রাতে যে অভিশপ্ত রাস্তারা জেগে ওঠে, ভারতের কুখ্যাত হাইওয়েগুলির হাড় হিম করা কাহিনি

Sindhu Som
৫ মিনিট
রাতে যে অভিশপ্ত রাস্তারা জেগে ওঠে, ভারতের কুখ্যাত হাইওয়েগুলির হাড় হিম করা কাহিনি

এই উপমহাদেশ কিংবদন্তির দেশ। ভয় তার বিচিত্র সব আদল নিয়ে এর গ্রামে গ্রামে মিশে ছিল বহুদিন। নগর থেকে সহর—বিবর্তনের মধ্যেও তার ছায়া রয়ে গিয়েছে। যদিও ভারতে বিদ্যুৎ আসার আগে ও পরে একটা বিশাল পার্থক্য ঘটে গিয়েছিল সংস্কৃতি ও সাহিত্যে, কিন্তু মুখে মুখে যা ফেরে তা কি মনের অলিতে গলিতে বাস করে না? সেই অলি গলি ক্রমাগত বদলে যেতে থাকে। সে গলি কাঁচা হোক বা পাকা, দিনের শেষে আমাদের যাবতীয় ভয় নতুন অবয়বে সেখানে খাপে খাপে এঁটে যায়, কারণ ভয় তরল। ভয় যৌন। ভয় ‘অতি’-র আখ্যান। এই অতিলৌকিক ঘটনায় ভরপুর কয়েকটি রাস্তার গল্প আজ পাঠকের দরবারে হাজির করা যাক। ভয় সেখানে চার দেওয়ালের মধ্যে নয়, নেমে এসেছে খোলা আকাশের তলায়। ভানগড় ভারতের একমাত্র জায়গা, যাকে অফিসিয়ালি ভৌতিক জায়গা বলে স্বীকার করেছে সরকার। তার বাইরেও এমন ভয়ের জায়গা রয়ে গিয়েছে কত। আজ যে সমস্ত রাস্তার গল্প বলব, এই সব রাস্তায় অ্যাক্সিডেণ্ট হয়েছে অনেক। বহু উত্তম পুরুষের বয়ানেই উঠে এসেছে হাড় হিম করা ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা। বেশিরভাগ জায়গায় রাতে কোথাও কোথাও আবার দিনেও। কাজেই সাধু, সাবধান। অতিসুন্দর এই সমস্ত রাস্তার বুকে ঘুমিয়ে রয়েছে অতিভয়ঙ্কর সব অস্তিত্ব। যা রাতে পথচারীর ঘুম কেড়ে নেয়।

কাসারা ঘাট, মুম্বই, নাসিক

মাইলের পর মাইল সবুজ আর সবুজ। মাঝ বরাবর সেই সবুজ কেটে ছুটে যাচ্ছে রাস্তা। এমন রাস্তায় যেতে যেতে জুড়িয়ে আসে চোখ। এমন রাস্তা প্রলুব্ধ করে পথিককে বারবার। মুম্বই-নাসিক হাইওয়ে এমনই এক রাস্তা। দুদিকে গাছগাছালি ভরে রয়েছে। অনাবিল সুন্দর। কিন্তু এমন সুন্দরের মাঝেও বিভীষিকা। এই হাইওয়ের ওপর কসারা ঘাট অঞ্চলে রয়েছে ভৌতিক উৎপাত। বহুলোকে নাকি এই অঞ্চলে মাথাকাটা এক মহিলাকে দেখেছে গাছের উপর বসে থাকতে। সেই সঙ্গে শোনা যায় অপার্থিব এক হাসি। এই অঞ্চল পার হবার সময় গাছের দিকে যতটা কম পারা যায় তাকানোই ভালো।

সথ্যামঙ্গলম ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি করিডোর / এন এইচ ২০৯, তামিলনাড়ু

২০৯ নং জাতীয় সড়কের একটা অংশ গিয়েছে সথ্যমঙ্গলম ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির মধ্যে দিয়ে। তামিলনাড়ুর এই বনেই ছিল কুখ্যাত বীরাপ্পনের আস্তানা। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়িতে যাওয়ার মজাই আলাদা। তবে এই অংশটিকে বলা হয় তামিলনাড়ুর সবথেকে ভৌতিক উৎপাতের অঞ্চল। স্থানীয় বাসিন্দারা এবং যাত্রীরা বারবার জানিয়েছেন যে তারা এই পথ পেরনোর সময় আর্ত চিৎকার শুনেছেন। দেখা গেছে বাতাসে ভেসে থাকা লণ্ঠনও। এছাড়াও নানাবিধ অলৌকিক অভিজ্ঞতা হয়েছে তাদের। অনেকে বিশ্বাস করেন বীরাপ্পনের অশরীরী আত্মা এখনও এই জঙ্গলে রয়ে গিয়েছে।

দিল্লি জয়পুর হাইওয়ে, ভানগড় ফোর্টের আশেপাশে

দিল্লি থেকে আলওয়ার হয়ে জয়পুর যেতে, মাঝে একটা রাস্তা পড়ে। জাতীয় সড়ক ১১। এই রাস্তা দিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় ভানগড় দুর্গেও। ভানগড়ের ভৌতিকতা বেশ জনবিদিত বর্তমানে। এর উপর হয়ে গিয়েছে চলচ্চিত্রও। কিন্তু শোনা যায়, ভানগড়ে যাওয়ার এই রাস্তাটিতেও ভৌতিক উৎপাত হয়ে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা এমন সব ভয়াবহ ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন, যার কোনো যুক্তিসম্মত ব্যখ্যা পাওয়া যায়নি। ভানগড়ের আশেপাশের এই অঞ্চলে রাস্তায় সব সময় ঘনিয়ে থাকে এক অশুভ অনুভূতি।

কসেড়ি ঘাট, গোয়া থেকে মুম্বই

গোয়া থেকে মুম্বই যাওয়ার পথে কসেড়ি ঘাট পড়ে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এই রাস্তায় রক্তপিপাসু মাংসখেকো ডাইনীরা ঘুরে বেড়ায়। বহু মানুষ এই ডাইনীদের দেখেছেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। প্রত্যেকের মুখে, পিঠে, ঘাড়ে আঁচড়ের দাগ পাওয়া গেছে। এবং প্রত্যেকের দাবী, গাড়ি হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায় মাঝ রাস্তায় এবং গাড়িতে যদি আমিষ খাবার কিছু থাকে, তা মুহূর্তের মধ্যেই গায়েব হয়ে যায়। কসেড়ি ঘাট পেরোনোর সময় মাংসজাতীয় খাবার না রাখাই ভালো।

টু লেন ইস্ট কোস্ট রোড, চেন্নাই-পণ্ডিচেরী

চেন্নাই থেকে পণ্ডিচেরী রোড ট্রিপে গেলে পথিক খুঁজে পাবেন ইস্ট কোস্ট রোড। এই রাস্তাকে চালকের স্বর্গও বলা হয়ে থাকে। টু লেনের এই হাইওয়েতে গাড়ি চালিয়ে প্রভূত আরাম, উপরন্তু দুপাশে ছবির মতো সব দৃশ্য। কিন্তু সন্ধের পরে রাস্তাটাকে এড়িয়ে চলে সবাই। রাস্তাটায় আলো অত্যন্ত কম, এবং নানা অলৌকিক ঘটনা সেখানে ঘটে চলে একের পর এক—এমনটাই শোনা যায়। বিশেষত শোনা যায় এক সাদা শাড়ি পরা মহিলার কথা, যে কিনা ড্রাইভারদের অন্যমনস্ক করে, ফলে ভয়াবহ অ্যাক্সিডেণ্ট ঘটে চলে এই রাস্তায়। যাত্রীদের কেউ কেউ রাস্তার এই অংশে হঠাৎ করে তাপমাত্রা নেমে যেতেও দেখেছেন।

খুনি নালা, জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়ে

একের পর এক বীভৎস সব দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুতে অতিষ্ট হয়ে স্থানীয়রা জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়ের একটা অংশকে খুনি নালা বলে ডেকে থাকে। জনশ্রুতি, এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলা এইখানে আত্মহত্যা করেছিল। তারপর থেকেই বাচ্চা কোলে এক মহিলাকে এই রাস্তায় দেখা যায় মাঝে মাঝেই, রাতের বেলায়। যার ফলে দুর্ঘটনার বিপত্তি।

রাঁচি-জামশেদপুর, এন এইচ ৩৩

এই রাস্তায় একের পর এক হয়ে চলা দুর্ঘটনার কোনো যৌক্তিক ব্যখ্যা পাওয়া যায় না। অদ্ভুত অদ্ভুত সব উপায়ে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে থাকে। কেউ কেউ ভৌতিক উপদ্রবকে এই জন্য দায়ী করেন, অপরেরা মনে করেন এই রাস্তা অভিশপ্ত। এর এক স্থানে রাস্তার দুই দিক জুড়ে রয়েছে একটি মন্দির। বিশ্বাস করা হয়, এই দুই মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে যদি প্রার্থনা না করা হয়, তবে আরোহীর বিপদ ঘনিয়ে আসে অদূরেই।

দিল্লি ক্যাণ্টনমেণ্ট রোড

অনেকেই দিল্লি ক্যাণ্টনমেণ্ট রোড দিয়ে যাতায়াতের সময় এক সাদা শাড়ি পরা মহিলাকে দেখেছেন। এই মহিলা লিফট চেয়ে ফেরেন। স্থানীয় লোকেদের বিশ্বাস রাস্তাটি ভুতূড়ে। এবং তারা এই রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বেরতে ভয় পান, বিশেষত রাতে। গাড়ি না থামালে মহিলাটি গাড়ির বেগে অবিশ্বাস্য গতিতে পাশে পাশে ছুটে চলেন বা বলা ভালো………ভেসে চলেন।

ব্লু ক্রস রোড, চেন্নাই

এই রাস্তায় বহু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে গিয়েছে। রাস্তাটিকে চেন্নাইয়ের সবথেকে ভুটুড়ে রাস্তার মধ্যে অন্যতম ধরা হয়। গাছে ঢাকা এই রাস্তায় দিনের বেলাতেই ঢোকে না আলো। রাতের বেলা ঘুটঘুটে অন্ধকারে অনেকেই মানুষের মতো কিছু ছায়াকে ভেসে থাকতে দেখেছেন।

এছাড়াও থানের ইস্টার্ন এক্সপ্রেস হাইওয়ে,গোয়ার আইগরকেম রোড, এন এইচ ১৭ বা মুম্বই-গোয়া হাইওয়ে, মহারাষ্ট্রের মুলন্দে জন্সন অ্যাণ্ড জন্সন রোড, মার্ভে এবং মঢ় আইল্যাণ্ড রোড—এই সমস্ত রাস্তাগুলি ভৌতিক উপদ্রবের জন্য কুখ্যাত। যা আশ্চর্য লাগে, যে প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই উপদ্রবকারী একজন মহিলা। গাড়ি চালনার ক্ষেত্র জুড়ে এখন মহিলারা যথেষ্ট পারদর্শী, কিন্তু একটা সময় ছিল যখন চালকদের অধিকাংশই ছিল পুরুষ। এখনও দূরপাল্লার ট্যক্সি ড্রাইভারের পেশায় ভারতীয় মহিলাদের তেমন দেখা যায় না। ভূতের বিশেষ লিঙ্গের সঙ্গে এই চালকের লিঙ্গ অনুপাতের কোনও যোগ থাকলেও থাকতে পারে। তবে দেখার বিষয়, ভয় কেমন চারিয়ে যায় গ্রাম থেকে নগর হয়ে শহরে। এইসব কিংবদন্তী কিন্তু আলোকোজ্জ্বল শহুরে রাস্তার শহুরে কিংবদন্তিই। কারণ একটাই। ফিরে বলতে হয়, ভয় তরল। ভয় অতিলোকের ইশারা।

তথ্যঋণ-

April 4, Samonway Duttagupta, 2016 UPDATED: April 14, and 2016 15:32 Ist. “5 Haunted Roads in India Every Traveller Must Avoid.” India Today.

ItsGoa. “Avoid These Haunted Places in Goa That Can Give You The Chills,” November 4, 2021.

News18. “India’s Haunted Roads, Highways Where People Reported Spooky Activities,” September 17, 2021.

Pawar, Bhagyashri. “Be Warned। Drive Down These 10 Haunted Roads in India Only If You Must।”

Srivastava, Priya SrivastavaPriya, Read More, and Resham SengarResham Sengar. “Haunted Indian Roads That You Should Avoid।” The Times of India.

“Supposedly Haunted National Highways in India।” The Times of India.

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।