খামেনির শূন্যতা পূরণ করবে কে?
Ali Larijani: আলি লারিজানি বহুকাল ধরে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ। তিনি কেবল রাজনৈতিক নেতা নয়, দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ইরানের রাজনীতি এখন খুব অস্থির। দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনির মৃত্যুতে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ আলি লারিজানি ধীরে ধীরে ক্ষমতার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উঠে আসছেন।
খামেনি ১৯৮০-এর দশক থেকে ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। গত কয়েক দশক ধরে তিনিই দেশটির রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে আসছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি ইজরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তাঁর মৃত্যু পরবর্তীতে পুরো রাজনৈতিক ভারসাম্য নড়ে গিয়েছে। দেখা যাক, সেই শূন্যতা পূরণে কোন নেতার নাম উঠে আসছে, কীভাবে ইরানের রাজনৈতিক ক্ষেত্র সাজানো হচ্ছে ।
আলি লারিজানি বহুকাল ধরে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ। তিনি কেবল রাজনৈতিক নেতা নয়, দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (SNSC) বর্তমান সচিব হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল শুধু দেশের নিরাপত্তা বিষয়ক নীতিমালা নিয়ে কাজ করা নয়, বিভিন্ন ভেতরের-বাইরের সম্পর্ক ও বিদেশ নীতি গঠনে অংশ নেওয়া।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Assassination of Ali Khamenei: জানা গিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। বিশেষ করে খামেনির নিরাপত্তা বলয়, যাতায়াতের ধরন এবং বৈঠকের সময়সূচি নিয়ে বেশ কিছু নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।
লারিজানি মূলত বাস্তবসম্মত নেতা হিসেবে পরিচিত, অন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কঠোরতা ও সমঝোতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায় তাঁর। তিনি চেয়েছেন পশ্চিমা শক্তিগুলির সঙ্গে সম্পর্কের নির্দিষ্ট জায়গায় সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে, বিশেষত আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক বিষয়ে আলোচনায়।
২০০৫-২০০৭ সালেও তিনি ইরানের পারমাণবিক আলোচনার মুখ ছিলেন এবং পরে ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ইরানের সংসদের স্পিকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা তাঁকে একটি অভিজ্ঞ, বহুস্তরীয় ক্ষমতার ব্যক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরান দ্রুত একটি অস্থায়ী নেতৃত্ব কাউন্সিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে, আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে এক সময়সীমায় দেশ পরিচালিত হবে। অনেকেই মনে করেন লারিজানিই আছেন সেই কেন্দ্রীয় জায়গায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
US Israel Iran war: ইজরায়েল বহুদিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে উৎসাহ দিয়ে আসছিল। এবার সেই লক্ষ্য অনেকটাই পূরণ হয়েছে।
লারিজানি শুধু সংসদীয় বা নিরাপত্তা স্তরে নয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কেও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন। তিনি ওমান ও রাশিয়ার মতো দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন, এবং পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করেছেন। এর সবই দেখায় তিনি শুধু অভ্যন্তরীণ নীতির নেতা নন, আন্তর্জাতিক স্তরেও ইরানের অবস্থান বুঝতে ও পরিচালনা করতে সক্ষম।
ইরান ও আমেরিকার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে জটিলতা চলেছে। ইরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলি সন্দেহ করে এটিকে সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে কি না।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে লারিজানি এমন এক নেতা, যিনি খুব একটা নরম স্বভাবের নন। ইরানে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আয়োজিত বিপুল বিক্ষোভ চলাকালীন তাঁর ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর সমালোচনা এসেছে। ওয়াশিংটন তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যদিও ইরান কর্তৃপক্ষ এটিকে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছে।
অভিযোগ, লারিজানি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের আটক করে রেখেছেন। কিছু জনকে কঠোর ভাবে চিহ্নিত করেছেন। এতে বোঝা যায়, তিনি যথেষ্ট কঠোর নেতাও। তাঁর নেতৃত্বে ইরানে শুধু পরিবর্তন নয়, কঠোর নিয়ন্ত্রণের শাসনও দেখা যেতে পারে।
ইরানের রাজনৈতিক শূন্যতা শুধু দেশীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের পুরো ভূ-রাজনীতির উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। আইরান-ইসলামিক রিপাবলিকের মতো শক্তিধর রাষ্ট্রের নেতৃত্ব কোন পথে যাবে তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, তেল মূল্য, আর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
খামেনির অনুপস্থিতি ইরানের জন্য একটি ঐতিহাসিক মোড় — একটি নতুন সময়ের সূচনা বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় একইসঙ্গে। এই পরিস্থিতিতে যার নাম সবচেয়ে সামনে উঠে এসেছে তিনি হলেন আলি লারিজানি — একজন অভিজ্ঞ, প্রাগম্যাটিক, কিন্তু কঠোর এক রাজনৈতিক নেতা। অনেক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ শক্তি এখন তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে — কোন পথে ইরান যাবে, কে দেবে নেতৃত্ব, এবং দেশের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকারীরা কীভাবে তাদের ভবিষ্যত গঠন করবে, সেই উত্তরের অপেক্ষা এখনও চলছে।






