রেলে যাত্রার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে এই মটন কারি, আজও জিভে জল আনবে

১৯০০ এর দশকের গোড়ার দিকে ফ্রন্টিয়ার মেইলে পরিবেশন করা প্রথম কয়েকটি খাবারের মধ্যে একটি, রেলওয়ে মাটন কারি। অনেকে বিশ্বাস করেন, এটি ছিল বিখ্যাত কলকাতার মাংস ঝোল (মটন কারি) যা ওয়াজেদ আলি শাহের মাটন কোর্মা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

Ravhali Biswas
৪ মিনিট
রেলে যাত্রার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে এই মটন কারি, আজও জিভে জল আনবে

ছুটির দিনে বাড়িতে মাংস হবে না, ভাবা যায় না। কচি পাঠার তুলতুলে মাংসের ঘ্রাণে ভরে যায় আমাদের রবিবারগুলি! সে লুচি-মাংস হোক কিংবা গরম ভাতের সঙ্গে, ওই মাংস টা চাই। কিন্তু আমাদের সবার প্রিয় যে কষা মাংস না হলে আমাদের চলে না তার পেছনেও রয়েছে এক চলমান ইতিহাস। চলমান বলার কারণ এই মাংস রান্নাই হত চলমান অবস্থায়। আমরা রেলওয়ে মটন কারির কথা বলছি। যার হাত ধরে মটনের এত ভরভরন্ত সংসার সেই কারির পিছনে ছিল ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস আর ভারতীয় বাবুর্চির বুদ্ধি।

রেলওয়ে মটন কারি বলতেই আমাদের চোখের সামনে সেই ব্রিটিশ আমলের ট্রেনের কামরার ছবি ভেসে ওঠে। ১৯০০ এর দশকের গোড়ার দিকে ফ্রন্টিয়ার মেইলে পরিবেশন করা প্রথম কয়েকটি খাবারের মধ্যে একটি, রেলওয়ে মাটন কারি। অনেকে বিশ্বাস করেন, এটি ছিল বিখ্যাত কলকাতার মাংস ঝোল (মটন কারি) যা ওয়াজেদ আলি শাহের মাটন কোর্মা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৭ সালে ভারতে রেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিল। তাদের ট্রেনগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ফ্রন্টিয়ার মেল। সেই সময়ে একে রোলস রয়েসের সাথে তুলনা করা হত। সেই যুগেও দাঁড়িয়ে এই ট্রেনে ছিল আধুনিক সুবিধা। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও নিজের আত্মজীবনীতে এই ট্রেনের উল্লেখ করেছেন। ট্রেনের ভিতরে ঠাণ্ডা রাখার জন্য এই ট্রেনের বাইরে ওপরের অংশে বরফের চাই রাখার ব্যবস্থা ছিল। এই ফ্রন্টিয়ার মেলের গতায়ত ছিল ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে। এই ট্রেনের প্যান্ট্রি কারেই জন্ম হয়েছিল মটন কারির।

এটা সেই আমলের কথা, যখন প্রতিটি দূরপাল্লার ট্রেনে থাকত সুসজ্জিত ডাইনিং কার, নিখুঁত ইউরোপিয় কায়দাতেই৷ মাথায় পাগড়ি এবং দুধসাদা পোশাকের ওপর কোমরবন্ধ আঁটা খানসামারা এসে টেবিলে টেবিলে খাবার সার্ভ করতেন৷ আর রেল কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্তা এবং পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য থাকত আরও এলাহি আয়োজন৷ তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব সেলুন-কার থাকত, যে কামরায় বাবু-বিবির শোওয়ার ঘরের লাগোয়া থাকত বসার ঘর, রান্নাঘর এবং ব্যক্তিগত পরিচারক ও ভৃত্যদের আলাদা ঘর৷ ১৯০৩ সালের প্রথম দিকে মেল এবং এক্সপ্রেস ট্রেনে ডাইনিং কার চালু হয়। এর আগে সকাল, দুপুর আর বিকেলের খাবারের জন্য বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেন থামত।

রেলওয়ে মটন কারি নিয়ে একটি মজার প্রচলিত গল্প আছে। একবার এক ব্রিটিশ সাহেব রাত্রেবেলা রেলের ক্যান্টিনে যান কিছু খাবারের আশায়। তখন ট্রেনের সকলের খাবার কমপ্লিট শুধু ট্রেনের বাবুর্চিরা তাদের নিজেদের জন্য বেঁচে যাওয়া মটন রান্না করছে। রান্না হচ্ছিল, কলকাতার ঝাল ঝাল কষা মাংস। সেই সময় সেখানে সাহেব উপস্থিত হয়ে খাবারের আবদার করেন। বাবুর্চিরা সাহেব কি খেতে চান জিজ্ঞেস করায়, তিনি মাংস রান্নার দিকে তাকিয়ে বলেন তিনি ঐ কষা মাংস খাবেন। বাবুর্চি পড়ল মহা বিপদে। সাহেবরা অল্প ঝালের খাবার খান কিন্তু এই মাংস তো ঝালে টয়টম্বুর। সাহেবকে সে কথা বললেও তিনি ওটিই খেতে আবদার করেন। শেষে দেখা যায়, শত ঝাল সত্ত্বেও সাহেব সেই মাংসটি খেয়ে নেন এবং ওই সামান্য পদটি তার ভীষণ ভালোও লেগে যায়। তিনি বাবুর্চিদের বলেন এরপর থেকে যখনই এই ডিশ রান্না হবে তখন যেন একটু অল্প ঝাল দিয়ে তা রান্না করা হয়। এরপর থেকে তিনি যখনই ট্রেনে উঠেছেন বাবুর্চিরা তার কথা মাথায় রেখে পরবর্তীকালে সেই ঝোলে একটু মিষ্টি ভাব আনার জন্য টক দই এর ব্যবহার শুরু করে। এইভাবেই শুরু হল ‘রেলওয়ে মটন কারি’র যাত্রা।

রেলওয়ে মটন কারিকে ‘অ্যাংলো ইন্ডিয়ান’ বা ‘ফিউশন’ ডিশও বলা হয়। কারণ এই রান্নায় ব্যবহৃত লবঙ্গ, দারচিনি, তেজপাতা, গোলমরিচ এইসব সেই সময় বিদেশি মশলা ছিল। আর দেশীয় মশলা ছিল – শুকনো লঙ্কা, জিরে, ধনে, এবং হলুদ। এই ছিল রেলওয়ে মটন কারির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এরপর এই ডিশ ট্রেন থেকে বড় বড় হোটেল এবং এখন আমাদের রান্নাঘরেও রান্না করা যায়। আগেকার দিনে ট্রেন চলত কয়লার সাহায্যে তাই কয়লার ঢিমে আঁচে সেই রান্নার স্বাদ আর গন্ধ ছিল অনবদ্য।

কষা মাংসের সাথে রেলওয়ে মটন কারির পার্থক্য

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পদ্মা সেতু আবেগে কাঁপছে বাংলাদেশ! কেন নাশকতার ভয় হাসিনার মনে?

পদ্মাসেতু উদ্বোধন নিয়ে সাজো সাজো রব বাংলাদেশে। কয়েক কোটি মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কালে কেন উদ্বেগ হাসিনার গলায়!

কষা মাংসের ক্ষেত্রে আমরা ঝাল, মশলা বেশি দিই এবং জল কম দিই যাতে মাংস ঝোল ঝোল না হয়। কিন্তু রেলওয়ে মটনের ক্ষেত্রে ঝাল আর মশলা কম পড়ে এবং তা একটু ঝোল ঝোল হয়। একবার বানিয়েই দেখতে পারেন এই রেলওয়ে মটন কারি। রেসিপিটাও রইল আপনার জন্য-

উপকরণ

খাসির মাংস, আলু, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, টম্যাটো, টক দই, তেজপাতা, দারুচিনি, শুকনো লঙ্কা, গোটা গোলমরিচ, ছোট এলাচ, বড় এলাচ, লবঙ্গ, জয়িত্রী, গোটা জিরে, গোটা ধনে, গোটা মৌরি, গরম মসলা, কাশ্মীরি লঙ্কার গুড়ো, হলুদ গুড়ো, চিনি, নুন, সরষের তেল, নারকেলের দুধ।

রন্ধন প্রণালী

প্রথমে মাংসে দু কাপ জল দিয়ে বা মাংস অনুযায়ী জল দিয়ে সেদ্ধ করে নিন।

কড়াইতে সরষের তেল দিয়ে ওপরে বর্ণিত গোটা গরম মশলা, তেজপাতা, জিরে, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন।

এরপর একে একে পেয়াজ কুচি, আদা, রসুন বাটা, টম্যাটো কুচি দিয়ে নাড়তে থাকুন। তারপর নুন, হলুদ, লঙ্কা গুড়ো দিন।

খোসা ছাড়ানো আলু দিয়ে একটু উষ্ণ জল দিয়ে দিন। এই জলেই আলু সেদ্ধ হবে।

আলু সেদ্ধ হয়ে এলে আগে থেকে সেদ্ধ করা মাংসটা এর মধ্যে দিতে হবে।

এরপর ফেটানো টক দই আর নারকেলের দুধ দিয়ে দিতে হবে।

তারপর ২-৩ টে বড় আর ছোট এলাচ তার মধ্যে দিয়ে দিন এবং একটু নেড়ে নিন।

গ্যাস মিডিয়াম ফ্লেমে রেখে ১০ মিনিটের জন্য রেখে নিন।

১০ মিনিট বাদে ঢাকনা খুলে মাংস সেদ্ধ হয়ে এলে তৈরি রেলওয়ে মটন কারি।

বলা বাহুল্য যে সেই রাজ জমানা যেমন আর নেই, ভারতীয় রেলের সেই সুদিনও বহু বছর আগেই বিদায় নিয়েছে৷ এখন রেলযাত্রার সময় সাবধানী যাত্রী উপায় থাকলে বাড়ি থেকে খাবার সঙ্গে করে নিয়ে যান৷ অনেকেই অভিযোগ করেন রেলের খাবার এখন মুখে দেওয়া যায় না, এতটাই বিস্বাদ৷ এমনকী অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এই খাবার খেয়ে এমন খবরও সংবাদ শিরোনামে এসেছে।৷ নানা কারণে দূরপাল্লার ট্রেনে আর আলাদা ডাইনিং কার বা প্যান্ট্রি কার থাকে না৷ সব মিলিয়ে রেল সফরের সেই দারুণ রোমান্টিকতা আজ বিলকুল উধাও৷

কিন্তু সাতপাঁচ ভেবেই ভাবতে চাইছে ভারতীয় রেলের অধীনস্থ সংস্থা আইআরসিটিসি। রেলদপ্তরের নিজস্ব রেস্তোরাঁ খোলার পরিকল্পনা করেছে এই সংস্থা যেখানে পাওয়া যাবে পুরোনো আমলের সেই সব অবিস্মরণীয় খাবার। যা গোরা সাহেবদেরকেও মুগ্ধ করেছিল। এখন দেখা যাক, সেই গুণমান আইআরসিটিসি ফিরিয়ে দিতে পারে কিনা।

লিখেছেন
Ravhali Biswas
Ravhali Biswas
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।