কেমন ছিল যুদ্ধ পূর্ববর্তী ইউক্রেন? তার দ্রষ্টব্য জায়গাগুলি ফিরে দেখা...

Pre War Ukraine

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
কেমন ছিল যুদ্ধ পূর্ববর্তী ইউক্রেন? তার দ্রষ্টব্য জায়গাগুলি ফিরে দেখা...

১৯৯১ এ যেদিন পৃথিবীর আপামর কমিউনিস্টদের হৃদয়বিদ্ধ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হল সেদিনই নতুন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয় ইউক্রেন। বয়সের হিসেবে ধরলে ইউক্রেনের এখন সদ্য ৩০। সেই ইউক্রেনই এখন যুদ্ধের কবলে। প্রতিমুহূর্তে সেই দেশ এখন নিজের অস্তিত্ব তিকিয়ে রাখতে লড়ে যাচ্ছে অসীম শক্তিধর রাশিয়ার সঙ্গে। এক্ষেত্রে ইউক্রেনের মনোভাব যেন ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী’। সেনাবাহিনীর মনোবল বাড়াতে মাঠে নেমেছেন স্বয়ং ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট।

চারদিনের যুদ্ধে যা ক্ষয়ক্ষতি তা অঙ্কের নিরিখে বিশাল। ইউক্রেনের রাজধানী কিভ দখলের পথে রাশিয়া। ভেঙে পড়ছে শতাব্দী প্রাচীন স্থাপত্য। ইতিমধ্যেই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন ৩০০ র বেশি মানুষ। কিভের আকাশে আছড়ে পড়েছে ১৬০ টির ও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র। আজ ইউক্রেনের আকাশে বাতাসে বারুদের গন্ধ, গোলাগুলির শব্দ। চতুর্দিকে যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু কেমন ছিল যুদ্ধ পূর্ববর্তী ইউক্রেন?

রাশিয়াকে বাদ দিলে ইউরোপের মধ্যে আয়তনের হিসেবে সবচেয়ে বড় হল ইউক্রেন। মোট আয়তন ৬০৩. ৬২৮ বর্গ কিলোমিটার। এই বিশাল আয়তন থাকা সত্ত্বেও জনসংখ্যা অনেকটাই কম। মাত্র পাঁচ কোটি মানুষ বাস করেন এখানে।

আবার শিক্ষিত মানুষের পরিসংখ্যানের দিক থেকে দেখলে ইউক্রেন রয়েছে একেবারে প্রথম সারিতে। এদেশের প্রায় ১০০ শতাংশ মানুষই শিক্ষিত। ১৫ বছরের বেশি বয়সী প্রায় সকলেই লিখতে পড়তে পারে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ও ইউক্রনে খুবই উন্নত পরিকাঠামো রয়েছে। রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়।

আবার ভ্রমণপিপাসু মানুষদের কাছেও ইউক্রেন অন্যতম সেরা গন্তব্য। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম খরচে ঘুরে আসা যায় ইউক্রেন। সেরা দ্রষ্টব্যগুলির মধ্যে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষ, প্রাচীন দুর্গ এবং একাধিক ঐতিহাসিক গির্জা। আবার ইউক্রেন রাশিয়ার সীমানায় রয়েছে কারপাথিয়ান পর্বতমালা যা হাইকিং, ট্রেকিং এর স্বর্গরাজ্য। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রয়েছে সেন্ট সোফিয়া ক্যাথিড্রাল এবং ব্রড বুলেভারডের মত স্থাপত্য। এছাড়া ও পর্যটকদের কাছে ওদেসা শহর ও লভিভ শহর ও অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

ইউক্রেনে ইউনেস্কো স্বীকৃত হেরিটেজ সাইট ছয়টি। আসুন সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক ইউক্রেনের হেরিটেজ স্থাপত্যগুলি।

সেন্ট সোফিয়া ক্যাথিড্রাল এবং কিভ পারচেস্ক লাভরা

একাদশ শতাব্দীর শুরুতে নির্মিত এই চার্চ পৃথিবীর অন্যতম সেরা মোজাইক এবং ফ্রেস্কোর নিদর্শন। আবার কিভ শহরে অবস্থিত পারচেস্ক লাভরা ইউক্রেনের শিল্প স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। ১০৫১ সালে এন্টনি এবং থিওডোসিয়াস নামের দুই পাদ্রী এই স্থাপত্যটি তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠানই হয়ে ওঠে খ্রিস্ট ধর্ম চর্চার অন্যতম আঁতুড়ঘর।

লভিভের ঐতিহাসিক স্মারক

এই লভিভ শহরের প্রায় গোটা অংশটাই ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মধ্যে পড়ে। গোটা শহর জুড়ে অসংখ্য বিখ্যাত স্থাপত্য রয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত টাউন হল, রাইনক স্কোয়ার, ব্ল্যাক হাউজ, পাউডার টাওয়ার, সেন্ট জর্জ ক্যাথিড্রাল সবই ইতিহাসের অংশ হিসেবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই শহরে।

স্ত্রুভ জিওডেটিক আর্ক

বিজ্ঞান ও স্থাপত্যের এক অদ্ভুত মিশেল এই স্ত্রুভ আর্ক। গোটা নির্মাণটি ২৫৮ টি ত্রিভুজের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি প্রায় ২৮২০ মিটার দীর্ঘ।

ভার্জিন বিচ ফরেস্ট

কারপেথিয়ান পর্বতমালার বুক জুড়ে এই ঘন অরণ্য অবস্থিত। প্রায় ১৫ টি দেশ জুড়ে ৭৮ টি জঙ্গল যার প্রায় ১২ টি ইউক্রেনের সীমানার মধ্যে অবস্থিত। এই জঙ্গল পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। হাইকিং থেকে শুরু করে জঙ্গল ভ্রমণ সব মিলিয়ে এই বিচ ফরেস্ট ভ্রমণপিপাসুদের কাছে স্বর্গরাজ্য।

রেসিডেন্স অফ বুকোভিনিয়ান অ্যান্ড ডালমেশিয়ান মেট্রোপলিটানস

মধ্যযুগীয় এক দুর্গের ভিতর শতাব্দী প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। এই পরিবেশেই এখানে চলে পঠনপাঠন। শীতকালে তুষারপাতের পর এখানে এলে আপনার মনে হতেই পারে কোনও তুষারাবৃত প্রাচীন রাজত্বে চলে এসেছেন।

কারপেথিয়ান অঞ্চলের চার্চ

পোল্যান্ড ও ইউক্রেন মিলিয়ে প্রায় ১৬ টি কাঠের চার্চ আছে যেগুলি ২০১১ সালে ইউনেস্কো হেরিটেজের তকমা পায়। এর মধ্যে আটটি চার্চ ইউক্রেনে অবস্থিত। মূলত চারটি স্থাপত্য শৈলী মেনে এই চার্চগুলি নির্মাণ করা হয়। এই চার্চগুলিতে রয়েছে এমন সব কাঠের কাজ যা বর্তমানে নতুন করে বানানো সম্ভব নয়।

এসব স্থাপত্য ছাড়া ও ইউক্রেন আরও নানান বৈচিত্র্যে ভরা। বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা সঙ্গীত যন্ত্র ব্যবহার হয় ইউক্রেনে। নাম ট্রেমবিটা। একে ইউক্রেনের জাতীয় বাদ্য বলা যেতে পারে। এছাড়া ও বিশ্বের গভীরতম পাতাল রেলস্টেশনটি ও রয়েছে ইউক্রেনে।

কিন্তু এই এতসব স্থাপত্য, বৈচিত্র্যের পরিণতি কী? যুদ্ধ যেভাবে ইউক্রেনকে গ্রাস করতে শুরু করেছে তাতে এই নিদর্শন ভেঙে পড়া কি সময়ের অপেক্ষা? সিরিয়া যেভাবে তার শরীরে গৃহযুদ্ধের ক্ষতচিহ্নকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউক্রেনের পরিণতিও কি তাই? প্রশ্ন অনেক কিন্তু উত্তরগুলো অজানা।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।