বংশীবদন বিজেপির হাত ধরায় বদলে যাবে উত্তরের ভোটের সমীকরণ?

Rajbanshi leader Banshibadan Barman: কোচবিহারের রাজবংশী নেতা বংশীবদন বর্মনের বিজেপিতে যোগদান কি উত্তরবঙ্গের ভোটের সমীকরণ বদলে দেবে? রাজবংশী ভোটব্যাঙ্কে কী প্রভাব পড়বে?

inscript
৪ মিনিট
বংশীবদন বিজেপির হাত ধরায় বদলে যাবে উত্তরের ভোটের সমীকরণ?

উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বিধানসভা নির্বাচনের আগে বড়সড় সমীকরণ বদলের ইঙ্গিত মিলল কোচবিহার থেকে। রাজবংশী সমাজের প্রভাবশালী নেতা বংশীবদন বর্মনের বিজেপিতে যোগদান সেই ইঙ্গিতকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তাঁর সঙ্গে একই দিনে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন আরেক রাজবংশী নেতা গিরিজাশঙ্কর রায় এবং মেখলিগঞ্জের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক অর্ঘ্য রায় প্রধান।

মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) বিকেলে বিধাননগরে বিজেপির রাজ্য দফতরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে দলীয় পতাকা তুলে দেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায় এবং আইনজীবী-নেতা দেবজিৎ সরকার। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই যোগদান পর্ব চলাকালীনই উত্তরবঙ্গ সফরে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যা ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

বংশীবদন বর্মন দীর্ঘদিন ধরে উত্তরবঙ্গে রাজবংশী সম্প্রদায়ের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনের মুখ। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সংগঠন অতীতে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করেছে, এমনকী ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও সেই সমর্থন অব্যাহত ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাসে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মূলত আসন সমঝোতা নিয়ে মতোবিরোধই এই দূরত্বের কারণ বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

বংশীবদন বারবার দাবি করেছিলেন, মাথাভাঙা-সহ একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল যে ভোট পেয়েছে, তার পেছনে তাঁর সংগঠনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সেই ভিত্তিতেই আসন্ন নির্বাচনে কিছু আসন ছাড়ার দাবি তোলেন তিনি। পাশাপাশি রাজবংশী ভাষায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে অনুমোদনের দাবিও সামনে আনেন। এই দাবিগুলি পূরণ না হলে বিজেপিকে সমর্থনের কথাও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নারী নিরাপত্তার খাতিরে পিঙ্ক বুথ, কিন্তু রাতেই বন্ধ!

Pink Booth Kolkata: দেখা যাচ্ছে, রাত ১১টার পর যখন বুথগুলো সবথেকে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই সেগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কাঁকুড়গাছি বা হাডকো ক্রসিংয়ের মতো জায়গায় অনেক সময় বুথগুলো খালি থাকছে।

অবশেষে সেই হুঁশিয়ারিই বাস্তবে পরিণত হলো। বিজেপিতে যোগ দিয়ে বংশীবদন জানান, রাজবংশী সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও উন্নয়ন হয়নি প্রত্যাশিত মাত্রায়। তাঁর কথায়, কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে সম্প্রদায়ের উন্নয়নে ইতিবাচক আশ্বাস মিলেছে বলেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এই যোগদানকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে তৎপর বিজেপিও। শুভেন্দু অধিকারী কটাক্ষ করে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গে থাকাকালীন এই যোগদান যেন তাঁর জন্য ‘উপহার’। পাশাপাশি তিনি জানান, বংশীবদন ইতোমধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন, যা নীতিগতভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। যদিও তিনি স্পষ্ট করে দেন, বংশীবদন নিজে নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না।

অন্যদিকে, অর্ঘ্য রায় প্রধানের দলবদলও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। মেখলিগঞ্জের এই প্রাক্তন বিধায়ক তৃণমূলের টিকিট না পাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তুষ্ট ছিলেন। বিজেপিতে যোগ দিয়েই তিনি শাসকদলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তাঁর সঙ্গে তৃণমূল যুব কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা বাপ্পা মণ্ডলের যোগদানও সংগঠনগতভাবে বিজেপিকে শক্তি জোগাতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এর ফলে ভোটের অঙ্ক কতটা বদলাবে? রাজবংশী নেতা বংশীবদনের বিজেপিতে যোগদানের প্রভাব বুঝতে হলে আগে রাজবংশী সমাজের জনসংখ্যা ও তাদের ভোটের গুরুত্বটা পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার। উত্তরবঙ্গে রাজবংশী সম্প্রদায় মোট ভোটারের প্রায় ৩০%। রাজবংশী জনগোষ্ঠীর বড় অংশের উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুরে বসবাস। বিশেষ করে কোচবিহার জেলায় রাজবংশী ভোটব্যাঙ্ক একটি বড় ফ্যাক্টর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এক্সক্লুসিভ| অবশ্যই বিজেপি ব্যবহার করছে: অভয়ার বাবা-মা

Abhaya mother joins BJP: যে বিজেপি আগে উদ্যত হলো না অভয়াকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে, তারা ভোটের সময় অভয়ার বাবা-মাকে শুধু প্রচারের জন্য ব্যবহার করছে না তো? এই প্রশ্নের উত্তরে অভয়ার বাবা বলেন, "অবশ্যই ব্যবহার করছে। আর আমরা এটা মেনে নিয়েছি। রাজনীতিতে পরস্পরের সুবিধা তো দেখবেই। "

উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসনের মধ্যে কমপক্ষে ১৫টি বিধানসভা আসনে রাজবংশীরা কিংমেকার। পাশাপাশি আরও বহু আসনে তারা সুইং ভোটার। ফলে নির্বাচনের ফল ঘোরানোর ক্ষমতা রাখে।

২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে কোচবিহার জেলার ৭টি আসনের মধ্যে, তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছিল সিতাই ও মেখলিগঞ্জ আসন। আর বিজেপি জিতেছিল দিনহাটা, শীতলকুচি, মাথাভাঙা, কোচবিহার উত্তর ও কোচবিহার দক্ষিণ—এই পাঁচটি আসন।

বংশীবদন ও গিরিজাশঙ্কর রায়ের মতো নেতাদের প্রভাব স্থানীয় স্তরে যথেষ্ট। ফলে তাঁদের বিজেপিতে যোগদান তৃণমূলের ভোটে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই যোগদানকে নিঃস্বার্থ সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনো শর্ত বা প্রত্যাশা ছাড়াই তাঁরা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে বিজেপি বোঝাতে চাইছে, রাজবংশী নেতৃত্ব এখন তাদের প্রতি আস্থাশীল।

তবে এর উল্টো দিকও রয়েছে। বংশীবদন বর্মন অতীতে পৃথক কোচবিহার রাজ্যের দাবিতে সরব ছিলেন। গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি একাধিকবার আলাদা রাজ্যের পক্ষে আন্দোলন করেছেন। এমনকী একসময় তিনি বলেছিলেন, যে দল পৃথক রাজ্যের দাবি মেনে নেবে, তাকেই সমর্থন করবেন। সেই প্রেক্ষিতে বিজেপিতে তাঁর যোগদান নতুন করে সেই দাবিকে সামনে আনবে কি না, সেটাও নজরে রাখার বিষয়।

রাজনৈতিকভাবে এই ঘটনাকে তিনটি স্তরে বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমত, এটি তৃণমূলের জন্য সতর্কবার্তা। উত্তরবঙ্গে তাদের সংগঠন কতটা মজবুত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দ্বিতীয়ত, বিজেপি এই সুযোগে রাজবংশী ভোটকে আরও একত্রিত করার চেষ্টা করবে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক পরিচয় ও উন্নয়ন ইস্যু আবারও নির্বাচনের কেন্দ্রে উঠে আসতে পারে।

তবে প্রার্থী কে হচ্ছে, দলের সংগঠন কতটা শক্তিশালী, আর সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপরই মূলত ফলাফল নির্ভর করে। শুধুমাত্র একজন বা দু'জন নেতার দলবদল পুরো চিত্র বদলে দেবে, এমনটা বলা এখনও তাড়াহুড়ো হবে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত, এই যোগদান উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক লড়াইকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলবে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।