দাড়ি রাখবেন? দিতে হবে ট্যাক্স!

Satyaki Tat
৩ মিনিট
দাড়ি রাখবেন? দিতে হবে ট্যাক্স!

দাড়ি, কী দারুণ একটা বিষয় না? আমাদের পুরুষদের কীরকম লুকটাই পাল্টে যায়? একবিংশ শতাব্দীতে তো দাড়ি পরিচর্যা করারও কত জিনিস পাওয়া যায়! দাড়ির জন্যে তেল, ক্রিম, শ্যাম্পু। আপনিও নিশ্চয়ই ব্যবহার করেন? এবার একটা মজার প্রশ্ন করি। আচ্ছা, যদি দাড়ি রাখার জন্যে আপনাকে ট্যাক্স দিতে হতো? অবাক হলেন? মানে ভাবছেন নিশ্চয়ই এ কেমন রসিকতা করছি? আচ্ছা, আপনি পিটার দ্য গ্রেট-এর নাম শুনেছেন? সব ঘেঁটে যাচ্ছে না? বেশ। চলুন, আপনাকে টাইম মেশিনে করে নিয়ে যাই সতেরো শতকের রাশিয়ায়। যখন বিশ্বের বৃহত্তম দেশের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটছে পাশ্চাত্যের আধুনিকতার।

সালটা ১৬৮২। সিংহাসনে বসলেন জার অ্যালেক্সের ১৪-তম সন্তান পিটার, যিনি পরবর্তী কালে পিটার দ্য গ্রেট নামে ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবেন। জানি পাঠক, পিটারের প্রসঙ্গ কেন উঠেছে সেটা এতক্ষণে বুঝে গেছেন। তবে যে কারণে উঠেছে ভাবছেন, তার থেকে অনেক বৃহৎ তিনি এবং কেন দাড়ি রাখার জন্যে কোনও রাজা, থুরি জার ট্যাক্স বসাবেন সেটার প্রেক্ষাপটটাও আমাদের জানতে হবে।

১৬৮২ সালে যখন পিটার সিংহাসনে বসেন তখন তিনি একা রাজত্ব করার সুযোগ পাননি। তাকে সিংহাসন ভাগ করে নিতে হয়েছিলো তার ভ্রাতা পঞ্চম ইভানের সঙ্গে। ১৬৯৬ সালে ইভানের মৃত্যুর পর পিটার পুরো তখত্ এর মালিকানা পান। পিটার যে সময়ে রাশিয়ার জার হন, তখন ইউরোপের বাকি দেশগুলির তুলনায় রাশিয়া অনেকটাই অনুন্নত। ইউরোপে যখন "রেঁনেসাস" বা নব জাগরণের নতুন সূর্য উঠছে, ঢেউ উঠছে শিল্প বিপ্লবের, সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি সবেতেই যখন অভাবনীয় সাফল্য পাচ্ছেন তাঁরা, তখন রাশিয়া সেই সব কিছু থেকে সচেতনভাবে নিজেদের দূরে রেখেছে। একইসঙ্গে এটা বলাও খুব প্রয়োজন যে, রাশিয়ার নৌ-বাহিনীও খুব দুর্বল ছিল, যে কারণে ব্রিটেন, স্পেন, হল্যান্ড, পর্তুগাল যখন পৃথিবী জয় করে বেড়াচ্ছে, তখন রাশিয়া ছিল এক দর্শক মাত্র।

পিটার এই অচলায়তনের ভক্ত ছিলেন না। তিনি রাজি ছিলেন না শুধু মাত্র দর্শক হিসেবে বসে ইউরোপীয় শক্তিদের উত্থান দেখতে। একক জার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে প্রথমেই তিনি ইউরোপ ভ্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন। সাল ১৬৯৭, সার্জেন্ট পিয়োটর মিখাইলভের ছদ্মবেশ ধারণ করে, ২৫০ জনের এক বিরাট দল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি, সচক্ষে তাদের কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে এবং নিজের দেশে সেই ব্যবস্থা চালু করতে।

জানা যায়, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শিপইয়ার্ডে চার মাস কাজ করে আধুনিক জাহাজ তৈরির প্রযুক্তির ব্যপারে বিষদে শেখেন। তারপরে জানা যায়, তিনি গ্রেট ব্রিটেনে গিয়েও জাহাজ তৈরির শিক্ষা নিতে থাকেন, এবং একেবারে রয়্যাল নেভির ডকইয়ার্ড থেকে শেখা শুরু করেন। শুধু এতেই তিনি থেমে থাকেননি, কারখানা, স্কুল, অস্ত্রাগার, জাদুঘর এমনকি পার্লামেন্টের অধিবেশন পর্যন্ত তিনি চাক্ষুষ করে আসেন।

দেশে ফিরেই তিনি রাশিয়াকে ইউরোপের সমকক্ষ করার কাজে লেগে পড়েন। অর্থনীতি, সরকার, সংস্কৃতি, ধর্ম সবেরই পাশ্চাত্যকরণের কাজ তিনি শুরু করেন। এ কথা বলাই বাহুল্য যে, পিটার একা হাতে রাশিয়াকে পাল্টে ফেলেন এবং অত্যন্ত শক্তিশালী এক দেশে পরিণত করেন। এই প্রক্রিয়ায় তিনি রাশিয়ায় সরকারি এবং বেসরকারি সব ক্ষেত্রেই বেশ কিছু সংশোধনী আনেন। যার মধ্যে ছিল রাশিয়ার ক্যালেন্ডার, রাশিয়ান লেখার ধরন, রাশিয়ার সেনা এবং সব থেকে বিতর্কিত সেই পদক্ষেপ, যে কারণে এই লেখাটা। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। তিনি সমস্ত রুশ পুরুষের দাড়ি রাখা নিষিদ্ধ করেন, কারণ তাঁর দীর্ঘ ইউরোপ যাত্রায় তিনি দেখেন, সেখানকার পুরুষরা দাড়ি রাখেন না।

মার্ক মানচিনি লিখছেন, পিটার তার এই দাড়িবিহীন যাত্রা বেশ নাটকীয়ভাবে শুরু করেন। তিনি দেশে ফেরার পর তাঁর অভ্যর্থনা সভায় সমস্ত অতিথিদের চমকে দিয়ে এক বিরাট ক্ষুর বের করেন এবং তাঁর সমস্ত অতিথিদের দাড়ি নিজের হাতে কেটে ফেলেন।

তিনি ঘোষণা করেন, রাশিয়ার কোনও পুরুষ দাড়ি রাখতে পারবেন না। স্বাভাবিক ভাবেই এই ঘোষণাকে রুশ পুরুষেরা একেবারেই ভালো চোখে দেখেননি।

মানচিনি লিখছেন, কিছুদিন যেতেই জার একটু নরম হন। তিনি দেখেন, দাড়ি রাখতে দিয়ে তিনি রাষ্ট্রের কোষাগার ভরিয়ে ফেলতে পারবেন। শুরু হয় দাড়ি কর। ব্যবসায়ী এবং অভিজাত দের জন্যে কর ধার্য হয় বছরে একশো রুবল, এবং সাধারণ মানুষের জন্যে তা থাকে মাত্র এক কোপেক। একশো রুবল করের টোকেন হয় রুপোর এবং এক কোপেকের তামা।

পিটার দ্য গ্রেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ কম ছিল না। জানা যায়, তিনি বেশ অত্যাচারী ছিলেন, এমনকি নিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র অ্যালেক্সেইকে তিনি হত্যা করেন তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে। কিন্তু ইতিহাসে তিনি আধুনিক রাশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই বিখ্যাত হয়ে থাকবেন। যিনি রাশিয়ার নৌ-বাহিনী স্থাপন করেন, চার্চের গোঁড়ামির বিরোধিতা করে তার ওপর অনেকটাই কর্তৃত্ব স্থাপন করেন, সরকারি কাজের আধুনিকীকরণ করেন, শিল্প ব্যবস্থাকে উন্নত করেন, জুলিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন এবং প্রথম রাশিয়ান সংবাদপত্র চালু করেন।

ইতিহাসে তিনি কিন্তু একমাত্র নন যিনি দাড়ি কর চালু করেন। এমন বিচিত্র আইন এর আগে ইংল্যান্ডের ষষ্ঠ হেনরিও প্রণয়ন করেছিলেন, তবে হ্যাঁ, তাঁর পিটারের মত কারণ ছিল না।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।