)-এর আক্রমণই বেশি। এই স্ট্রেইনের উপদ্রবই এখন চিনে ছড়িয়ে পড়ছে। ২০১৯-এর ডিসেম্বর এভাবেই দেখেছিল করোনার প্রাদুর্ভাব। তারপরই গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তাই এবারও ভয়টা জাঁকিয়ে বসছে মানুষের মনে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Covid Intranasal Vaccine : এটি ইনজেকশন নয়; এর জন্য যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে থাকতে হবে না। নাক দিয়ে এই ভ্যাকসিন নেওয়া যাবে!
যদিও যাবতীয় ভয় দূরে সরিয়ে রাখার কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের বক্তব্য, এই BF.7 করোনা ভ্যারিয়েন্টটি একেবারে নতুন নয়। প্রায় ২২ মাস ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর মতো স্ট্রেইনের উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। ওমিক্রনের মতো এরও মারণ ক্ষমতা তুলনামূলক অনেকটা কম হলেও, বেশি সংখ্যক মানুষকে আক্রান্ত করছে। ভাইরাসের মূল চরিত্রই হল সেটা। সাধারণত ভাইরাস চায়, যার দেহে সে বাসা বেঁধেছে, সে যেন জীবিত থাকে। তাহলে সেটিও নিজের কাজ করতে পারবে, বেঁচে থাকতে পারবে। বদলে যত বেশি সংখ্যক ‘হোস্ট’-এর দেহে ছড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই এখনই ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই।
তাহলে চিনে এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করল কেন এই স্ট্রেইনটি? এত বেশি সংখ্যক মানুষ কেন আক্রান্ত হচ্ছে সেখানে? এর পিছনে বেশকিছু কারণ তুলে ধরছেন গবেষকরা।
চিনের পরিস্থিতির পিছনে কারণ?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Covid and Depression: কোভিড ১৯-এর প্রভাবে শিশু ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার ওপর যে প্রভাব পড়েছে তা অনেকদিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে।
প্রথম ও প্রধান কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সঠিকভাবে ভ্যাকসিনেশনের অভাব। চিন প্রশাসনেরই একটি রিপোর্টের দিকে নজর দেওয়া যাক। সেখানে বলা হচ্ছে, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের টিকাকরণ সম্পূর্ণ হয়নি। সেইসঙ্গে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা মানুষদেরও ভ্যাক্সিনেশন হয়নি। প্রশাসনের তথ্য বলছে, চিনের ৩০ শতাংশ বয়স্ক মানুষদের টিকাকরণ সম্পূর্ণ হয়নি। বুস্টার ডোজও নেননি অনেকে। এই ৩০ শতাংশ মানে কত? সংখ্যাটা ৮০ মিলিয়ন! মানে প্রায় ৮ কোটি!
চিনের জনসংখ্যার হিসেবে কম হলেও, সংখ্যাটি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিরো কোভিড পলিসি প্রয়োগের আগেও সঠিকভাবে ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রামের প্রয়োজন ছিল। যাতে দেশের বেশিরভাগ মানুষ টিকার সুবিধা পান। সেটা হলে করোনার এমন আকস্মিক প্রকোপ অনেকটাই আটকানো যেত। জিরো কোভিড পলিসি যে কোনও কিছু না ভেবে প্রয়োগ করা হয়েছে, সে কথা সরাসরি বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকরা এও বলছেন, কেবল ভ্যাকসিনের মাধ্যমেই ইমিউনিটি তৈরি হয় না। ‘হার্ড ইমিউনিটি’র জন্য প্রয়োজন স্বাভাবিক জনজীবন। একেবারে লকডাউন নয়, কড়া বিধি নিষেধের মধ্যে যদি জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করা যেত, তাহলে মানুষের দেহে স্বাভাবিক একটা প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠত। চিনের প্রশাসনের সিদ্ধান্তের জন্য সেটাও ব্যাপকভাবে হয়নি। ফলে জিরো কোভিড পলিসি এখন ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে।
চিনের জিংপিনের সরকারের আরও একটি প্রচার ছিল। ‘ব্যাক টু দ্য ওল্ড ট্র্যাডিশন’। চিনের প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতির দিকে জোর দিয়েছিল প্রশাসন। উল্টোদিকে, বিদেশি ভ্যাকসিনের ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। ফলে জন সাধারণের মধ্যে একটা প্রাথমিক অবিশ্বাস তৈরি হয়ে যায়। সেজন্য অনেকেই ভ্যাকসিন নেননি। বাইরে থেকে ভ্যাকসিন না আসার ফলে হঠাৎ এই করোনার বাড়বাড়ন্তে মুখ থুবড়ে পড়েছে চিনের ফার্মাসিউটিকাল ইন্ডাস্ট্রি। জিরো কোভিড পলিসির জন্য ওষুধের সাপ্লাই চেনও ভেঙে পড়ে একেবারে। যার ফল বর্তমান স্পাইক।
আর ভারত?
তবে ভারতে এই পরিস্থিতি নেই। ভ্যাকসিনেশনে বারবার জোর দেওয়া হয়েছে। ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি নিজেদের মতো করে চেষ্টা করে চলেছে। বিশেষ ন্যাজাল ভ্যাকসিনও বাজারে চলে এসেছে। ভারতের একটা বড়ো অংশের মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েও গিয়েছে। ফলে ভারত ও অন্যান্য জায়গায় করোনা নিয়ে এখনই ভয় পাওয়ার কারণ নেই বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞরা। প্রয়োজন কেবল একটু সচেতনতা, বিধি নিষেধ মেনে চলার।







