IBD রোগীদের জন্য সুখবর! অন্ত্রের নতুন ‘মাস্টার সুইচ’ আবিষ্কার করলেন বিজ্ঞানীরা
Gut Health: এখন আলসারেটিভ কোলাইটিস রোগীদের উপর 'TL1A-ব্লকিং অ্যান্টিবডি'-র ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলছে। গবেষকরা আশা করছেন, এই গবেষণার সূত্র ধরে আগামী দিনে ওষুধের কার্যকারিতা আরও নিখুঁত করা যাবে।
পেটের ভিতরের এক অদ্ভুত ও জটিল রহস্য উন্মোচন করলেন একদল বিজ্ঞানী। আমাদের অন্ত্র বা পাকস্থলীতে (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'গাট' বলা হয়) কোটি কোটি ভালো এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বাস করে। এই ব্যাকটেরিয়াদের সামলানো এবং শরীরকে সুস্থ রাখার পিছনে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে এতদিন বিজ্ঞানীদের মনে অনেক ধোঁয়াশা ছিল।
সম্প্রতি 'ইমিউনিটি' জার্নালে প্রকাশিত ওয়েইল কর্নেল মেডিসিন-এর গবেষকদের একটি নতুন গবেষণা এই রহস্যের জট অনেকটাই খুলে দিয়েছে। গবেষকরা অন্ত্রের কোষে এমন এক ‘মাস্টার-সুইচ’ বা প্রধান নিয়ন্ত্রকের খোঁজ পেয়েছেন, যা একই সঙ্গে আমাদের শরীরকে ক্ষতিকর জীবাণু থেকে বাঁচায়, আবার পেটের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলিকে পরম যত্নে আগলে রাখে।
এই মাস্টার-সুইচ ভবিষ্যতে পেটের দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেমন আইবিডি (IBD)-এর চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
শরীরের ভিতর এক ‘দুটি সত্তার’ প্রোটিন
গবেষকরা মূলত TL1A নামক একটি ইমিউন প্রোটিন নিয়ে কাজ করছিলেন। পেটের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ বা আইবিডি (IBD) রোগীদের শরীরে এই প্রোটিনটি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। চিকিৎসকরা জানতেন যে এটি প্রদাহ বাড়ায়, কিন্তু আণবিক স্তরে এর আসল কাজটা কী, তা স্পষ্ট ছিল না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক বিকাশ কুমার দুবের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল এই কৃতিত্ব দেখিয়েছে। গবেষক শিবকুমার এবং রাজ বাহাদুর সিং-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে তাঁরা এমন একটি রাসায়নিক যৌগ চিহ্নিত করেছেন, যা ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে স্তন ক্যানসারের কোষগুলিকে সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেল, এই TL1A প্রোটিনটি অন্ত্রের রোগ প্রতিরোধক কোষে থাকা BHLHE40 নামক আরেকটি প্রোটিনকে সক্রিয় করে তোলে। এই BHLHE40 প্রোটিনটিই হলো সেই আসল ‘মাস্টার-সুইচ’।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই মাস্টার-সুইচটি শরীরে একসঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত দুটি ভূমিকা পালন করে। যখনই বাইরে থেকে কোনো ক্ষতিকর জীবাণু বা প্যাথোজেন পেটে আক্রমণ করে, তখন এই প্রোটিনটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সজাগ করে তোলে এবং ক্ষতিকর জীবাণুকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
আবার এই একই প্রোটিন আমাদের পেটের স্বাভাবিক ও উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলির সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখে, যাতে শরীর ভুল করে নিজের উপকারী বন্ধুদের উপর আক্রমণ না করে বসে। এর ফলে অহেতুক কোনো প্রদাহ বা জ্বালাপোড়া তৈরি হতে পারে না।
কীভাবে কাজ করে এই প্রক্রিয়া?
গবেষণাগারে ইঁদুরের উপর পরীক্ষা এবং আইবিডি রোগীদের আগের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, এই BHLHE40 প্রোটিনটি মূলত তিন ধরনের রোগ প্রতিরোধক কোষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের এক চমৎকার সেতু তৈরি করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দিনের পর দিন বহু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আমাদের চেনা অ্যান্টিবায়োটিকগুলির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলছে। ডাক্তারদের ভাষায় একে বলে 'অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স'। সাধারণ ইনফেকশন বা সংক্রমণও এখন অনেক সময় আর ওষুধে সারতে চাইছে না। এই চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানীরা এবার নজর দিয়েছেন মাটির গভীরে, এক অদ্ভুত অণুজীব জগতের দিকে।
প্রথম কোষ (ILC3): অন্ত্রে থাকা এই বিশেষ কোষে যখন TL1A প্রোটিন আসে, তখন BHLHE40-এর উৎপাদন নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। এটি কোষের উপরিভাগে OX40L নামক আরেকটি প্রোটিন তৈরি করে, যা আসলে একটি বিশেষ সংকেত বা সিগন্যাল।
দ্বিতীয় কোষ (ROR-gamma-t APC): এই কোষগুলি BHLHE40-এর উপস্থিতিতে পেটের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলির প্রতি শরীরের সহনশীলতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেয়।
তৃতীয় কোষ (Tregs বা রেগুলেটরি টি-সেল): উপরের দুই বন্ধুর পাঠানো সংকেত পেয়ে এই কোষগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এদের মূল কাজ হলো উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলির আশেপাশে যেন অহেতুক কোনো অশান্তি বা প্রদাহ তৈরি না হয়, সেই পরিবেশকে শান্ত রাখা।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, জিনগত কারণে যদি শরীর থেকে এই BHLHE40 প্রোটিনটিকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে উপকারী ব্যাকটেরিয়াদের শান্ত রাখার সিগন্যাল বা OX40L-এর মাত্রা অনেক কমে যায়। ফলে পেটের ভিতরের পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে এবং প্রদাহ মারাত্মক আকার ধারণ করে।
আইবিডি (IBD) কী এবং কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ বা আইবিডি (IBD) হলো পেটের এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত সমস্যা, যা সহজে সারে না এবং বারবার ফিরে আসে। ক্রোনস ডিজিজ (Crohn's disease) এবং আলসারেটিভ কোলাইটিস (ulcerative colitis)—এই দুই ধরনের জটিল রোগকে একসঙ্গে আইবিডি বলা হয়। শুধু আমেরিকাতেই প্রায় ২৪ থেকে ৩১ লাখ মানুষ এই রোগে ভুগছেন, আর বিশ্বজুড়ে এই সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি।
এতদিন এই রোগের প্রচলিত চিকিৎসায় শরীরের সামগ্রিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ওষুধ দিয়ে কমিয়ে বা চেপে (immune suppression) রাখা হতো। এতে সাময়িক আরাম মিললেও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে অন্য কোনো ইনফেকশন বা জীবাণুর আক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বয়স ধরে রাখা বা চিরযৌবন পাওয়ার গবেষণায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বজুড়ে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন প্রযুক্তি ব্যবসায়ী (টেক এন্টারপ্রেনার) ব্রায়ান জনসন। তবে বহু বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালার পর, নিজের এই দীর্ঘ পথচলা থেকে তিনি বেশ অদ্ভুত এবং সহজ একটি শিক্ষা পেয়েছেন।
ঠিক এই জায়গাতেই নতুন গবেষণাটি আশার আলো দেখাচ্ছে। এই গবেষণার প্রধান লেখক ড. উই ইয়াং এবং সিনিয়র গবেষক ড. র্যান্ডি লংম্যান (পরিচালক, জিল রবার্টস সেন্টার ফর ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ) জানান, এই আবিষ্কারের ফলে আমাদের সামনে এক নতুন মডেল বা ধারণা চলে এসেছে।
এখন বিজ্ঞানীরা আর পুরো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল না করে, সুনির্দিষ্টভাবে এই BHLHE40 বা OX40L-এর পথটিকে লক্ষ্য করে ওষুধ তৈরি করতে পারবেন। এর সুবিধা হলো—উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলির কোনো ক্ষতি না করেই পেটের ক্ষতিকর প্রদাহ বা জ্বালাপোড়াকে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
বর্তমানে আলসারেটিভ কোলাইটিস রোগীদের উপর 'TL1A-ব্লকিং অ্যান্টিবডি'-র ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলছে। গবেষকরা আশা করছেন, এই গবেষণার সূত্র ধরে আগামী দিনে ওষুধের কার্যকারিতা আরও নিখুঁত করা যাবে। এমনকী চিকিৎসায় রোগীরা কেমন সাড়া দিচ্ছেন, তা জানার জন্য শরীরের 'OX40L' প্রোটিনের মাত্রাকে নির্দেশক বা মার্কার হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
আমাদের পেট ও অন্ত্রের মতো শরীরের ভিতরের আর্দ্র অংশগুলি কীভাবে ক্ষতিকর শত্রুকে তাড়িয়ে পরম সুহৃদের মতো উপকারী বন্ধুদের আগলে রাখে, এই গবেষণা তা খুব সহজ করে বুঝিয়ে দিল। ল্যাবরেটরির এই সাফল্য আগামী দিনে আইবিডি বা কোলাইটিসের মতো পেটের অতিষ্ঠ করা রোগে আক্রান্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে স্থায়ী স্বস্তি এনে দেবে, এটাই এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
উৎস:
তথ্যসূত্র:
Yang, W., et al. (2026) Transcription factor BHLHE40 expression in group 3 innate lymphoid cells and RORγt⁺ antigen-presenting cells coordinates intestinal immunity. Immunity. DOI: 10.1016/j.immuni.2026.06.007. https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S107476132600258X?dgcid=author






