কলেজে পড়াতে পিএইচডি লাগবে না! গবেষকদের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে...

rudranjan
৪ মিনিট
কলেজে পড়াতে পিএইচডি লাগবে না! গবেষকদের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে...

‘আমি যে রিসার্চ স্কলার, দিন কি এমন যাবে? বলি ও মোদি-ইরানি, আমার হাঁড়ি চড়বে কবে?’

২০১৫ সালে প্যারোডিটি লিখেছিল ‘চিড়িয়াখানা’ গানের দল। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী তখন স্মৃতি ইরানি। সে বছর হঠাৎ নন-নেট এমফিল ও পিএইচডির স্কলারশিপ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইউজিসি। তারপরেই ‘আমি যে রিক্সাওয়ালা’ নামক গানটির কথাগুলিকে খানিক বদলে লেখা হয়েছিল প্যারোডিটি। এর পর কেটে গিয়েছে সাতটি বছর। অতিমারির দাপটে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়েছে স্কুল কলেজের দরজা। কিন্তু তার সঙ্গে এবার কি গবেষণায় উৎসাহদানও বন্ধ হওয়ার মুখে? ইউজিসির নতুন নিয়ম তো সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গত ১২ মার্চ ইউজিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পড়ানোর জন্য আর বাধ্যতামূলক নয় পিএইচডি। এমন কী নেট না থাকলেও পড়ুয়ারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে পারবেন। যদিও সিদ্ধান্তটি এখনও পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি। কেবলমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং, পলিসি এবং কমিউনিকেশনের পড়ুয়ারাই ইউজিসির নতুন নীতির আওতায় পড়বেন। ইউজিসির মুখ্য আধিকারিক জগদীশ কুমার জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামোকে আরও উন্নতমানের করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন অনেক বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন যাঁদের হয়ত পিএইচডি নেই কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে তাঁরাও এ বার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুযোগ পাবেন। তিনি এও জানিয়েছেন যে এই নতুন নিয়মের প্রেক্ষিতে এ বার থেকে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ‘প্রফেসর অফ প্র্যাকটিস’ বা ‘অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অফ প্র্যাকটিসে’র মতো বেশ কিছু নতুন পদ তৈরি করা হবে।

পিএইচডি নিয়ে চার-পাঁচ বছরে ইউজিসি ঘনঘন নিয়ম পরিবর্তন করেছে। ২০১৮ সালে জানানো হয়, পিএইচডি ছাড়া পড়ুয়ারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারবেন না। ২০২১ সালে এই নিয়ম চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই ২০২১ এই ফের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। কোভিডের কারণে অনেকেই সে বছর গবেষণাপত্র জমা দিতে পারেননি। ইউজিসির সচিব রজনীশ জৈন জানান, তাঁদের কথা মাথায় রেখেই ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার ক্ষেত্রে পিএইচডির বাধ্যতায় ছাড় দেওয়া হল। এর ঠিক এক বছরের মাথায় ফের পাল্টে গেল নিয়ম। ইউজিসির এমন খামখেয়ালিপনার ফল শেষ পর্যন্ত গবেষকদের ভুগতে হবে না তো?

তাদের যুক্তি, শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ করতেই পিএইচডি নেই এমন পড়ুয়াকে শিক্ষকতার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আসল কারণটা বোধহয় তা নয়, মনে করছেন অনেকেই। একজন পড়ুয়ার গবেষণার কাজ শেষ করার মোট নির্ধারিত সময় পাঁচ বছর। অতিমারির ফলে বহু ক্ষেত্রেই তা বেড়েছে। পাঁচটি বছর ধরে বিপুল পরিশ্রমে যে পড়ুয়া পিএইচডি করছেন, তাঁকে পাশ কাটিয়ে এ বার পিএইচডি না থাকা পড়ুয়ারাই হয়ত আগে চাকরি পেয়ে যাবেন। এমনটাই আশঙ্কা করছেন অনেকে। তাই যদি হয় তাহলে তো ডিগ্রি হিসেবে পিএইচডি সম্পূর্ণভাবে মূল্যহীন হয়ে পড়বে! এমনটাই বোধহয় চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। এম-ফিলের মতো পিএইচডিকেও একটা অচল ডিগ্রিতে পরিণত করতে চাইছে তারা। কারণ, পিএইচডি যদি শেষ পর্যন্ত অন্ন সংস্থান সুনিশ্চিত করতে না পারে তাহলে বহু পড়ুয়াই গবেষণা করতে আসবেন না। স্কলারশিপের জন্য বরাদ্দ টাকার অঙ্কও বেশ কিছুটা কমবে। সরকারি টাকায় অতিরিক্ত গবেষক পুষে রাখার পক্ষপাতী নয় কেন্দ্র, নন-নেট ফেলোশিপ তুলে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে এ বার্তাই তো তারা দিয়েছিল। এবার সামগ্রিকভাবে গবেষকদের সংখ্যাই যদি কমে যায়, তাহলে লাভ।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক নন্দিনী মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘বারবার এভাবে নিয়ম পরিবর্তন করা হচ্ছে কেন বুঝতে পারছি না। কয়েকদিন আগেই ইউজিসি জানালো যে পিএইচডি না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো যাবে না। এখন আবার অন্য কথা বলছে। এ ভাবে একেক সময়ে একেকরকম কথা বলার কারণটা আমার কাছে খুব স্পষ্ট নয়।’ পিএইচডি-কে তো শুধুমাত্র একটা ডিগ্রি বলা চলে না। তার মধ্যে দিয়ে পড়ুয়ারা বিস্তর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ইউজিসি-র কথা মতো এবার থেকে যদি পিএইচডি না করেই তাঁরা শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পান তাহলে কোনো রকম অভিজ্ঞতা ছাড়াই তাঁদের পড়ুয়াদের মুখোমুখি এসে দাঁড়াতে হবে। এমনটাই মনে করছেন নন্দিনী। তাঁর মতে, ‘আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গেলে শিক্ষকের গবেষণার অভিজ্ঞতার প্রয়োজন । সাধারণত আমাদের স্নাতকোত্তরের যে কোর্সগুলো আছে, তাতে গবেষণার অভিজ্ঞতা খুব কম হয়। যদি এই অভিজ্ঞতাটা না থাকে, তাহলে তিনি যে ছাত্রদের পড়াতে পারবেনই তার নিশ্চয়তা কী?’

মধ্যশিক্ষা পর্ষদের চেয়ারম্যান অভীক মজুমদার অবশ্য কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করছেন, তিনি বলছেন, ‘পিএইচডি না থাকলেই যে কেউ পড়াতে পারবে না এমন কোনও কথা নেই। আমাদের মাস্টারমশাদের অনেকেরই পিএইচডি ছিল না, কিন্তু কী অসাধারণ দক্ষতায় তাঁরা ছাত্রদের পড়িয়েছেন তা ভাবা যায় না।’ তিনি উদাহরণ হিসেবে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বা স্বপন মজুমদারের কথা বললেন। তিনি এও মনে করছেন, সময় পাল্টেছে। আগে পিএইচডির যা মূল্য ছিল, আজ আর তার সিকিভাগও নেই। ফলত, পিএইচডি থাকা বা না থাকার উপর ভিত্তি করে পড়ুয়ার মেধার বিচার করা উচিত না। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে এও ঠিক, যে কোনও পড়ুয়াকে শিক্ষকতা করার সুযোগ দেওয়ার আগে একটি বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়া জরুরি। তিনি বলছিলেন, ‘পিএইচডি নেই এমন লোককে একবার নিতে শুরু করলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যাবে না তো? আসলে যে কোনও পড়ুয়াকে একটা বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়ে শিক্ষকতার সুযোগ দেওয়া উচিত। সেটা যে সবসময় ডিগ্রি নির্ভর হতে হবে এমন কোনও কথা নেই, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া একটা থাকা জরুরি।’

পিএইচডি-র প্রয়োজন আছে না নেই, সে বিষয়ে এক্ষুনি নিদান দেওয়ার জায়গায় নেই কেউই। কিন্তু ইউজিসির নিত্যনতুন নীতি পরিবর্তনের ফলে যে গবেষকদের জীবন অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে সে বিষয় কোনও সন্দেহ নেই। তৈরি হচ্ছে অস্তিত্বসংকট, নিজের সাধনা বাতিল হয়ে যাওয়ার ভয়। নয়া শিক্ষানীতি থেকে ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় -- শিক্ষাক্ষেত্রে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ছে কেন্দ্র। সেই সঙ্গে গবেষকদের ভবিষ্যৎ ঘিরেও তৈরি হচ্ছে ধোঁয়াশা।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।