রাহুল গান্ধীর মৌরসি পাট্টাই কংগ্রেসের পতনের মূলে? এড়ানো যাবে না যে ভবিষ্যৎ
দলের সভাপতি থাকবেন না, অথচ আড়াল থেকে সবকিছু পরিচালনা করার নীতি ধরেই হাঁটছেন রাহুল।

ভারত নামক দেশটির বহুত্ববাদী, উদার, ধর্মনিরপেক্ষ ভাবাবেগের প্রতি অন্তরের টান রয়েছে যাঁদের, দেশের অন্য দলগুলির চেয়ে কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা তাঁদের কাছে একটু বেশিই। নেহরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকার হিসেবে সেই গ্রহণযোগ্যতা টিকিয়ে রাখা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে রাহুল গান্ধীর। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে সেই কর্তব্যে শুধুমাত্র শিথিলতাই চোখে পড়েনি, আপাতদৃষ্টিতে খানিকটা গা-ছাড়া মনোভাবই দেখা গিয়েছে তাঁর আচরণে। তার জন্য মাঝেমধ্যেই শূলবিদ্ধ হতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু গুলাম নবি আজাদের প্রস্থানে এই মুহূর্তে কার্যতই ক্ষতবিক্ষত রাহুল। দলের অবক্ষয়ের জন্য সরাসরি তাঁকে দায়ী করেছেন আজাদ। প্রশ্ন তুলেছেন রাজনীতিক হিসেবে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে, যা জাতীয় রাজনীতিতে তো বটেই, দলের অন্দরেও রাহুলকে আরও নিঃসঙ্গ করে তুলতে পারে।
কংগ্রেস ছাড়ার পদত্যাগপত্রেই সরাসরি রাহুলকে নিশানা করেন আজাদ। রাহুল ‘অপরিণত’, তিনি অনভিজ্ঞ ‘পরগাছা’-দের দলে শিকড় বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রকাশ্যে মনমোহন সিং সরকারের অধ্যাদেশ কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেলে ২০১৪ সালে রাহুলই কংগ্রেসের পরাজয় ডেকে এনেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন আজাদ। তাঁর ‘মোদিকরণ’ ঘটেছে বলে যদিও পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছিলেন রাহুলপন্থীরা। তার পরেও আক্রমণে বিরতি দেননি আজাদ। বরং আরও একধাপ এগিয়ে জানিয়েছেন, ভালো মানুষ হলেও, রাজনীতিক হওয়ার যোগ্য নন রাহুল। নেহরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকার হলেও, রাজনীতির প্রাথমিক শিক্ষা থেকে আজও বঞ্চিতই রয়ে গিয়েছেন রাহুল, যা নিয়ে বিশেষ গরজও নেই তাঁর।
আজাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে কংগ্রেসের তরফে অনেকে এগিয়ে এলেও, এ-যাবৎ নিশ্চুপই রয়েছেন রাহুল। মা সোনিয়া গান্ধীর চিকিৎসা করাতে এই মুহূর্তে দেশের বাইরে তিনি। বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও সেখানেই রয়েছেন। ফলে আজাদের বাক্যবাণের মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে দেশে নেই কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত গান্ধী পরিবারের কোনও সদস্যই। তাতে সমালোচনার ঝড় যত তীব্রতর হচ্ছে, ততই বাড়ছে কংগ্রেসের ভাঙন। জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মন্ত্রী তাজ মহিউদ্দিন কংগ্রেস ছেড়ে হাত মিলিয়েছেন আজাদের সঙ্গে। রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ মহম্মদ আলি খানও পদত্যাগ করেছেন কংগ্রেস থেকে। কংগ্রেস ছেড়েছেন আরএস যুগলকিশোর শর্মা, মহম্মদ আমিন ভাটও। এঁরাও প্রকারান্তরে রাহুলের বিরুদ্ধেই তোপ দেগেছেন। দলের অবক্ষয়ের জন্য দায়ী করেছেন রাহুলকে।
এতকিছুর পরও কংগ্রেসের একাংশ যদিও রাহুলের ওপরই ভরসা রাখছেন। এমনকী, রাহুল না চাইলেও, কংগ্রেস সভাপতির পদ গ্রহণ করতে তাঁর উপর চাপসৃষ্টি করাও হতে পারে বলে জানিয়ে রেখেছেন মল্লিকার্জুন খাড়গে। তাতেই প্রশ্ন উঠছে, দলের একাংশ যখন এখনও রাহুলের ওপর ভরসা করছেন, আজাদরা তাঁর উপর চটলেন কেন? এর নেপথ্যে হাজারো তত্ত্ব উঠে আসছে। রাজনীতি সম্পর্কে রাহুল একেবারেই ‘সিরিয়াস’ নন বলে অভিযোগ করছেন কেউ কেউ। কেউ আবার বলছেন, ধরি মাছ, না ছুঁই পানি নীতি নিয়ে চলছেন রাহুল। অর্থাৎ দলের সভাপতি থাকবেন না, অথচ আড়াল থেকে সবকিছু পরিচালনা করার নীতি ধরেই হাঁটছেন রাহুল। বিজেপি-র বিরুদ্ধে রাহুলের রণকৌশলের মধ্যেও গলদ দেখছেন অনেকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ghulam Nabi Azad resigned from Congress: কেন হাত ছাড়লেন এই বর্ষীয়ান নেতা?
রাহুলকে নিয়ে কংগ্রেসের অন্দরে এই অসন্তোষ নিশ্চয়ই রাতারাতি তৈরি হয়নি, তাহলে সময় থাকতে কেন তা নিরসনে সচেষ্ট হননি তিনি? বিক্ষুব্ধ জি-২৩ গোষ্ঠীতে একের পর এক নেতা নাম লেখানোর পরও কেন সতর্ক হলেন না তিনি? না কি উদাসীনতা থেকেই সব দেখেও না দেখার ভাব করে ছিলেন তিনি, উঠছে প্রশ্ন। কারণ ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই কার্যত দলে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল রাহুলকে। রাফাল যুদ্ধবিমান দুর্নীতির অভিযোগে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের বিরুদ্ধে তিনি যখন গর্জে উঠছেন, আজাদ-সহ দলের অভিজ্ঞ এবং প্রবীণ শিবিরকে কার্যত নিস্ক্রিয় থাকেতই দেখা গিয়েছিল। মিটিং-মিছিলে লাগাতার ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ রব তুলতে শোনা গিয়েছিল রাহুলকে। তাঁর অনুগত হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া, তাতে শামিল হতে দেখা যায়নি বিশেষ কাউকে।
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায় কৃষক আন্দোলন, হাথরস কাণ্ডের সময়ও। ট্র্যাক্টর চালিয়ে সংসদ ভবনে পৌঁছনোর সময় রাহুলের পাশে ছিলেন গুটিকয়েক নেতা, সমর্থক। হাথরসে যাওয়ার সময় দিল্লি সীমানায় যখন প্রিয়াঙ্কার কুর্তি ধরে টান মারে পুলিশ, ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় রাহুলকে, কংগ্রেসের তরফে মারমার-কাটকাট ভাব দেখা যায়নি। বরং ট্যুইটার-প্রতিক্রিয়াতেই প্রতিবাদ সীমিত রেখেছিলেন দলের অধিকাংশ নেতা। এই নিঃসঙ্গতার জন্যও যদিও রাহুলকেই দায়ী করা হচ্ছে। আজাদের সাফ কথা, ‘‘ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে রাজনীতির পাঠ পেয়েছি। জুনিয়র মন্ত্রী থাকাকালীনই আমাদের ডেকে বলেছিলেন, অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে যেন নিয়মিত যোগাযোগ রাখি আমরা, দেখা করি। বয়সে বড়দের শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছিলেন। বিরোধী নেতাদেরও সমান সম্মান দিতে হয় শিখেছিলাম। ডাঁয়ে-বাঁয়ে, সামনে-পিছে, সবদিক থেকে মোদিকে আক্রমণ করতে চান রাহুল। এভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণে যাওয়া সমীচীন নয়। এই ধরনের ভাষার প্রয়োগ কি হওয়া উচিত?" রাহুলের ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ স্লোগানের কথাই এখানে বলেছেন আজাদ।
আজাদের এই মন্তব্য নিয়ে যদিও দ্বিধায় কংগ্রেস। বিজেপি-র তরফে যেখানে নিত্যদিন গান্ধী পরিবারকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আক্রমণ করা হচ্ছে, জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, সনিয়া গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী এবং সর্বোপরি রাহুল, কেউই তাদের ‘কটু’ আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না, সেখানে আক্রমণাত্মক না হয়ে, হাত গুটিয়ে বসে থাকা কতটা যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা। তবে মতামত যাই হোক না কেন, মোদিকে উদ্দেশ্য করে রাহুলের ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ স্লোগানই কংগ্রেসের অন্দরে প্রবীণ-নবীন বিভাজনকে আরও প্রশস্ত করে তোলে বলে মত আজাদের। কিন্তু চার বছর পর সেই মতভেদকে হাতিয়ার করে দল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া, ব্যর্থতার জন্য রাহুলকে দায়ী করা কতটা সমীচীন তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অমূলক নয়। এর পিছনে পারস্পরিক দ্বন্দ্বও কাজ করছে বলে মনে করছেন অনেকে।
২০১৯-এর নির্বাচনে কংগ্রেস ধরাশায়ী হলে, ব্যর্থতার দায় নিয়ে কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন রাহুল। এমনকী, সভাপতি পদে গান্ধী পরিবারের বাইরের কাউকে বসানোর সময় এসেছে বলেও পরিষ্কার জানিয়ে দেন তিনি। দলের একটি অংশের মতে, গান্ধী পরিবারকে দলের নেতৃত্বে রেখে আসলে ক্ষমতার সুফল ভোগ করতে চাইছিলেন কিছু নেতা। মিটিং-মিছিলে সেভাবে দেখাই যায়নি তাঁদের। অথচ ব্যর্থতার দায় নেওয়ার পালা যখন এল, নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে দেখা গিয়েছিল সকলকে। তাই নিজের ঘাড়ে দায় নিয়েই সভাপতি পদ ছাড়েন রাহুল। রাহুলের পদত্যাগপত্রেও যার ইঙ্গিত মেলে। তাতে রাহুলের বক্তব্য ছিল, "দল পুনর্গঠনের জন্য কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। ২০১৯-এর ব্যর্থতার জন্য অনেকেকই জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু দলের সভাপতি হিসেবে অন্যকে দায়ী করে নিজের দায় উপেক্ষা করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।"
একইভাবে হিমন্ত বিশ্বশর্মা, জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, যিনি কিনা ছেলেবেলার বন্ধু, তাঁর সঙ্গেও সম্পর্কে চিড় ধরে রাহুলের। তাতেও প্রবীণ বনাম নবীন দ্বন্দ্ব অনেকাংশেই দায়ী ছিল বলে মনে করা হয়। হিমন্ত এবং জ্যোতিরাদিত্য পরবর্তী কালে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপি-তে যোগ দেন। ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সময় থেকেই কংগ্রেসে ছিলেন হিমন্ত। তরুণ নেতা হিসেবে অসমে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন হিমন্ত। কিন্তু তাতে পোড় খাওয়া কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈয়ের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন হিমন্ত। হিমন্তর বদলে নিজের ছেলে গৌরব গগৈকেই অসমের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঠিক করে ফেলেন। দুরন্ত পারফর্ম করেও এভাবে বঞ্চিত হওয়া মেনে নেননি হিমন্ত। সটান রাহুলের কাছে ছুটে যান তিনি। পরবর্তী কালে হিমন্ত জানান, তাঁর কথা শোনার চেয়ে নিজের পোষ্যর সঙ্গে খেলতেই ব্যস্ত ছিলেন রাহুল। এর পরই বিজেপি-র দিকে পা বাড়ান হিমন্ত। একইভাবে কমলনাথের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে দীর্ঘদিনের কংগ্রেস বন্ধন কাটিয়ে বিজেপি-তে যান জ্যোতিরাদিত্য।
আজাদের পদত্যাগের পর নতুন করে তাই রাহুলের বিরুদ্ধে তোপ দাগতে শুরু করেছেন হিমন্ত। তাঁর দাবি, কংগ্রেস ছাড়ার সময় পদত্যাগপত্রে তিনি যা যা লিখেছিলেন, তার সঙ্গে আজাদের লেখা হুবহু মিলে যায়। হিমন্তর কথায়, ‘‘রাহুল গান্ধী যে অপরিণত, খামখেয়ালি, তা কংগ্রেসের সকলেই জানেন। তার পরেও তাঁর পা ধরে বসে রয়েছেন সকলে। সোনিয়া গান্ধী দলকে ধরে রাখতেই পারছেন না। ছেলেকে এগিয়ে দিতে চাইছেন তিনি। কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। বিশ্বস্ত সকলেই একে একে দল ছাড়ছেন। ২০১৫ সালে লিখেছিলাম, একটা সময় আসবে যখন গান্ধীরা ছাড়া কংগ্রেস আর কেউ থাকবেন না। সেটাই ঘটতে চলেছে।’’ একইভাবে, একটু ধৈর্য ধরলে জ্যোতিরাদিত্যই মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হতেন বলে মন্তব্য করেছিলেন রাহুল। কিন্তু জ্যোতিরাদিত্যর জবাব ছিল, ‘‘আরও আগে তা ভাবতে পারতেন রাহুল।’’
অশোক গেহলট এবং শচীন পাইলটের দ্বন্দ্বেও মাঝে রাজস্থান কংগ্রেসের হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পুরোপুরি ক্ষতে প্রলেপ দেওয়া না গেলেও, কোনওরকমে সেখানে ভাঙন ঠেকিয়ে রাখা গিয়েছে। রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে শচীনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্যই তা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই। কিন্তু এতকিছুর পরও কি রাহুলকে ছাড়া চলতে পারে কংগ্রেস! অতি বড় কংগ্রেস সমালোচকও তাতে সায় দেবেন না। কারণ কংগ্রেসের অন্দরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নতুন কোনও সমস্যা নয়। একজনের উন্নতি হলে, বাকিরা তাতে লাগাতার বাগড়া দিয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে বারবার মধ্যস্থতা করতে হয়েছে রাহুল এবং গান্ধী পরিবারের অন্য সদস্যদের। না চাইতেও, অদক্ষ, পরিশ্রমে অনাগ্রহী নেতাদের নিয়ে চলতে হয়েছে তাঁদের। উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিছু নেতা বিপদ বুঝে তাই সরে পড়েছেন। তাই এভাবেই বিশ্বস্ত এবং বিশ্বাসঘাতকদের চিহ্নিত করে ফেলতে পারবেন বলে হয়তো ভেবে থাকবেন রাহুল। কিন্তু তাতে অনেক দেরি না হয়ে যায়! তাই চরিত্রগত হোক বা কৌশলে রপ্ত, তথাকথিত উদাসীনতা কাটিয়ে বেরিয়ে আসতে হবে রাহুলকে। অন্যথায় কংগ্রেসের অস্তিত্বরক্ষার পথ থাকবে না।







